ডোরেমন দেখে যারা বড় হয়েছেন; তাদের জীবন কেন সবার চেয়ে আলাদা
একসময় বিকেল মানেই ছিল স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগটা এক পাশে ছুড়ে রাখা, দ্রুত নাশতা খেয়ে টেলিভিশনের সামনে বসে পড়া। অপেক্ষা থাকত সেই নীল-সাদা গোলগাল রোবট বিড়ালের জন্য। পকেট থেকে একের পর এক অদ্ভুত গ্যাজেট বের করে নোবিতার জীবন সহজ করার চেষ্টা, আর সেই গ্যাজেট ব্যবহার করতে গিয়ে নোবিতার নতুন বিপদে জড়িয়ে পড়া-এই ছিল শৈশবের আনন্দের বড় একটি অংশ।
তখন ডোরেমন ছিল শুধুই একটি কার্টুন। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই গল্পগুলো যেন নতুন অর্থ নিতে শুরু করেছে। যে চরিত্রকে একসময় অলস, ভীতু কিংবা বোকা মনে হতো, বড় হয়ে তার ভয়, ব্যর্থতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব আর একাকিত্ব অনেক বেশি পরিচিত মনে হয়।
ডোরেমনের গল্পে বন্ধুত্বের মূল্যও শিখেছে একটি প্রজন্ম
এই প্রজন্মের চিন্তাভাবনা, কল্পনাশক্তি ও জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ডোরেমনের গ্যাজেট, নোবিতার ব্যর্থতা এবং সেই ফ্যান্টাসির জগতের এক ধরনের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ছোটবেলায় ডোরেমন দেখা, বড় হওয়ার পর কেন যেন আরও বেশি বোঝা যায়-এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের নিজেদের বেড়ে ওঠার গল্পেই।
নোবিতাকে আর অলস মনে হয় না
ছোটবেলায় নোবিতাকে দেখলে বেশিরভাগ সময়ই হাসি পেত। পড়াশোনায় মন নেই, পরীক্ষায় খারাপ ফল, খেলাধুলায় খুব একটা দক্ষ নয়-সামান্য সমস্যাতেই ভয় পেয়ে যায়। আর কোনো বিপদে পড়লেই ছুটে যায় ডোরেমনের কাছে।
কিন্তু বয়স বাড়ার পর নোবিতাকে যেন একটু অন্য চোখে দেখা যায়। ব্যর্থতার ভয়, আত্মবিশ্বাসের অভাব, অন্যদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করা কিংবা কঠিন পরিস্থিতিতে সহজ কোনো সমাধান খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা-এসবের মধ্যে অনেকটাই যেন আমাদের নিজেদের প্রতিচ্ছবি।
ডোরেমন ছিল অনেকের শৈশবের নিরাপদ ও নির্ভার জায়গা
বাস্তব জীবনেও তো সবাই সবকিছুতে সফল হয় না। কেউ পরীক্ষায় ভালো করে, কেউ ক্যারিয়ারে এগিয়ে যায়, আবার কেউ সম্পর্ক কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে বারবার ভুল করে। নোবিতা তাই মনে করিয়ে দেয়-ব্যর্থ হওয়া মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
ডোরেমন ছিল শৈশবের নিরাপদ জায়গা
আজ মন খারাপ হলে আমরা গান শুনি, সিনেমা দেখি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডুবে থাকি। কিন্তু অনেকের শৈশবে এমন এক স্বস্তির জায়গা ছিল ডোরেমন। একই চরিত্র, একই বাড়ি, একই স্কুল, একই বন্ধুদের দুষ্টুমি-সবকিছু এতটাই পরিচিত ছিল যে ডোরেমন দেখার সময় বাইরের পৃথিবীর চিন্তা যেন কিছুক্ষণের জন্য দূরে সরে যেত।
এ কারণেই অনেক বছর পরও ডোরেমনের কোনো পুরোনো দৃশ্য, গান কিংবা চরিত্র সামনে এলে অদ্ভুত এক ভালো লাগা তৈরি হয়। কয়েক মিনিটের জন্য মনে হয়, যেন আবার সেই ছোট বয়সে ফিরে যাওয়া গেছে। ডোরেমন তাই অনেকের কাছে শুধু একটি কার্টুন নয়; এটি শৈশবের স্মৃতি, নিরাপত্তা এবং নির্ভার সময়ের প্রতীক।
ডোরেমনের অদ্ভুত গ্যাজেট ছিল শৈশবের সবচেয়ে বড় বিস্ময়
গ্যাজেটে চাওয়া সময়
ছোটবেলায় ডোরেমনের চার-মাত্রিক পকেটটাই ছিল সবচেয়ে বড় বিস্ময়। ‘এনিওয়্যার ডোর’ দিয়ে মুহূর্তেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া, ‘টাইম মেশিন’ দিয়ে অতীত কিংবা ভবিষ্যতে যাওয়া, আর ‘মেমোরি ব্রেড’ দিয়ে কঠিন পড়া মুখস্থ করা-এসব কল্পনা করতেই ভালো লাগত। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইচ্ছেগুলোও বদলে যায়।
এখন হয়তো কেউ চায় অফিসের কাজটা একটু আগে শেষ হোক। কেউ চায় যানজট ছাড়াই দ্রুত বাড়ি ফিরতে। কেউ চায় পরিবারের সঙ্গে আরও কিছুটা সময় কাটাতে। কেউ আবার ফিরে পেতে চায় পুরোনো কোনো প্রিয় মানুষ কিংবা হারিয়ে যাওয়া একটি সময়। তখন বোঝা যায়, ডোরেমনের গ্যাজেটের প্রতি আমাদের আকর্ষণ আসলে শুধু জাদুর প্রতি ছিল না। আমরা চাইতাম-জীবনটা যেন একটু সহজ হয়।
নোবিতার ব্যর্থতার গল্পে বড় হয়ে অনেকে নিজেদের ছায়া খুঁজে পান
বন্ধুত্বের মূল্যও বড় হয়ে বোঝা যায়
নোবিতা, ডোরেমন, শিজুকা, সুনিও আর জিয়ান তাদের সম্পর্ক কখনো হাসির, কখনো ঝগড়ার, আবার কখনো ভীষণ আবেগের। ছোটবেলায় কে কাকে মারল, কে কাকে ভয় দেখায় সেটা ছিল মজার বিষয়। কিন্তু বড় হওয়ার পর বোঝা যায়, তাদের সম্পর্কের ভেতরেও বাস্তব জীবনের বন্ধুত্বের অনেক ছবি লুকিয়ে আছে।
বন্ধুত্ব মানে সবসময় একই মত হওয়া নয়। ঝগড়া হবে, অভিমান হবে, কেউ ভুল করবে। কিন্তু প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো, ভুলের পর ক্ষমা করা এবং বিপদে বন্ধুকে একা না ফেলা- এসবই একটি সম্পর্ককে সত্যিকারের করে তোলে। তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডোরেমন ও নোবিতার বন্ধুত্বটাও যেন আরও গভীর মনে হয়।
বড় হয়ে ডোরেমন কেন আরও ভালো লাগে?
কারণ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পৃথিবীটাও জটিল হয়ে যায়। শৈশবে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল হয়তো হোমওয়ার্ক শেষ না করা কিংবা পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়া। বয়স বাড়ার পর সেই জায়গা নেয় চাকরি, অর্থ, ভবিষ্যৎ, সম্পর্ক, পরিবার, দায়িত্ব এবং নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই। তখন ডোরেমনের সরল পৃথিবীটা অন্যরকম শান্তি দেয়।
ডোরেমন এমন একটি পৃথিবীর কথা ভাবতে শিখিয়েছে, যেখানে অসম্ভবকেও কল্পনা করা যায়। কর্মব্যস্ত ও একঘেয়ে জীবনে যখনই এই প্রজন্ম ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ডোরেমনের একটি পুরোনো পর্ব তাদের মুহূর্তেই ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে শৈশবের সেই সরল সময়ে।
ডোরেমন প্রজন্ম আসলে কী শিখেছে?
ডোরেমন দেখে বড় হওয়া প্রজন্ম হয়তো প্রযুক্তির বিস্ময়ের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে, কিন্তু একই সঙ্গে তারা শিখেছে কল্পনা করতে। শিখেছে বন্ধুত্বের মূল্য, ভুল করার পর আবার উঠে দাঁড়ানোর প্রয়োজন এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও আশাবাদী থাকার কথা।
সবচেয়ে বড় কথা, তারা এমন একটি সময়ের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে, যখন বিনোদনের জন্য সবসময় মোবাইল ফোনের প্রয়োজন হতো না। একটি টেলিভিশন, কয়েকজন প্রিয় কার্টুন চরিত্র আর স্কুল শেষে এক প্লেট নাশতাই যথেষ্ট ছিল একটি সুন্দর বিকেলের জন্য।
তাই আজ ডোরেমন দেখলে শুধু নোবিতা কিংবা ডোরেমনকে দেখা হয় না। দেখা হয় নিজের ফেলে আসা শৈশবটাকেও।
এ কারণেই ডোরেমন আজও পুরোনো হয় না। বয়স আমাদের বদলে দেয়, জীবনকে জটিল করে তোলে, কিন্তু কিছু শৈশব কখনো পুরোনো হয় না।
সূত্র: মিডিয়াম, আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স
এসএকেওয়াই


