September 10, 2026

শহরের নারীর পানি পানেও ভয়, টয়লেট কোথায়?

0
og_1789018920_6aa2432843e5c.jpeg


ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন লাখ লাখ নারী বের হন। কেউ অফিসে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ সন্তানকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে, কেউ ব্যবসার কাজে, কেউ আবার জীবিকার তাগিদে। সময়ের সঙ্গে রাজধানী বদলেছে। বেড়েছে গণপরিবহন, শপিংমল, মার্কেট, পার্ক। বদলেছে নাগরিক জীবনের অনেক চিত্র। পাবলিক টয়লেটও নেহাত কম নয়। তবু প্রশ্নটা থেকেই যায়, এই শহর কি নারীদের জন্য সত্যিই টয়লেটবান্ধব হয়ে উঠেছে?

উত্তরটা খুঁজতে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না। বরং প্রতিদিনের নগরজীবনের ছোট ছোট দৃশ্যেই তার উত্তর লুকিয়ে আছে। রাস্তায় বের হওয়া অনেক নারীর হাতে পানির বোতল থাকে, কিন্তু তৃষ্ণা পেলেও ঢাকনা খোলেন না। এক ঢোক পানি মানেই যদি সামনে এসে দাঁড়ায় আরেক দুশ্চিন্তা—‘প্রস্রাবের চাপ এলে যাব কোথায়?’ এ যেন নাগরিক জীবনের এক অদৃশ্য সমঝোতা। তাহলে কি ‘নারী বাইরে থাকবে, কিন্তু তার তৃষ্ণা থাকবে ঘরের ভেতর’—এমনটাই চলবে?

টয়লেট আছে, ব্যবহার করার নিশ্চয়তা নেই

ঢাকায় পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু শুধু সংখ্যা দিয়ে সমস্যার সমাধান মাপা যায় না। WaterAid Bangladesh-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই কোটি মানুষের ঢাকায় পাবলিক টয়লেট রয়েছে ১৩৭টি। এসবের বড় একটি অংশ অস্বাস্থ্যকর, ব্যবহার-অনুপযোগী কিংবা নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়।

একটি টয়লেট ব্যবহারযোগ্য হওয়ার জন্য শুধু চার দেয়াল ও একটি কমোড যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, পানি, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। আর নারীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন আরও কিছু। মাসিকের সময় ব্যবহারের উপযোগী ব্যবস্থা, স্যানিটারি প্যাড ফেলার নিরাপদ স্থান, শিশুকে সঙ্গে নিয়ে ঢোকার সুযোগ, প্রয়োজনে শিশুর ডায়াপার পরিবর্তনের ব্যবস্থা—এসবও নাগরিক সুবিধার অংশ।

৬৯ শতাংশ নারী বাইরে পানি কমিয়ে দেন

সমস্যাটির সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় WaterAid Bangladesh-এর ২০২৫ সালের গবেষণায়। ঢাকার ৮৬৫ জন নারীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৯ শতাংশ নারী বাইরে থাকলে পানির পরিমাণ কমিয়ে দেনআর ১৫ শতাংশ নারী বাইরে থাকাকালে একেবারেই পানি পান করেন না

কারণটি খুব সাধারণ—বাইরে বের হলে নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য টয়লেট পাওয়া যাবে কি না, সেই অনিশ্চয়তা।

একজন নারী তৃষ্ণার্ত। তাঁর হাতে পানি আছে। তবু তিনি পানি পান করছেন না। কারণ পানি পান করলে প্রস্রাবের প্রয়োজন হতে পারে, আর সেই প্রয়োজন মেটানোর মতো নিরাপদ জায়গা হয়তো তিনি পাবেন না।

ঢাকাকে সত্যিকার অর্থে নারীবান্ধব করতে হলে শুধু রাস্তা, ফুটপাত কিংবা গণপরিবহনের দিকে তাকালে হবে না। প্রতিটি নারী যেন নিশ্চিন্তে পানি পান করতে পারেন, প্রয়োজন হলে নিরাপদ টয়লেটে যেতে পারেন এবং কোনো ভয় বা অস্বস্তি ছাড়াই নিজের স্বাভাবিক প্রয়োজন মেটাতে পারেন, সেই নিশ্চয়তাও দিতে হবে।

WaterAid-এর গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীরা কম পানি গ্রহণের সঙ্গে ক্লান্তি, মাথাব্যথা এবং বারবার ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের মতো স্বাস্থ্য সমস্যার কথাও জানিয়েছেন।

আরেকটি তথ্যও ভাবার মতো। WaterAid-এর ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, তাদের সহায়তাপ্রাপ্ত পাবলিক টয়লেটগুলো ব্যবহার করেছেন ২ কোটি ৫৮ লাখ মানুষ; এর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ১৩ শতাংশ

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, নারীরা কি টয়লেট ব্যবহার করতে চান না, নাকি টয়লেটগুলো নারীর ব্যবহার-উপযোগী করে তৈরি হয়নি?

কেন পাবলিক টয়লেট এড়িয়ে চলেন নারীরা?

কারণ একটিমাত্র নয়।

প্রথমত, অপরিচ্ছন্নতা। নোংরা কমোড, ভেজা মেঝে, দুর্গন্ধ কিংবা অপর্যাপ্ত পানি অনেক নারীকে টয়লেট ব্যবহার থেকে বিরত রাখে।

দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা গোপনীয়তা। নির্জন জায়গায় টয়লেট, পর্যাপ্ত আলো না থাকা, দুর্বল দরজার লক কিংবা আশপাশের অনিরাপদ পরিবেশ স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক তৈরি করে।

তৃতীয়ত, মাসিক স্বাস্থ্যবিধি। মাসিকের সময় একজন নারীর প্রয়োজন শুধু একটি টয়লেট নয়; প্রয়োজন পানি, পরিচ্ছন্নতার সুযোগ, গোপনীয়তা এবং ব্যবহৃত প্যাড ফেলার নিরাপদ ব্যবস্থা।

চতুর্থত, শিশুকে সঙ্গে নিয়ে চলাফেরা করা মায়েদের সমস্যা। শিশুকে নিয়ে টয়লেটে ঢোকার মতো জায়গা নেই, ডায়াপার পরিবর্তনের ব্যবস্থা নেই—তাহলে মায়ের জন্য একটি স্বাভাবিক প্রয়োজনও হয়ে ওঠে বাড়তি বিড়ম্বনা।

পঞ্চমত, প্রতিবন্ধী নারীদের প্রবেশযোগ্যতা। প্রয়োজনীয় র‌্যাম্প, প্রশস্ত জায়গা, গ্র্যাব বার বা উপযোগী চেম্বার না থাকলে একটি পাবলিক টয়লেট তাঁদের জন্য কার্যত অচল।

অর্থাৎ, নারীবান্ধব টয়লেট মানে শুধু দরজায় নারী-চিহ্ন লাগানো একটি কক্ষ নয়। এটি হতে হবে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, ব্যক্তিগত এবং সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য

শরীরের প্রয়োজনকে চেপে রাখার মূল্য

প্রস্রাবের চাপ দীর্ঘ সময় চেপে রাখা স্বাস্থ্যকর অভ্যাস নয়। যুক্তরাষ্ট্রের National Institute of Diabetes and Digestive and Kidney Diseases (NIDDK) বলছে, নিয়মিত প্রস্রাব আটকে রাখলে মূত্রথলির পেশির ওপর প্রভাব পড়তে পারে এবং ব্লাডার ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

নারীদের মধ্যে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনও তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। NIDDK-এর তথ্য অনুযায়ী, জীবনের কোনো এক পর্যায়ে প্রায় অর্ধেক নারী ব্লাডার ইনফেকশনে আক্রান্ত হতে পারেন এবং আক্রান্ত নারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের পুনরায় সংক্রমণ হতে পারে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—পাবলিক টয়লেট ব্যবহার না করলেই ইউরিন ইনফেকশন হবে, এমন সরল বৈজ্ঞানিক দাবি করা ঠিক নয়। UTI-এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং দীর্ঘ সময় প্রস্রাব চেপে না রাখাকে স্বাস্থ্যকর মূত্রাভ্যাসের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তাহলে কেন একজন নারীকে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস আর শহরের বাস্তবতার মধ্যে বেছে নিতে হবে?

ভালো উদ্যোগও আছে

সমস্যার মাঝেও আশার জায়গা রয়েছে। রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালে চালু হয়েছে ‘অনন্যা’—নারীদের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত পাবলিক টয়লেট। WaterAid Bangladesh, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও সুইডেন দূতাবাসের সহযোগিতায় তৈরি এই স্থাপনায় নারী কর্মী, নিরাপদ লক, স্যানিটারি ন্যাপকিন, শিশুকে দুধ খাওয়ানো ও ডায়াপার পরিবর্তনের জায়গা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, প্রতিবন্ধীবান্ধব সুবিধা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

পাশাপাশি কোথায় টয়লেট আছে, তার পাশাপাশি কোথায় নিরাপদ টয়লেট নেই, সেটিও জানা দরকার। কোন টয়লেট কখন খোলা থাকে, কোথায় পানি আছে, কোথায় নারী ও প্রতিবন্ধীদের সুবিধা রয়েছে—এসব তথ্যও সহজে মানুষের নাগালের মধ্যে থাকা উচিত।

একজন নারী যেন পানি পান করার আগে না ভাবেন

একটি শহর কতটা আধুনিক, তা শুধু তার উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা ঝকঝকে শপিংমল দিয়ে মাপা যায় না। শহরটি তার নাগরিকের সবচেয়ে মৌলিক প্রয়োজনগুলো কতটা মর্যাদার সঙ্গে পূরণ করতে পারে, সেটিও উন্নয়নের মাপকাঠি।

টয়লেট কোনো বিলাসিতা নয়। পানি পান করাও কোনো বিলাসিতা নয়। শরীরের স্বাভাবিক প্রয়োজন মেটানোর সুযোগও কোনো বিশেষ সুবিধা নয়।

তাই ঢাকাকে সত্যিকার অর্থে নারীবান্ধব করতে হলে শুধু রাস্তা, ফুটপাত কিংবা গণপরিবহনের দিকে তাকালে হবে না। প্রতিটি নারী যেন নিশ্চিন্তে পানি পান করতে পারেন, প্রয়োজন হলে নিরাপদ টয়লেটে যেতে পারেন এবং কোনো ভয় বা অস্বস্তি ছাড়াই নিজের স্বাভাবিক প্রয়োজন মেটাতে পারেন, সেই নিশ্চয়তাও দিতে হবে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

এইচআর/জেআইএম



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *