September 7, 2026

আর ফিরল না ছোট্ট আয়েশা, চিকিৎসকের গাফিলতির অভিযোগ বাবার

0
og_1788752996_6a9e346405954.jpeg


‘অজ্ঞান চিকিৎসকের গাফিলতিতেই আমার পাঁচ বছরের কলিজার টুকরা মেয়ে আয়েশার মৃত্যু হয়েছে। আগে জানলে পায়ের গোড়ালির টিউমারের অপারেশন করাতাম না। দরকার হলে পা কেটে হলেও আমার কাছে রাখতাম। অন্তত মেয়ের কাছ থেকে বাবা ডাকটা শুনতে পারতাম।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন ময়মনসিংহ নগরীর কৃষ্টপুর রেললাইন সংলগ্ন বস্তির বাসিন্দা ইমরান হোসেন আসাদুল। চিকিৎসকের গাফিলতিতে মেয়ের মৃত্যু হয়েছে অভিযোগ করে প্রতিকার ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি।

হাসপাতাল ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসাদুলের একমাত্র মেয়ে পাঁচ বছরের আয়েশার ডান পায়ের গোড়ালির ওপর একটি টিউমার ছিল। মাঝেমধ্যে হাঁটাচলার সময় সেখানে ব্যথা হতো। পরে চিকিৎসার জন্য তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়। গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগে আয়েশার পায়ের টিউমারের অস্ত্রোপচার করা হয়। অপারেশন থিয়েটারে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ডা. জাকির হোসেন। অস্ত্রোপচারের পর আয়েশার জ্ঞান না ফেরায় তাকে পোস্ট অপারেটিভ কক্ষে রাখা হয়। সেখানেও জ্ঞান না ফেরায় বিকেল ৫টার দিকে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) ভোর পৌনে ৪টার দিকে আয়েশার মৃত্যু হয়।

মেয়ের মৃত্যুর পর কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা ও স্বজনরা। শুক্রবার দুপুরের পর আয়েশার মরদেহ বাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয়। পরদিন শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিকার ও চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে হাসপাতালের পরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন ইমরান হোসেন আসাদুল।

আসাদুলের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের পর তার মেয়ের জ্ঞান না ফিরলেও চিকিৎসকরা তাকে বিষয়টি পরিষ্কার করে জানাননি। তিনি বলেন, আমার মেয়ের অপারেশনের পর জ্ঞান ফেরেনি। তাকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পোস্ট অপারেটিভে রাখা হয়েছে। কিন্তু আমার মেয়ের কী সমস্যা, ডাক্তাররা একবারও আমাকে বলেনি। তারা শুধু বলেছে, আমার মেয়ে সুস্থ হয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন, ছোট্ট পায়ের গোড়ালিতে একটি টিউমার অপারেশন করার পর আমার মেয়ের জ্ঞান কেন ফিরবে না? নিশ্চয়ই অজ্ঞানের ডাক্তারের গাফিলতির কারণেই মেয়ের অকাল মৃত্যু হয়েছে।

মেয়েকে হারানোর কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, এক বছর আগে আমার স্ত্রী ছোট্ট মেয়ে আয়েশাকে রেখে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এরপর থেকে আমি ওর বাবা, আমিই ওর মা। মেয়েটা ছিল আমার কলিজার টুকরা। ডাক্তারের ভুলের কারণে আমাকে ছেড়ে মেয়ে চলে গেছে। তবে যদি ডাক্তারের গাফিলতি থাকে, তাহলে এর বিচার চাই।

তবে চিকিৎসকের গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অপারেশনের সময় দায়িত্বে থাকা অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ডা. জাকির হোসেন। তিনি বলেন, অপারেশনের পর আয়েশার অক্সিজেন লেভেল নামতে থাকে। অপারেশন থিয়েটারে জ্ঞান ফেরেনি। পরে পোস্ট অপারেটিভে রাখা হয়। আড়াইটা পর্যন্ত আমাদের দায়িত্ব থাকলেও বিকেল ৪টা পর্যন্ত আমি আয়েশার পাশে ছিলাম। এরপরও তার জ্ঞান ফেরেনি।

তিনি বলেন, আমার বাবা অসুস্থ থাকায় অন্য একজন মেডিকেল অফিসারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে বাসায় চলে যাই। পরে জানতে পারি আয়েশাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে। এরপর কী হয়েছিল, তা জানি না। পরে শুনতে পেয়েছি আয়েশার মৃত্যু হয়েছে।

আয়েশার মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে ডা. জাকির হোসেন বলেন, আয়েশার মৃত্যুতে আমরা সবাই আন্তরিকভাবে দুঃখিত। তবে আয়েশাকে সঠিকভাবেই অ্যানেস্থেসিয়ার ডোজ দেওয়া হয়েছিল। এ ব্যাপারে আমাদের কোনো গাফিলতি ছিল না।

আয়েশার জিএ (জেনারেল অ্যানেস্থেসিয়া) ফিটনেস সঠিক ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, অপারেশনের আগে আয়েশার জিএ ফিটনেস অন্য একজন চিকিৎসক করেছিলেন। এ বিষয়ে তার বিস্তারিত জানা নেই।

এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হোসেন বলেন, ছোট্ট শিশু আয়েশার মৃত্যুতে আমরা সবাই দুঃখিত। তার বাবা ইমরান হোসেন আসাদুল একটি অভিযোগ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন আয়েশার বাবা। একই সঙ্গে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি। এখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তদন্তেই স্পষ্ট হবে পাঁচ বছরের আয়েশার মৃত্যুর পেছনে চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, নাকি অস্ত্রোপচারের পর অন্য কোনো জটিলতার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।

হোসাইন সুলভ/এফএ



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *