জ্বালানি নিরাপত্তায় আত্মনির্ভরতার পথে বাংলাদেশ
বিশ্বরাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতির উত্তাল তরঙ্গে যেকোনো দেশের জন্য ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা। শিল্প কারখানার চাকা সচল রাখা, কৃষি উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখা, পরিবহন খাতকে গতিশীল রাখা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অপরিহার্য। বিগত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক বাজারদর, মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর প্রবল চাপ এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সংকটের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাত নানা চড়াই-উতরাই পার করেছে। তবে দীর্ঘদিনের এই সংকট, স্থবিরতা ও অনিশ্চয়তার মাঝেও সম্প্রতি একটি আশাব্যঞ্জক ও অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে।
দীর্ঘ প্রায় ৫৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেশের দ্বিতীয় তেল শোধনাগার বা ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২ বাস্তবায়নের যে প্রশাসনিক, আর্থিক ও নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি নতুন সূর্যোদয়ের সূচনা করছে। মাত্র ৬-৭ মাস পূর্বে দায়িত্ব নেওয়া জনাব তারেক রহমানের নতুন সরকারের জন্য এটি কেবল একটি বড় অর্থনৈতিক সাফল্যই নয়, বরং দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভেঙে জাতীয় আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের সুদৃঢ় অঙ্গীকার। এই প্রেক্ষাপটে একদিকে যেমন সরকারের প্রতি বিশেষজ্ঞভিত্তিক বাস্তবমুখী নীতি সহায়তার প্রয়োজন, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদী টেকসই সংস্কার নিশ্চিত করতে দেশবাসী ও নাগরিকদের ধৈর্য, আস্থা এবং সহমর্মিতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ প্রথম অপরিশোধিত খনিজ তেল বা ক্রুড অয়েল শোধনের নিজস্ব অবকাঠামোগত সক্ষমতা অর্জন করে। স্বাধীনতার পর সময়ের পরিক্রমায় দেশের জনসংখ্যা বহু বেড়েছে। ব্যাপক শিল্পায়ন ঘটেছে এবং যানবাহন ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র বৃদ্ধির কারণে তেলের চাহিদাও জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, দেশের প্রথম ও একমাত্র রিফাইনারি প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ প্রায় ছয় দশকেও এর শোধন সক্ষমতা এক ফোটাও বাড়ানো হয়নি।
এতদিন দেশের বার্ষিক জ্বালানি তেলের বিপুল চাহিদার মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ, যা পরিমাণে বার্ষিক প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন, অপরিশোধিত তেল এনে দেশীয় প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাত করা হতো। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় চাহিদার বাকি বিশাল অংশ বা প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ পরিশোধিত ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও জেট ফুয়েল হিসেবে বহুগুণ বেশি মূল্যে বিদেশ থেকে তৈরি পণ্য হিসেবে আমদানি করতে হতো।
এর ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যায় এবং বিশ্ববাজারের সামান্য অস্থিরতাতেই দেশীয় বাজারে জ্বালানি সংকট তীব্র রূপ ধারণ করে। দ্বিতীয় তেল শোধনাগার স্থাপনের প্রকল্পটি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ফাইল বন্দি অবস্থায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ঝুলে ছিল। বারবার সম্ভাব্যতা যাচাই, অর্থায়ন অনিশ্চয়তা এবং নীতি-নির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় এবং বাস্তবায়ন সময়—উভয়ই একাধিকবার বৃদ্ধি পায়। তবে সরকারের দিক থেকে আসা বার্তা অনুযায়ী, বহু প্রতীক্ষিত এই মেগা প্রকল্পের জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সাথে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ সহায়তা আলোচনা চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। সম্পূর্ণ প্রকল্পটি প্রাক্কলিত ৩১,০৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়িত হলে দেশে নিজস্ব শোধন ক্ষমতা আরও ৩০ লাখ মেট্রিক টন বৃদ্ধি পেয়ে মোট ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হবে। এটি দেশের মোট জ্বালানি তেলের বার্ষিক চাহিদার প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণভাবে শোধনের সুযোগ তৈরি করবে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে এই দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা কাটিয়ে প্রকল্পটিকে বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার তালিকায় নিয়ে আসার পদক্ষেপটি দেশীয় জ্বালানি স্বনির্ভরতার পথ উন্মুক্ত করার সবচেয়ে যৌক্তিক কৌশল।
এই দ্বিতীয় রিফাইনারি স্থাপন কেবল একটি শিল্প কারখানা নির্মাণের বিষয় নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এটি একটি গেম-চেঞ্জার হিসেবে কাজ করবে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল এবং প্রক্রিয়াজাত পরিশোধিত তেলের দামের মধ্যে বিশাল পার্থক্য বিদ্যমান থাকে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নিজেদের শোধনাগারে ক্রুড অয়েল এনে প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হলে প্রতি ব্যারেলে আনুমানিক ২০ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব। এর ফলে কেবল এই একটি প্রকল্পের মাধ্যমেই বছরে অন্তত ৪৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৫,৭৮৮ কোটি টাকা, বৈদেশিক মুদ্রা বা রিজার্ভ সরাসরি রক্ষা করা সম্ভব হবে।
এছাড়া খনিজ তেল শোধনের সময় উপজাত হিসেবে এলপিজি, বিটুমিন, ন্যাপথা এবং এভিয়েশন ফিউয়েলের মতো অত্যন্ত মূল্যবান পদার্থ উৎপাদিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশকে সড়ক নির্মাণের বিটুমিন এবং বাসাবাড়ির রান্নার এলপিজি আমদানির জন্য বহু কোটি ডলার খরচ করতে হয়। নিজস্ব শোধনাগার পুরোদমে চালু হলে এই উপজাত সম্পদগুলো দেশীয় বাজারের একটি বিশাল অংশ পূরণ করতে পারবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কোনো কূটনৈতিক সংকট, আঞ্চলিক যুদ্ধ বা বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইনে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলেও দেশীয় শোধনাগার থাকলে বিশ্ববাজার থেকে ক্রুড অয়েল এনে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা অনেক সহজ ও নিরাপদ হবে।
তবে কেবল মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি নবীন সরকারের জন্য জ্বালানি খাতকে টেকসই করার লক্ষ্যে একটি সুসংহত ও সুদূরপ্রসারী কৌশলগত রূপরেখা অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। দেশের ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক উৎসের দিকে নজর দিলে স্পষ্ট হয় যে, আমদানিকৃত তেলের ওপর ব্যাকুল নির্ভরতা কমাতে আমাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে সর্বোচ্চ গতি আনতে হবে।
এ ক্ষেত্রে পার্বত্য অঞ্চল ও বঙ্গোপসাগরের অববাহিকাই হতে পারে বাংলাদেশের প্রধান ভরসাস্থল। দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশ জুড়ে বিস্তৃত পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৩,২৯৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্রাকৃতিক খনিজ এবং সম্ভাবনাময় হাইড্রোকার্বনের এক অপার ভাণ্ডার হিসেবে পড়ে রয়েছে। ভূতাত্ত্বিক বিন্যাস ও শিলাস্তরের গঠন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারতের আসাম অঞ্চলের তেল-গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর সাথে পার্বত্য ভূখণ্ডের সরাসরি ভূ-প্রাকৃতিক মিল রয়েছে। অতীতে কিছু বিক্ষিপ্ত কাজ হলেও নানা আঞ্চলিক সমস্যা ও নীতিগত সীমাবদ্ধতায় এই বিশাল অঞ্চলের মাটির নিচে অনুসন্ধান চালানো সম্ভব হয়নি।
একই সাথে পাহাড়ের ঠিক পাদদেশেই ছড়িয়ে আছে বঙ্গোপসাগরে আমাদের বিশাল সামুদ্রিক জলসীমা ও এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন। যেখানে বঙ্গোপসাগরের একই অববাহিকা ব্যবহার করে মিয়ানমার ও ভারত প্রচুর গ্যাস ও খনিজ সম্পদ উত্তোলন করছে, সেখানে বাংলাদেশের অফশোর অঞ্চলে অনুসন্ধান দীর্ঘদিন থমকে ছিল। রাষ্ট্রকে এখন পাহাড়ে ১৩ হাজারে অধিক বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে আধুনিক থ্রিডি সেসমিক সার্ভে পরিচালনার মাধ্যমে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সুস্পষ্ট রোডম্যাপে যাওয়া অধিক সমজদারির কাজ হবে।
বাপেক্সকে আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞ তেল কোম্পানিগুলোকে পার্বত্য অঞ্চলে ড্রিলিংয়ের জন্য আকর্ষণ করতে হবে। একই সাথে বঙ্গোপসাগরের গভীর ও অগভীর ব্লকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আন্তর্জাতিক মানের প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট বা পিএসসি দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে অফশোর ড্রিলিং শুরু করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।
জীবাশ্ম জ্বালানির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য ও টেকসই শক্তির প্রসারেও দেশকে যুগপৎ অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিকভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে। এই অবস্থায় দেশের পোশাক কারখানা ও অন্যান্য ভারী শিল্পে রূফটপ সোলার স্থাপন, অব্যবহৃত বা অনাবাদি জমি ও সামুদ্রিক উপকূলীয় জলাশয়ে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য শক্তি যুক্ত হলে আমদানিকৃত তেলের ওপর চাপ বহুগুণ কমে আসবে এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা স্রেডার কাজকে আরও গতিশীল করে তাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হবে।
তবে যেকোনো প্রযুক্তিনির্ভর খাতে টেকসই স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হলে নিজস্ব গবেষণা, বিজ্ঞানী-গবেষক তৈরি এবং দেশীয় মেধার সঠিক ব্যবহার ব্যতিরেকে তা কখনই সম্ভব নয়। জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদী সার্বভৌমত্ব কেবল বিদেশি প্রকৌশলী বা কনসালট্যান্টদের ওপর ভর করে ধরে রাখা যায় না। জাতীয় বাজেটে জ্বালানি ও হাইড্রোকার্বন গবেষণার জন্য একটি পৃথক ও বড় অংকের রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বা আরঅ্যান্ডডি তহবিল গঠন করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
এর মাধ্যমে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে হাইড্রোজেন এনার্জি, ড্রিলিং টেকনোলজি এবং অ্যাডভান্সড ব্যাটারি প্রযুক্তিতে কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে। আমাদের বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিশেষায়িত পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং, ভূতত্ত্ব এবং মেটেরিয়াল সায়েন্সের শিক্ষার্থীদের উচ্চতর গবেষণার সুযোগ দিয়ে একটি নতুন গবেষক ও বিজ্ঞানী সমাজ গড়ে তুলতে হবে।
বহু দক্ষ বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও ভূ-বিজ্ঞানী বিশ্বজুড়ে সুনামের সাথে কাজ করছেন। মেধা পাচার বা ব্রেইন ড্রেন বন্ধের পাশাপাশি সেই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের যথাযথ সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দেশীয় নীতি-নির্ধারণী ও প্রযুক্তিগত পরিকল্পনায় যুক্ত করা এখন সময়ের বড় দাবি। ব্রেইর ড্রেন রুখতে সরকারের ট্রেড ভিত্তিক নিয়োগে মনোযোগী হতে হবে। বিশেষ করে টেকনিক্যাল যে বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করবেন, সে ট্রেডের চাকরিতেই যেতে হবে শিক্ষার্থীদের।
পাশাপাশি দেশের সাময়িক ঝুঁকি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত মজুদ ক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ ক্ষমতা মাত্র ৩০ থেকে ৪৫ দিনের, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো আন্তর্জাতিক সরবরাহ লাইন বিঘ্নিত হলে দেশ তাৎক্ষণিক সংকটে পড়তে পারে। তাই নতুন রিফাইনারির সাথে সাথে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কৌশলগত ডিপো তৈরি করে মজুদ ক্ষমতা অন্তত ৯০ দিনে উন্নীত করার মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য।
দেশের দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট বা স্থবিরতা এক রাতে তৈরি হয়নি, তাই এর রাতারাতি বা অলৌকিক কোনো সমাধানও সম্ভব নয়। একটি নতুন সরকার যখন দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই দেশ পুনর্গঠনের পাশাপাশি দীর্ঘ ৫৮ বছরের অচলাবস্থা ভেঙে অবকাঠামোগত বড় সংস্কারের সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, তখন দেশবাসী ও সাধারণ নাগরিকদেরও কিছু দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি মূল্যের ওঠানামা এবং অবকাঠামোগত রূপান্তরকালীন মেয়াদের যে সাময়িক চ্যালেঞ্জগুলো তৈরি হয়, সেগুলোকে বাস্তবসম্মত ও ধৈর্যশীল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। বাসা-বাড়ি, কর্মক্ষেত্র ও যানবাহনে জ্বালানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ করা প্রতিটি নাগরিকের জাতীয় দায়িত্ব। গুজবে কান না দিয়ে দেশীয় সংস্থাসমূহের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আস্থা রাখতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও অগ্রযাত্রাকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে হলে শক্তিশালী জ্বালানি নিরাপত্তার কোনো বিকল্প নেই। ৫৮ বছরের পুরনো কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে দ্বিতীয় শোধনাগার নির্মাণ, পাহাড়ে ১৩ হাজার বর্গকিলোমিটারের সম্ভাব্য খনিজ ভাণ্ডার এবং বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্ভাবনা উন্মোচন, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার এবং দেশীয় বিজ্ঞানীদের মেধার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার—এই সমন্বিত পদক্ষেপগুলোই বাংলাদেশকে প্রকৃত স্বনির্ভরতা এনে দিতে পারে। সরকারের সুদূরপ্রসারী নীতিগত কৌশল এবং দেশবাসীর আস্থা ও সহযোগিতার মাধ্যমে জ্বালানি খাতের যাবতীয় সংকট কেটে যাবে। স্বকীয় প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও নিজস্ব মেধার শক্তিতে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি আত্মনির্ভরশীল ও শক্তিসমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে নিশ্চিতভাবেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
লেখক: এ এইচ এম ফারুক
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ইমেইল: ahmfarukcht@gmail.com
মোবাইল: ০১৫৫৬৭৭৪৫০৫
এইচআর/জেআইএম
