নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে সন্ত্রাসবাদ, ফিলিস্তিন ও শুল্কনীতি নিয়ে কড়া অবস্থান
রাজীব দাস
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে দুই দিনের ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটেছে গতকাল। নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের আয়োজক ভারত, যারা এই নিয়ে চতুর্থবারের মতো জোটের সভাপতিত্ব করল। সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য নির্মাণ। সম্মেলনে যোগ দিতে দিল্লি এসেছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাসহ জোটভুক্ত এগারোটি দেশের শীর্ষ নেতারা।
ঘোষণাপত্রে ঐকমত্য : সম্মেলনের প্রথম দিন গত শনিবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে সামনে আসে নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রের সর্বসম্মত অনুমোদন। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে গভীর মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এই ঘোষণাপত্রে ঐকমত্যে পৌঁছায় জোট। ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো পরস্পরবিরোধী স্বার্থের দেশ একই জোটের সদস্য হওয়ায় এই ঐকমত্যকে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই। জানা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানকে একটি যৌথ বিবৃতিতে একমত করাতে বৈঠক চলে রাত পেরিয়ে ভোর চারটা পর্যন্ত, যাতে ভারতের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
সন্ত্রাসবাদ ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে অবস্থান : ঘোষণাপত্রে সব ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতার কঠোর নিন্দা জানানো হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদের বিরুদ্ধে দৃঢ় আপত্তি জানানো হয়েছে, পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে সংযম বজায় রাখা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে সেখানে। জ্বালানি নিরাপত্তা প্রসঙ্গেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, বিশেষত বৈচিত্র্যময় উৎস থেকে জ্বালানি সরবরাহ ও অবকাঠামোর সুরক্ষার প্রশ্নে।
মোদির জমকালো নৈশভোজ প্রত্যাখ্যান শি জিনপিংয়ের : নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিশ্বনেতাদের সম্মানে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আয়োজিত জমকালো নৈশভোজে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকলেও, দীর্ঘ সাত বছর পর ভারত সফরে আসা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অনুপস্থিতি কূটনৈতিক অঙ্গনে তীব্র জল্পনা ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। বেইজিং বা নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কারণ না জানালেও, পিটিআই সূত্রে জানা গেছে যে গত শনিবার সকালে চীন থেকে দিল্লি পৌঁছে পরপর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও রুদ্ধদ্বার অধিবেশনে অংশ নেওয়ার পর দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তির কারণে বিশ্রাম নিতেই তিনি হোটেলে ফিরে যান, যদিও অনেক বিশ্লেষক একে কূটনৈতিক দূরত্বের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখছেন এবং একই অনুষ্ঠানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন না। এদিকে আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য এই নৈশভোজে খাণ্ডভি মিলে-ফেউইলি, ক্ষুম্ব গালৌটি, পনির লাবাবদার, গুচ্চি মারমিক, ক্যারট বিন পোরিয়াল, বাজরার পুলাও এবং মিষ্টান্ন হিসেবে পুরান দিল্লির ফ্রুট ক্রিমের সঙ্গে মুচমুচে জিলাপি ও শাহতুত ফিরনির মতো সম্পূর্ণ ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় বিশেষ ও সুস্বাদু নিরামিষ পদ পরিবেশন করা হয়েছিল।
ভারতের মধ্যস্থতায় ইরান-আমিরাতের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা : মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র সংঘাতের আবহে এবারের ব্রিকস সম্মেলনের সাইডলাইনে ভারতের মধ্যস্থতায় আলোচনার টেবিলে বসলেন ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) শীর্ষ প্রতিনিধিরা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে গত শনিবার বৈঠকে বসেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং আবুধাবির যুবরাজ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা এবং জবাবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা আক্রমণের পর এটিই দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনা। এর আগে এপ্রিলে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে ইরানের বৈঠকে অনুপস্থিত ছিল আবুধাবি।
ভারতের উদ্যোগে আয়োজিত এই বৈঠকে দুই দেশই আঞ্চলিক শান্তি ফেরাতে সর্বোচ্চ ধৈর্যধারণের আহ্বানে সায় দিয়েছে। তবে এই শান্তির আলোচনার আবহেই দৃশ্যপট আরো জটিল করে তুলেছে ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ। গত বৃহস্পতিবার কুয়েতের ‘আহমাদ আল-জাবের’ এবং ইউএইর ‘আল মিনহাদ’ বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানি বাহিনী। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনে ব্রিকসের দুই সদস্য ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিন্ন অবস্থান নিলেও নয়াদিল্লি সফলভাবে উভয় দেশের সঙ্গেই নিজ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে।
শুল্কনীতি নিয়ে ট্রাম্পের প্রতি ইঙ্গিত : অর্থনৈতিক প্রসঙ্গে ব্রিকস দেশগুলো একতরফা শুল্কনীতি ও নিষেধাজ্ঞার কড়া সমালোচনা করেছে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সংস্কারসহ বহুপাক্ষিক বাণিজ্য কাঠামো পুনরুজ্জীবনের দাবি তুলেছে। এই অবস্থানের পেছনে স্পষ্টত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রভাব রয়েছে। ট্রাম্প একাধিকবার ব্রিকসকে মার্কিনবিরোধী জোট বলে অভিহিত করেছেন এবং সদস্য দেশগুলোর ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। রাশিয়া থেকে তেল কেনার অভিযোগে ইতিমধ্যে ভারতীয় পণ্যের ওপর পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসিয়েছেন তিনি, ব্রাজিলের ওপরও চাপিয়েছেন ভারী শুল্ক। তবে এই সম্মেলনে কোনো অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রা চালুর ঘোষণা আসেনি। বরং স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তি ও সীমান্ত পারাপারে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছে জোট, ডলারবিরোধী কোনো সরাসরি অবস্থান এড়িয়ে গেছে ভারত।
সাত বছর পর ভারতে শি জিনপিং : সম্মেলনের অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিল চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উপস্থিতি, যিনি সাত বছর পর প্রথমবারের মতো ভারত সফরে এলেন। ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, এই সফরকে সেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত শনিবার মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে শি জিনপিং সীমান্ত বিরোধের ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত সমাধানের পক্ষে মত দেন। দুই নেতাই একমত হন যে, মতপার্থক্য যেন বিরোধে রূপ না নেয়, সীমান্তে শান্তি বজায় রাখাই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত। বৈঠকের একটি মুহূর্তে শি জিনপিংকে কিছুটা অস্বস্তিতে দেখে মোদি নিজের বক্তব্য থামিয়ে তার দিকে ফিরে তাকান, এই দৃশ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
পুতিন ও অন্য নেতাদের সঙ্গে বৈঠক : পুতিনের সঙ্গেও পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন মোদি, যেখানে ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে ভারতকে হালনাগাদ তথ্য জানানোর কথা জানিয়েছিল রাশিয়া। আউটরিচ পর্বে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ আলীর সঙ্গেও পৃথক বৈঠক করেন মোদি।
শেষ দিনে বাস্তবায়নের তাগিদ : সম্মেলনের শেষ দিন গতকাল আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ঘোষণাপত্রের বাস্তবায়ন এবং গ্লোবাল সাউথের সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রশ্ন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি স্পষ্ট করে বলেছেন, শুধু ঘোষণা দিয়ে হবে না, বাস্তব ফল দেখাতে হবে। ভারতের সভাপতিত্বকালে মোট চারশোর বেশি বৈঠক ও অনুষ্ঠান হয়েছে দেশের তিরিশটি শহরে, মন্ত্রী পর্যায় থেকে শুরু করে সংসদ সদস্য, বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি রূপান্তরের প্রশ্নেও আলোচনা এগিয়েছে এই সময়ে।
পরবর্তী সভাপতি চীন : সম্মেলনের সমাপনী পর্বে জানানো হয়েছে, ব্রিকসের পরবর্তী সভাপতিত্ব পাচ্ছে চীন। অর্থাৎ ২০২৭ সালের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে বেইজিংয়ের নেতৃত্বে। বাণিজ্যযুদ্ধ, আঞ্চলিক সংঘাত ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতায় ঘেরা এক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে শেষ হলো ভারত মণ্ডপমের এই দুই দিনের আয়োজন। এগারো সদস্যের এই জোট এখন বিশ্বের প্রায় চল্লিশ শতাংশ জিডিপির প্রতিনিধিত্ব করে এবং বিশ্বের অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা বাস করে এই দেশগুলোতে।
Source link
