September 7, 2026

প্রবাসী আয়নির্ভর অর্থনীতি: আশীর্বাদ, নাকি অদৃশ্য ঝুঁকির সংকেত?

0
og_1788753488_6a9e3650dc65e.jpeg


ঈদের আগের রাত। গ্রামের একটি ছোট্ট বাড়িতে নতুন রঙের গন্ধ। উঠানে রাখা নতুন মোটরসাইকেল, মায়ের হাতে সোনার চুড়ি, ছেলের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফি জমা হয়েছে। বাড়ির কর্তা সেখানে নেই। তিনি কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে, সৌদি আরবের কোনো নির্মাণস্থলে কিংবা মালয়েশিয়ার কোনো কারখানায় রাতের শিফটে কাজ করছেন। তাঁর ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার আগেই ব্যাংকের একটি বার্তা জানিয়ে দেয়—দেশে টাকা পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে মানবিক গল্পগুলোর একটি শুরু হয় ঠিক এভাবেই।

প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ শুধু একটি পরিবারের আয় নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি রেমিট্যান্সই বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎসগুলোর একটি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশের কাতারে রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কোভিড-পরবর্তী সংকট কিংবা ডলারের চাপের সময়ও এই অর্থ দেশের অর্থনীতিকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—একটি দেশের অর্থনীতি কতটা নিরাপদ, যদি তার স্থিতিশীলতা বহুলাংশে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে?

বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকাংশই নিম্ন ও মধ্যম দক্ষতার পেশায় নিয়োজিত। নির্মাণ, গৃহপরিচর্যা, কৃষি কিংবা স্বল্প মজুরির শিল্পখাতে তাঁদের কর্মসংস্থান বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে সামান্য পরিবর্তন, ভিসানীতির কড়াকড়ি, তেলের দামের পতন বা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ রেমিট্যান্স আমাদের শক্তি, আবার একই সঙ্গে এটি একটি কৌশলগত ঝুঁকিও।

অর্থনীতির আরেকটি বাস্তবতা হলো, রেমিট্যান্সের বড় অংশ ভোগব্যয়ে ব্যবহৃত হয়। নতুন বাড়ি নির্মাণ, জমি কেনা কিংবা দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের হার এখনো সন্তোষজনক নয়। অথচ এই অর্থের একটি অংশ যদি ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ কিংবা স্টার্টআপে বিনিয়োগ হতো, তাহলে তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও টেকসই করতে পারত।

প্রবাসী আয়ের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো, এটি দারিদ্র্য কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের বহু জেলায় এমন পরিবার রয়েছে, যাদের শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তনের পেছনে প্রধান অবদান একজন প্রবাসী সদস্যের। কিন্তু এই অর্জনের বিপরীতে রয়েছে হাজারো না-বলা গল্প—অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, দালালের প্রতারণা, বিদেশে শ্রম অধিকার লঙ্ঘন এবং দেশে ফিরে পুনর্বাসনের অনিশ্চয়তা। অর্থনীতির হিসাবের খাতায় এই মানবিক মূল্য খুব কমই দৃশ্যমান হয়।

বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং রোবটিক্স আগামী দশকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চরিত্র বদলে দেবে। স্বল্প দক্ষতার অনেক কাজ বিলুপ্ত হবে, আবার নতুন দক্ষতার চাহিদা তৈরি হবে। বাংলাদেশ যদি এখনই দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিনিয়োগ না করে, তাহলে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠবে। ফিলিপাইন দীর্ঘদিন ধরে দক্ষ নার্স, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবাখাতের কর্মী তৈরি করে রেমিট্যান্স আরও টেকসই করেছে। ভিয়েতনামও দক্ষ শ্রমশক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশের জন্যও এই পথই বাস্তবসম্মত।

রাষ্ট্রের নীতিতেও পরিবর্তন জরুরি। শুধু কত ডলার দেশে এলো, সেই হিসাব করলেই চলবে না; সেই অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে, কীভাবে উৎপাদন বাড়াচ্ছে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে—সেদিকেও নজর দিতে হবে। প্রবাসী বিনিয়োগের জন্য সহজ ঋণ, কর-সুবিধা, ওয়ান-স্টপ সেবা এবং নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বিদেশে অর্জিত সঞ্চয় দেশের শিল্পোন্নয়নের নতুন পুঁজি হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ শুধু রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করতে পারে না। শক্তিশালী শিল্পভিত্তি, বহুমুখী রপ্তানি, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং দক্ষ মানবসম্পদ—এই চার স্তম্ভের ওপরই আগামী দিনের অর্থনীতি দাঁড়াবে। প্রবাসী আয় সেই যাত্রার শক্তিশালী সহযাত্রী হতে পারে, কিন্তু একমাত্র ভরসা নয়।

একই সঙ্গে হুন্ডি প্রতিরোধে কেবল আইন প্রয়োগ নয়, আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও সহজ, দ্রুত ও কম ব্যয়বহুল করতে হবে। কারণ একজন প্রবাসী যখন বৈধ পথে অর্থ পাঠান, তখন তিনি শুধু পরিবারের জন্য অর্থ পাঠান না; দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারও সমৃদ্ধ করেন।

সবচেয়ে বড় কথা, প্রবাসীদের কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের যন্ত্র হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে। তাঁদের নিরাপত্তা, মর্যাদা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দেশে ফিরে পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করা একটি মানবিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যে মানুষটি বিদেশের প্রখর রোদে কিংবা হিমশীতল আবহাওয়ায় দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন, তাঁর সম্মান রক্ষা করাও জাতীয় দায়িত্বের অংশ।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ শুধু রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করতে পারে না। শক্তিশালী শিল্পভিত্তি, বহুমুখী রপ্তানি, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং দক্ষ মানবসম্পদ—এই চার স্তম্ভের ওপরই আগামী দিনের অর্থনীতি দাঁড়াবে। প্রবাসী আয় সেই যাত্রার শক্তিশালী সহযাত্রী হতে পারে, কিন্তু একমাত্র ভরসা নয়। যে রাষ্ট্র তার শ্রমশক্তিকে দক্ষতায় রূপান্তর করতে পারে, প্রবাসীদের সঞ্চয়কে বিনিয়োগে পরিণত করতে পারে এবং অভিবাসনকে উন্নয়ন কৌশলের অংশ বানাতে পারে, সেই রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হয়। তাই এখন সময় শুধু রেমিট্যান্স গোনার নয়; সেই রেমিট্যান্সকে জাতীয় সমৃদ্ধির স্থায়ী ভিত্তিতে রূপান্তর করার।

ড. হারুন রশীদ | লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্টডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। | drharun.press@gmail.com

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *