September 1, 2026

২০ বছরেও নির্দিষ্ট কাঠামোয় দাঁড়ায়নি পেশাদার ফুটবল লিগ

0
og_1788279487_6a96fabf20e9e.jpeg


বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর আবারও ১৩ দল নিয়ে মাঠে গড়ানোর পথে। ২০২০-২১ মৌসুমের পর পাঁচ আসর পেরিয়ে দেশের পেশাদার ফুটবলে ফিরছে ১৩ দলের লিগ। সবকিছু পরিকল্পনামতো এগোলে এটি হবে বাংলাদেশের পেশাদার ফুটবলের ইতিহাসে পঞ্চমবারের মতো ১৩ দল নিয়ে শীর্ষ লিগ আয়োজন।

২০০৭ সালে দেশের প্রথম পেশাদার ফুটবল লিগ হিসেবে ‘বি লিগ’ নামে যাত্রা শুরু করে প্রতিযোগিতাটি। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে অপেশাদার যুগের অবসান ঘটিয়ে পেশাদার কাঠামোর নতুন অধ্যায় শুরু হয়। তবে দুই দশক পেরিয়ে গেলেও সেই পেশাদার কাঠামো এখনো স্থায়ী রূপ পায়নি।

দল ঠিক নেই, নাম ঠিক নেই, ঠিক নেই স্টেডিয়ামও। একেক আসর হয় একেক রকম। প্রতি বছরই নতুন দল আসে, নতুন মাঠ যোগ হয়। তবে কোনো কিছুই স্থির থাকে না। এই ২০ বছরে পেশাদার ফুটবল লিগে ২৭টি দলের অভিষেক হয়েছে। এবার হবে আরও দুটি দলের। অর্থাৎ সংখ্যাটা একেবারেই কম নয়। তবে হাতে গোনা কয়েকটি দল ছাড়া বাকিরা আসে আর যায়।

বসুন্ধরা কিংস ছাড়া আর কোনো ক্লাবের নিজস্ব মাঠ নেই। অথচ পেশাদার লিগের অন্যতম প্রধান শর্তই হচ্ছে ক্লাবের নিজস্ব ভেন্যু থাকা। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি ক্লাব মোহামেডান ও আবাহনীকেও হোম ভেন্যু করতে হয় অন্য মাঠে গিয়ে। এই দুটি দলই অভিষেক আসর থেকে নিয়মিত পেশাদার লিগ খেলছে। আর কোনো ক্লাব নেই, যারা ২০০৭ সালের অভিষেক লিগে খেলার পর থেকে নিয়মিতভাবে শীর্ষ লিগে রয়েছে।

২০০৯-১০ মৌসুমে প্রথমবারের মতো ১৩ দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় দেশের শীর্ষ পেশাদার ফুটবল লিগ। তবে পরের মৌসুমগুলোতে দলসংখ্যায় একাধিকবার পরিবর্তন এসেছে। ক্লাবের অবনমন, নতুন দলের উত্তরণ এবং লিগের কাঠামো পরিবর্তনের কারণে কোনো মৌসুমে ১০, কোনো মৌসুমে ১১, আবার কোনো মৌসুমে ১২ দল নিয়ে হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ ফুটবল প্রতিযোগিতা।

দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৮-১৯ মৌসুমে আবারও ১৩ দল নিয়ে মাঠে গড়ায় বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ। এরপর ২০১৯-২০ মৌসুমেও ১৩ দল নিয়ে শুরু হয় দেশের শীর্ষ লিগ। কিন্তু সেই আসর শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পায়নি। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে লিগ মাঝপথে স্থগিত হয়ে যায় এবং পরে তা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ফলে ওই মৌসুমে কোনো চ্যাম্পিয়ন নির্ধারিত হয়নি।

সাবেক তারকা ফুটবলার ও সিনিয়র কোচ সফিকুল ইসলাম মানিক এভাবে হুটহাট সিদ্ধান্তে দল বাড়ানোকে পেশাদার কাঠামোয় গ্রহণযোগ্য মনে করেন না। বিশেষ করে শীর্ষ লিগ থেকে নেমে যাওয়া তিনটি দলকে আবার খেলার সুযোগ করে দেওয়ার কোনো মানে হয় না বলে মনে করেন তিনি।

মানিক বলেন, ‘দল নেওয়া যায় যদি সেই দলগুলো মানসম্মত হয়। আমাদের আগে ভাবতে হবে দেশে মানসম্মত ফুটবলার আছে কি না। শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র, সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্রের মতো দল আসলে ভালো হতো। অথবা ঢাকার বাইরের কোনো শক্তিশালী দল। এবার চট্টগ্রামের একটি দল উঠেছে বাংলাদেশ ফুটবল লিগে। তারা প্রথম আসরে কেমন করে সেটাও দেখতে হবে। ঢাকার শক্তিশালী দল নিলে সেটা লিগের জন্য ভালো হতো।’

বাংলাদেশে পেশাদার লিগ শুরু হয়েছে ২০ বছর আগে। এতদিনেও কোনো উন্নয়ন হয়নি উল্লেখ করে সফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, ‘দেড় যুগের অধিক সময়েও পেশাদার লিগ কোনো কাঠামোয় দাঁড়ায়নি। বাফুফের উচিত ক্লাবগুলোকে চাপ দিয়ে বা সহযোগিতা করে পেশাদারিত্ব আনা। আর যতদিন কর্মকর্তাদের চোখ থাকবে মসনদে, ততদিন দেশের ফুটবলের উন্নতি হবে না। এখন প্রবাসী ফুটবলারের জোয়ার চলছে। সেটা আসবে, ঠিক আছে। আমাদের দেশের খেলোয়াড় তৈরির কথাও তো ভাবতে হবে। এবার দেখা যাচ্ছে নেপালের ফুটবলার ঝাঁকে ঝাঁকে আসছেন। আমি মনে করি, বাংলাদেশের লিগে খেলে নেপালের জাতীয় দলের ফুটবলাররাই লাভবান হবে। এখানে যে মানের বিদেশির বিপক্ষে খেলবেন, তারা সেই মানের বিদেশি নেপালের ঘরোয়া লিগে খেলে না। আমাদের কোনো ফুটলার তো অন্য দেশের লিগে নেয় না। ভারতের লিগে যদি একজন ফুটবলারও খেলার সুযোগ পেতেন, তাহলে বুঝতাম।’

দলসংখ্যা বাড়ায় লিগের ম্যাচসংখ্যা ও ব্যাপ্তিও বাড়বে। আরও বেশি ফুটবলার দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার সুযোগ পাবেন। তবে বড় পরিসরের এই লিগ সফল করতে ক্লাবগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, মাঠ ও অবকাঠামো এবং প্রতিযোগিতার মান ধরে রাখার চ্যালেঞ্জও থাকবে বাফুফের সামনে।

হঠাৎ করেই এবার লিগের দলসংখ্যা ১০ থেকে বেড়ে ১৩ হওয়ার পেছনে রয়েছে ফিফার খেলোয়াড় নিবন্ধন নিষেধাজ্ঞাজনিত বিশেষ পরিস্থিতি। আবাহনী, বসুন্ধরা কিংস ও ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা থাকায় নতুন মৌসুমের জন্য খেলোয়াড় নিবন্ধন ও দল গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা সময়মতো প্রত্যাহার না হলে ক্লাবগুলো প্রতিযোগিতামূলক দল গড়তে পারবে কি না, এমনকি লিগে অংশ নিতে পারবে কি না- সেই প্রশ্নও সামনে আসে।

তিনটি ক্লাবকে ঘিরে এই অনিশ্চয়তায় ১০ দলের লিগের দলসংখ্যা আরও কমে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে বাফুফে আগের মৌসুমে অবনমিত আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ ও ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবকে শীর্ষ লিগে রেখে দেয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদেরও প্রিমিয়ার লিগে খেলার অনুমতি দেয়। ফলে ১০ দলের পরিবর্তে আসন্ন লিগে দলসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১৩।

দল বাড়ানোর বিষয়টিকে একটু ভিন্নভাবে দেখছেন দেশের অভিজ্ঞ ক্রীড়া সংগঠক ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেডের পরিচালক (ক্রীড়া) মোস্তাকুর রহমান।

‘আসলে বাফুফে গা বাঁচানোর জন্য দল বেশি নিয়ে রেখেছিল। অনেকটা আত্মরক্ষামূলক। বাফুফে হয়তো ভেবেছিল যে দলগুলো ফিফার নিষেধাজ্ঞায় ছিল, তারা যদি কামব্যাক করতে না পারে? তখন তো লিগই আয়োজন করা যাবে না। যে কারণে তারা তিনটি দলকে খেলার অনুমতি দিয়ে রেখেছিল। এখন সব দলই ফিফার নিষেধাজ্ঞামুক্ত হয়েছে। তাই দল বেড়ে ১০ থেকে ১৩ হয়েছে। লিগের মান বৃদ্ধির জন্য বাফুফের এই সিদ্ধান্ত ছিল না। এটা আসলে বিপদে পড়ে নিয়েছে বাফুফে। দল বাড়ায় খেলা বাড়বে। লিগে দলগুলোর উত্থান-পতন হবে। ১০ দলের লিগ আসলে একেবারে ছোট। পয়েন্ট লস করলে কাভার করার সুযোগ কম থাকে। এখন খেলা বেশি। প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়তো হবে, মান বাড়বে বলা যাবে না’- বলছিলেন মোহামেডানের এই কর্মকর্তা।

একটি লিগ মানসম্মত করতে অনেকগুলো ক্রাইটেরিয়া পূরণ করতে হয় উল্লেখ করে মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘শক্তিশালী দল, মানসম্মত খেলোয়াড়, নিজস্ব মাঠ- আরও অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে লিগের মান। আমাদের যে লিগ, সেটা আসলে ১৬ দলেরই হওয়া উচিত। তাহলে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। এবার লিগ নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়েছে। কিছু ক্লাব তো দল গঠনের সুযোগও সেভাবে পায়নি। এই যেমন ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব। দলটি কিছুদিন আগে চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ শেষ করেছে। এখন স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের দল তৈরি করতে হচ্ছে।’

সাবেক তারকা ফুটবলার জাহিদ হাসান এমিলি বাংলাদেশের পেশাদার লিগকে কোনো লিগই মনে করেন না। ‘আসলে এই লিগটা এখন ড্যামেজ। আমি বলব পেশাদার লিগ বাফুফের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। চালানোর জন্য চালাচ্ছে আর কি। বিশ্ব ফুটবল চলে ক্লাব ফুটবলের কার্যক্রমের ওপর। বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। কিছুদিন আমেজ ছিল। এখন তো পুরো বিশ্ব ক্লাব ফুটবল নিয়ে মেতে আছে। আর আমাদের এখানে কয়েকটি ক্লাবের সাসপেনশনের কারণে তারিখ পেছাচ্ছে আর পেছাচ্ছে। ১০ দলের লিগ। হঠাৎ করে ১৩ দল হয়ে গেল। যে তিনটি দলের রেলিগেশন হয়ে গেছে, তাদের আবার খেলার সুযোগ দিচ্ছে। কোনো নিয়ম-নীতি নেই। নামমাত্র দলের সংখ্যা বাড়ায় খেলার সংখ্যা বাড়বে। তাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও বাড়বে না, মানের তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না’- বলছিলেন জাহিদ হাসান এমিলি।

এমিলি প্রশ্ন করেন, ‘এই যে দীর্ঘ ২০ বছর বয়স হয়ে গেল বাংলাদেশের পেশাদার লিগের, কী পরিবর্তন হয়েছে? কোনো কাঠামোর ওপরই দাঁড়াতে পারেনি। আমার কাছে অবাক লাগে যে দল রেলিগেটেড হয়ে যায়, তারা আবার কী করে খেলে? তাহলে তো আগামীতে অন্য ক্লাবগুলোও এরকম করবে। চাইলেই তো ঢোকা যায়, তাই রেলিগেশন হলেও সমস্যা নেই মনে করবে ক্লাবগুলো। আরেকটি বিষয় হলো, আমাদের মানসম্মত ফুটবলারের সংখ্যা কম। তাই এভাবে ক্লাব বাড়লে দেখা গেল ১৮টির পরিবর্তে ২৪টি ম্যাচ খেলবে একটি ক্লাব। এমন ফুটবল ম্যাচ বেশি খেলে কোনো লাভ হবে না। আগে লিগ শক্তিশালী করতে হবে, মান বৃদ্ধি করতে হবে।’

আরআই/আইএইচএস/



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *