August 30, 2026

ফোনালাপে ‘বোঝাপড়া’ নিয়ে সংসদে সরকারি ও বিরোধীদলের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

0
millat-mtfoj3gj77krrmv-20260830164343.jpg


সংসদীয় কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়ে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, বিরোধীদলের উপ-নেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ তাহেরের সঙ্গে ফোনালাপের ভিত্তিতে আশা করেছিলাম যে, বিরোধীদল সংবিধান সংশোধন কমিটিতে থাকবে। এ বোঝাপড়ার কারণে রোববার কমিটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়েছিল।

চিফ হুইপের পাশাপাশি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধীদলকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সরকারি দল। অন্যদিকে, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশগ্রহণের সঙ্গে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টনের কোনও সম্পর্ক থাকতে পারে না বলে জানিয়েছে বিরোধী দল। এ নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধীদলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য হয়েছে।

রোববার (৩০ আগস্ট) জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন এবং সংসদীয় কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়ে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সংসদীয় কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়ে জানান, বিরোধীদলের উপ-নেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ তাহেরের সঙ্গে ফোনালাপের ভিত্তিতে তিনি আশা করেছিলেন যে, বিরোধীদল সংবিধান সংশোধন কমিটিতে থাকবে। এ বোঝাপড়ার কারণে রোববার কমিটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়েছিল।

চিফ হুইপ বলেন, বিগত ৫৪-৫৫ বছরে বিরোধীদল থেকে পাবলিক অ্যাকাউন্টস বাদে কোনও কমিটির সভাপতি করার রেওয়াজ নেই। তারপরও আমরা আনুপাতিক হারে বিরোধী দলকে ১০টি কমিটির সভাপতি পদ দিতে রাজি আছি। কিন্তু আমাদের কথা ছিল, সংবিধান সংশোধন করেই আমরা ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন করবো। ওনারা যদি সেই প্রক্রিয়ায় অংশ নেন, তবে আমরা পদ দিতে রাজি আছি। আমরা কোনো কিছু আটকে রাখতে চাই না।

তিনি আরও বলেন, আমি যদি দিল খুলে কথা বলি, তবে অন্য পক্ষকেও ওপেন হার্ট হতে হবে। কথার মারপ্যাঁচ করে আমরা দেশ গঠনের কাজে এগোতে পারবো না।

চিফ হুইপের বক্তব্যের পরই বিরোধীদলের উপ-নেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ তাহের স্পষ্ট করে বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেওয়ার সঙ্গে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার কোনো সমঝোতা হয়নি।

শর্ত দিয়ে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ চাই না

বিরোধীদলের উপ-নেতা বলেন, সংসদে আমাদের সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী আমরা ২৬ শতাংশ স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্যপদ পাচ্ছি। একইভাবে আমাদের প্রত্যাশা ছিল, কমিটিগুলোর সভাপতিও ২৬ শতাংশ বিরোধীদল থেকে হবে। কিন্তু, এখন পর্যন্ত কোনো মন্ত্রণালয়ের কমিটিতে বিরোধীদল থেকে সভাপতি করা হয়নি।

চিফ হুইপের সঙ্গে ফোনালাপের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আমরা যাবো এবং সেই হিসেবে আপনি আমাদের সভাপতি দেবেন-এমন কথা আমরা কখনোই বলিনি। আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত হলো, আমরা সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নেবো না। একটি কমিটিতে জয়েন করানোর জন্য শর্ত আরোপ করে জোর-জবরদস্তি করার ট্রেডিশন আমরা সঠিক মনে করি না।

অতীত সংসদের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অতীতে তো স্পিকারকে পিটিয়ে মারা হয়েছে, ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী সাহেবকে হত্যা করা হয়েছে, জুতা ছোড়াছুড়ি হয়েছে। আমরা সেই কালো ইতিহাসে ফিরে যেতে চাই না। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন এটা জনগণের সংসদ, তাই বৈষম্যবিরোধী এই সংসদে আমরা আমাদের অধিকার চাই।

চাইবেন, আবার বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবেন না

বিরোধীদলের অবস্থানের পর ফ্লোর নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধীদলকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, স্পিকার নির্বাচনের আগে একটি ইফতার অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলের নেতাদের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কথা প্রসঙ্গে আমাদের কথা উঠলে প্রধানমন্ত্রী বললেন, আমরা এখন থেকেই জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন শুরু করি। চলুন, আপনি ডেপুটি স্পিকারের একজনের নাম দিন। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার একজন, ডেপুটি স্পিকার একজন। সেই ডেপুটি স্পিকার আমরা বিরোধীদলকেই অফার করেছি।

বিরোধীদল তখন ডেপুটি স্পিকারের পদ নিতে রাজি হয়নি বলে জানান তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তখন আমরা ভাবলাম, জুলাই জাতীয় সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে, অর্থাৎ সংবিধান সংশোধিত হলে সেই অনুযায়ী আমরা যাবো। আমরা আমাদের উদারতা এবং আমাদের উইলিংনেস জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সংবিধান সংশোধনের আগে থেকেই ব্যক্ত করেছি।

পাঁচজন বিরোধী সদস্যের জায়গা রাখা হয়েছে

সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠনের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি আন্ডার রুলস ২২৬ গঠন করেছি। পাঁচজন সদস্যের জায়গা রাখা হয়েছে বিরোধীদলের জন্য।

তিনি বলেন, সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল অন্যান্য রাজনৈতিক দল, স্বতন্ত্র সদস্যসহ বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিত্বও কমিটিতে রাখা হয়েছে। বিরোধীদল নীতিগতভাবে কমিটিতে না আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটা তাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত হতেই পারে। যদি সংবিধান সংশোধিত না হয়, জুলাই জাতীয় সনদ তো বাস্তবায়িত হলো না। হওয়ার পরে হবে। আমরা কাজ শুরু করেছি, সেই কমিটি গঠিত হয়েছে।

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হবে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, এরইমধ্যে তার সভাপতিত্বে কমিটির একটি বৈঠক হয়েছে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে কমিটি প্রতিবেদন তৈরি করবে।

তিনি বলেন, তার মধ্যে সংবিধান বিশেষজ্ঞ আছে, সাবেক প্রধান বিচারপতিরা আছেন, বিচারপতিরা আছেন, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন আছে। প্রেসের বন্ধুরা আছেন, এডিটররা আছেন। জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সঙ্গে যারা কাজ করেছেন তাদেরকে আমরা আহ্বান জানাব।

এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের সদস্য এবং জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে বলে জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এভাবে আমরা সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলবো। তাদের মতামতের ভিত্তিতে আমরা রিপোর্টটা প্রণয়ন করবো।

সমৃদ্ধ সংবিধান সংশোধনী বিল আনা হবে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের বাইরেও সমাজের প্রত্যাশা অনুযায়ী, আমাদের নির্বাচন ইশতেহার অনুযায়ী এবং জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী আর যাদের সঙ্গে আমরা কথা বলবো, তাদের পরামর্শ অনুযায়ী সবকিছু ধারণ করে আমরা একটা সমৃদ্ধ সংবিধান সংশোধনী বিল আনবো।

বিরোধীদলকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসুন। আপনাদের যা বক্তব্য আছে, আমরা সেটা লিপিবদ্ধ করবো। আপনাদের সব বক্তব্য সেই রিপোর্টে থাকবে। আপনাদের বক্তব্য জাতি জানবে।
 
তিনি আরও বলেন, আপনারা দ্বিমত হবেন, ভিন্নমত হবেন এবং কিছু কিছু প্রস্তাবে অবশ্যই একমত হবেন। আমরা তো আরও কিছু জিনিস এখানে অন্তর্ভুক্ত করবো এই সংবিধানে। যেগুলো আপনারা দেন বা অন্য পেশার মানুষ দেক, সেটায় নতুনত্ব আসতে পারে। সেটা আমরা গ্রহণ করবো। আমরা ভেরি ওপেন এই বিষয়ে।

সব দাবি মানতে হবে-এটা সহযোগিতা হলো না

সংসদীয় কমিটিতে বিরোধীদলের অংশগ্রহণের বিষয়টিও জুলাই জাতীয় সনদের সঙ্গে যুক্ত বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার ভাষ্য- সনদে সংসদীয় কমিটির সভাপতিত্ব বিরোধীদলকে দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। তবে, তা বাস্তবায়নের জন্য আগে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আপনাদের সব দাবি মানতে হবে, তারপরও আমরা আপনাদের এই সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসবো না-এটা সহযোগিতা হলো না। আপনারা সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসুন।

তিনি আরও বলেন, আপনারা যখনই অংশ নেবেন, আমরা স্বাগত জানাবো। তখন জুলাই জাতীয় সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হবে। তার আগ পর্যন্ত বিদ্যমান বিধান অনুসারে আমরা যাই।

সবশেষে বিরোধী দলের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখন আপনারা সবই জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে চাইবেন, অথচ সনদ বাস্তবায়নের জন্য সহযোগিতায় আসবেন না। দুইটা বিপরীতমুখী হয়ে যায়।

এমওএস/এএমএ



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *