শচিনকে টপকে রেকর্ডের চূড়ায় জো রুট
ইংল্যান্ড টেস্ট দলের অধিনায়ক জো রুটের রেকর্ড ভাঙার স্রোত থামছেই না। পাকিস্তানের বিপক্ষে এজবাস্টনে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে ফের এক ইতিহাস গড়লেন এই ইংলিশ ব্যাটার। ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে ৬২ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে তিনি একসঙ্গে ভেঙেছেন একাধিক রেকর্ড এবং গড়েছেন নতুন সব কীর্তি। তার এই অসাধারণ পারফরম্যান্সের সুবাদে পাকিস্তানকে ৩ ম্যাচের সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করেছে ইংলিশরা।
টেস্ট ক্রিকেটে চতুর্থ ইনিংসে ব্যাটিংকে বরাবরই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ম্যাচের শেষ দিকে কঠিন উইকেটে নির্দিষ্ট লক্ষ্য তাড়া করা এবং প্রতিটি উইকেটের পতন দলের জয়কে অনিশ্চিত করে তোলার মতো পরিস্থিতিতেও রুট নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়। পাকিস্তানের দেওয়া ১৩০ রানের মামুলি লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ২ রানেই ২ উইকেট হারিয়ে বড় বিপদে পড়েছিল ইংল্যান্ড। প্রথম ওভারেই বেন ডাকেট ও এমিলিও গে ফিরে যাওয়ায় পাকিস্তানের বোলাররা জয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন।
তবে সেই চরম চাপের মুহূর্তে আস্থার প্রতীক হয়ে উইকেটে আসেন জো রুট। জর্ডান কক্সকে সঙ্গে নিয়ে তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে দলের ইনিংস মেরামত করেন। শেষ পর্যন্ত রুট ৬২ ও কক্স ৫৯ রানে অপরাজিত থেকে কোনো বিপদ ছাড়াই ১৩০ রান টপকে ইংল্যান্ডের ৮ উইকেটের সহজ জয় নিশ্চিত করেন। এই ইনিংস খেলার পথেই টেস্ট ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান রুট। ১৪৭ বছরের টেস্ট ইতিহাসে তিনিই প্রথম ব্যাটার, যিনি ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে ২ হাজার বা তার বেশি রানের মাইলফলক স্পর্শ করলেন।
এজবাস্টনের এই ঐতিহাসিক মাঠে জো রুট গড়েছেন আরও একটি দারুণ কীর্তি। ম্যাচ শুরুর আগে এই ভেন্যুতে তার রান ছিল ৯৪৮। ১ হাজার রান পূর্ণ করতে তার প্রয়োজন ছিল মাত্র ৫২ রান। পাকিস্তানের বিপক্ষে এজবাস্টনে ৬২ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলে তিনি এই মাঠে ১ হাজার রান পূর্ণ করা প্রথম ব্যাটার হয়ে যান। এর মাধ্যমে এজবাস্টন হয়ে উঠেছে তার চতুর্থ টেস্ট ভেন্যু, যেখানে তিনি ১ হাজারের বেশি রান করেছেন। বর্তমানে টেস্টে তার ভেন্যুভিত্তিক রানগুলোর মধ্যে রয়েছে লর্ডসে ২,২০৩, ম্যানচেস্টারে ১,১২৮, দ্য ওভালে ১,০৫০ এবং এজবাস্টনে ১,০১৮ রান। এর মধ্য দিয়ে জ্যাক ক্যালিস ও রিকি পন্টিংয়ের পর মাত্র তৃতীয় ব্যাটার হিসেবে চারটি ভিন্ন ভেন্যুতে ১ হাজারের বেশি টেস্ট রান করার বিরল রেকর্ড গড়লেন তিনি।
তবে এজবাস্টনের এই ইনিংসটি জো রুটের জন্য সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবে সর্বকালের সেরা রেকর্ডের একটি হাতবদল হওয়ার কারণে। ৬২ রানের এই অপরাজিত ইনিংসটি ছিল তার টেস্ট ক্যারিয়ারের ৬৯তম ফিফটি। এর মাধ্যমে তিনি পেছনে ফেলে দিয়েছেন ভারতীয় কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারকে। টেস্টে শচীনের ফিফটির সংখ্যা ছিল ৬৮টি, আর রুট এখন ৬৯টি ফিফটি নিয়ে এককভাবে এই তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, শচীনের চেয়ে অনেক কম ইনিংস খেলে এই মাইলফলকে পৌঁছেছেন রুট, যা তার অসাধারণ ধারাবাহিকতারই স্পষ্ট প্রমাণ।
এই ফিফটিসহ রুটের টেস্ট ক্যারিয়ারে ফিফটি-প্লাস স্কোরের সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে মোট ১১০টিতে। যার মধ্যে রয়েছে ৪১টি সেঞ্চুরি এবং ৬৯টি ফিফটি। অর্থাৎ, টেস্ট ক্রিকেটে যখনই তিনি পঞ্চাশের ঘর পার হয়েছেন, তার সিংহভাগ সময়ই সেটিকে বিশাল ইনিংসে রূপ দিয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, তার ক্যারিয়ারে অর্ধশতক পেরোনো ইনিংসগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই তিনি বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্য প্রদর্শন করেছেন।
পাকিস্তানের বিপক্ষে এজবাস্টন টেস্টটি জো রুটের জন্য কেবল একটি ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্স ছিল না, বরং এটি ছিল তার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য টেস্ট ক্যারিয়ারের এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। চতুর্থ ইনিংসে ২ হাজার রানের প্রথম ব্যাটার, এজবাস্টনে ১ হাজার রানের প্রথম ব্যাটার এবং টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ফিফটির মুকুট—একই ম্যাচে এমন সব অভাবনীয় রেকর্ডের জন্ম দিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে নিজের অপ্রতিরোধ্য অবস্থান আরও একবার জানান দিলেন জো রুট।
