‘পেঁয়াজের ঝাঁজ’, ‘মরিচের ঝাল’ লিখে অযথা আতঙ্ক না ছড়াবেন না
দ্রব্যমূল্য নিয়ে অযথা আতঙ্ক তৈরি না করার আহ্বান জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা পূর্বাভাস সেলের বাণিজ্য পরামর্শক (যুগ্ম নিয়ন্ত্রক) আবু সালেহ্ মোহাম্মাদ ইমরান বলেছেন, গণমাধ্যমে ‘পেঁয়াজের ঝাঁজ’, ‘মরিচের ঝাল’ বা ‘চাল নিয়ে চালবাজি’র মতো শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। এসব শব্দ অনেক সময় মানুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক তৈরি করে।
তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু অযৌক্তিকভাবে প্যানিক তৈরি হয়, যেটা আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে লক্ষ্য করি। এই প্যানিকের কারণ কিছুটা ট্র্যাডিশনাল ধ্যান-ধারণা থেকে একটু বের হয়ে আসতে হবে।’
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মতিঝিলে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) আয়োজিত নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মজুত, সরবরাহ, আমদানি ও মূল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের নিয়ে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। এতে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা অংশ নেন। মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক।
চালের দাম ও চাহিদার প্রসঙ্গে আবু সালেহ্ মোহাম্মাদ ইমরান বলেন, বাজার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে শুধু দাম কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করলে হবে না। উৎপাদন, রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদাসহ সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
তিনি বলেন, ‘সবকিছু মিলেই আসলে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কোনো পণ্যের দাম কমাতে গিয়ে যদি উৎপাদক বা কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন, সেটিও দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো নয়।’
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তিনি বলেন, সরবরাহ ও চাহিদার তথ্য বিশ্লেষণ করে আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের মাধ্যমে বাজার পরিস্থিতি আগাম বোঝার চেষ্টা করছে সরকার।
‘আগামী সপ্তাহ থেকে চালের দাম বাড়বে, এভাবে হয়তো বলা যাবে না। তবে আগাম ফোরকাস্ট করে তার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে ধীরে ধীরে মানুষ একটি ইতিবাচক ব্যবসায়িক পরিবেশ পাবে,’ বলেন তিনি।
গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা বলেন, দ্রব্যমূল্য ‘হ্রাস’ করার পরিবর্তে এখন ‘নিয়ন্ত্রণ’ করাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারে যৌক্তিক মূল্য বজায় রাখাই সরকারের লক্ষ্য।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তার বক্তব্যে অনুষ্ঠানে ক্ষোভ প্রকাশ করেন গণমাধ্যমকর্মীরা। তারা বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ না করে গণমাধ্যমে কোন শব্দ লেখা হচ্ছে, কোন শব্দ লেখা হবে, তা ঠিক করা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তার কাজ নয়। পরে এ ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করেন এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক।
এদিকে, ব্যবসায়ী সমাজের মেরুদণ্ড শক্ত না হলে কোনো দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন আবু সালেহ্ মোহাম্মাদ ইমরান। তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য কমানোর পাশাপাশি যৌক্তিক ও প্রত্যাশিত পর্যায়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যবসায়ী ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন,‘ব্যবসায়ীদের কাজ হচ্ছে প্রফিট করা। সেই ব্যবসায়ীরাই যদি দাম কমানোর জন্য মিটিং করেন, এটা আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক বিষয়। আমরা সবাই একসঙ্গে আছি। বাংলাদেশের সামনে ভালো কিছু হবে। দ্রব্যমূল্য মানুষের দীর্ঘদিনের আতঙ্ক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই আতঙ্ক দূর করতে সরকারের পাশাপাশি ব্যবসায়ী সমাজেরও ভূমিকা রয়েছে।
আবু সালেহ্ মোহাম্মাদ ইমরান বলেন, ব্যবসায়ী মানেই খারাপ, টাকা-পয়সার মালিক হলেই খারাপ এ ধরনের মান্ধাতা আমলের ধারণা জাতির জন্য খুব ক্ষতিকর। একটা দেশে যদি ব্যবসায়ী সমাজের মেরুদণ্ড শক্ত না থাকে, সেই দেশে দ্রব্যমূল্য কেন, কোনোভাবেই উন্নতি সম্ভব নয়।
গরুর মাংসের দাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু দাম কমানোর চিন্তা করলে হবে না; এর সঙ্গে কৃষক ও উৎপাদনকারীদের স্বার্থও বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি বলেন যেভাবেই হোক কমাতেই হবে, শুধু কমাতেই হবে তাহলে একটা দেশের লাখ লাখ প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক, যারা গরু চাষ করেন এবং ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন, তাদের কী হবে? দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি দেশেরই ক্ষতি।’
ইএইচটি/এসএনআর
