September 8, 2026

স্টপেজের চাপে গতি হারিয়েছে কালনী এক্সপ্রেস, ইঞ্জিনেও সংকট

0
moulvibazar-1-mtsfqpv239q4f14-20260908145814.jpg


ঢাকা-সিলেট রুটে দ্রুত ও স্বস্তিদায়ক যাত্রার প্রত্যাশা নিয়ে ২০১২ সালে যাত্রা শুরু করেছিল কালনী এক্সপ্রেস। মাত্র চারটি স্টেশনে যাত্রাবিরতি দিয়ে শুরুতে ট্রেনটি ছিল এ রুটের অন্যতম দ্রুতগামী সেবা। এক যুগের বেশি সময় পর সেই কালনীই এখন যাত্রীদের ভোগান্তির প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে ঢাকা-সিলেট রুটের সবচেয়ে জরাজীর্ণ ট্রেন কালনী এক্সপ্রেস। রাজনৈতিক প্রভাবে যাত্রাবিরতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১টিতে। এর সঙ্গে নিয়মিত বিলম্ব, পুরোনো কোচ, বিনা টিকিটের যাত্রীর চাপ ও সংশ্লিষ্টদের দুর্ব্যবহারে ট্রেনটির সেবার মান নেমেছে তলানিতে।

অন্যদিকে, একটি ইঞ্জিন দিয়ে যাত্রী পরিবহন ছাড়াও তেলবাহী ট্রেনও পরিচালনা করা হয়। এই টানা হেঁচরার কারণে প্রতিদিন ইঞ্জিন সংকটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীদের।

‘কালনী এক্সপ্রেস সিলেট থেকে সঠিক সময়েই ছেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু ঢাকা থেকে ছেড়ে আসতে দেরি হওয়ার কারণে সিলেটে সময়মতো পৌঁছাতে পারে না। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি।’

ঢাকার কমলাপুর স্টেশন থেকে প্রতিদিনই অন্তত এক থেকে আড়াই ঘণ্টা দেরিতে ট্রেনটি যাত্রা শুরু করলেও কোনো জবাবদিহিতা নেই রেল বিভাগের। এমনকি দেরিতে যাত্রা শুরুর বিষয়েও যাত্রীদের কোনো বার্তা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ মনে করেন না সংশ্লিষ্টরা। এ নিয়ে ক্ষোভের শেষ নেই ঢাকা-সিলেট রুটে চলাচলকারী ট্রেন যাত্রীদের।

৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে সিলেটগামী কালনী এক্সপ্রেসের যাত্রা শুরুর কথা ছিল বিকেল ২টা ৫৫ মিনিটে। কিন্তু স্টেশনের ডিজিটিাল স্ক্রিনে বলা হয় বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে কমলাপুর স্টেশন থেকে ট্রেনটি ছাড়বে। ৪টা ১০ মিনিটের পর স্ক্রিন থেকে ট্রেনটি ছাড়ার সময় তুলে নেওয়া হয়। অর্থাৎ সিগন্যাল বলছে ট্রেনটি ছেড়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে ট্রেনটি ছেড়েছে আরও এক ঘণ্টা পর বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে।

একইভাবে ৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে কালনী এক্সপ্রেস সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়ার কথা। স্টেশনের ডিজিটাল স্ক্রিনের ট্রেনটি ছেড়ে যাওয়ার সময় লেখা ছিল ৬টা ১৫ মিনিট। অথচ দুই ঘণ্টা পর ৮টা ১৫ মিনিটে ট্রেনটি সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছে।

সিলেট রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, কালনী এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন শুক্রবার সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে তেলবাহী ট্রেন নিয়ে আখাউড়া যায়। ৫ সেপ্টেম্বর ভোর ৫টা ২৫ মিনিটে কালনীর ইঞ্জিনটি ফের সিলেট পৌঁছায়। এ কারণে শনিবারে দুই ঘণ্টা দেরিতে সিলেট থেকে কালনী ছেড়ে যায়।  

সম্প্রতি ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা কিংবা সিলেট স্টেশন ছেড়ে যাওয়া কোনোটিতেই শিডিউল ধরে রাখতে পারছে না কালনী এক্সপ্রেস। ইঞ্জিন সংকটের কারণে বারবারই শিডিউল বিপর্যয় ঘটছে বলে জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। 

‘কালনীর যতটি স্টপেজ বেড়েছে সবগুলোই রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপে হয়েছে। সব নেতারাই চান নিজের বাড়ির পাশের প্রতিটি স্টেশনেই ট্রেনের যাত্রা বিরতি চান। এটা তাদের প্রভাব বা কর্তৃত্ব দেখানোর একটা প্রতিযোগিতা।’

নিয়মিত শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে মাঝপথের স্টেশনগুলোর যাত্রীদেরও অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এ অবস্থায় স্বস্তির ট্রেন যাত্রায় নাভিশ্বাস অবস্থা যাত্রীদের।

ঢাকা থেকে সিলেট আসা কালনী এক্সপ্রেসের যাত্রী দেলওয়ার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, কমলাপুর স্টেশন থেকে দুই ঘণ্টা দেরিতে ছেড়ে এসেছে কালনী। এই দুই ঘণ্টা কেন দেরি হয়েছে, তার কোনো ব্যাখ্যা বা ঘোষণা দেয়নি রেল কর্তৃপক্ষ। এভাবে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করানোর দায় নেই কারও। নেই কোনো জবাবদিহীতাও।

একইদিন শ্রীমঙ্গল স্টেশন থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিটে কালনী এক্সপ্রেস সিলেট যাবে দেখে টিকিট করেছিলেন সোহামা জান্নাত। রাত ৯টা পর্যন্ত পর্যন্ত অপেক্ষা পরও ট্রেন না আসায় বাধ্য হয়ে বাসে করে সিলেটে আসেন তিনি।

সোহামা জান্নাত বলেন, যাত্রীদের নিয়ে রেল কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেরিতে এলেও কোনো জবাবদিহিতা নেই। এটা কোনোভাবেই কাম্য না।

‘কমলাপুর স্টেশন থেকে দুই ঘণ্টা দেরিতে ছেড়ে এসেছে কালনী। এই দুই ঘণ্টা কেন দেরি হয়েছে, তার কোনো ব্যাখ্যা বা ঘোষণা দেয়নি রেল কর্তৃপক্ষ। এভাবে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করানোর দায় নেই কারও। নেই কোনো জবাবদিহীতাও।’

২০১২ সালের ১৫ মে ঢাকা-সিলেট রুটে চালু হওয়া কালনী এক্সপ্রেসের মাত্র চারটি স্টেশনে ছিল যাত্রা বিরতি। সিলেট থেকে ছেড়ে কুলাউড়া, শ্রীমঙ্গল, শায়েস্তাগঞ্জ ও ঢাকা এয়ারপোর্ট স্টেশনে থামতো ট্রেনটি। এতে সময় লাগতো সর্বোচ্চ ৬ ঘণ্টা। বর্তমানে কোনো কোনো দিন ১০ ঘণ্টারও বেশি লাগছে।  

বর্তমানে ট্রেনটি সিলেট থেকে ছেড়ে মাইজগাঁও, কুলাউড়া, শমসেরনগর, শ্রীমঙ্গল, শায়েস্তাগঞ্জ, হরষপুর, আজমপুর, ব্রাহ্মনবাড়িয়া, ভৈরব, নরসিংদী ও ঢাকা এয়ারপোর্টসহ ১১টি স্টেশনে যাত্রা বিরতি দেয়।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে চারটি স্টেশনে যাত্রা বিরতি থাকলেও রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব ও কর্তৃত্বে এখন ১১টি স্টেশনে থামাতে হয় ট্রেনটিকে। সর্বশেষ হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার হরষপুর স্টেশনে কালনীর যাত্রাবিরতি স্টেশন যুক্ত হয়েছে।

সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কালনীর যতটি স্টপেজ বেড়েছে সবগুলোই রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপে হয়েছে। সব নেতারাই চান নিজের বাড়ির পাশের প্রতিটি স্টেশনেই ট্রেনের যাত্রা বিরতি চান। এটা তাদের প্রভাব বা কর্তৃত্ব দেখানোর একটা প্রতিযোগিতা।

এদিকে ঢাকা থেকে নিয়মিত দেরিতে ছেড়ে আসা ও মাঝপথে বেশ কিছু ট্রেনকে ক্রসিং করায় নির্ধারিত সময়ে সিলেট এসে পৌঁছাতে পারছে না কালনী এক্সপ্রেস। এতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে পর্যটকদের। প্রতিদিন বিকেল ২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটি সিলেট স্টেশনে পৌঁছার কথা রাত ৯টা ৩০ মিনিটে।

গত এক সপ্তাহে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টারের রেকর্ডকৃত তথ্য বলছে, ট্রেনটি গত সপ্তাহে একদিনও নির্ধারিত সময়ে সিলেট এসে পৌঁছায়নি। গত ২৯ আগস্ট সিলেট স্টেশনে কালনী পৌঁছেছে রাত ১১টা ২৫ মিনিটে, ৩০ আগস্ট ১২টা ১০ মিনিটে, ৩১ আগস্ট ১০টা ৪০ মিনিটে, ১ সেপ্টেম্বর ১২টা ১০ মিনিটে, ২ সেপ্টেম্বর ১২টা ১৫ মিনিটে, ৩ সেপ্টেম্বর ১টা ১৫ মিনিটে এবং ৪ সেপ্টেম্বরও ১টা ১৫ মিনিটে।

অর্থাৎ প্রতিদিনই ন্যূনতম ১ ঘণ্টা থেকে ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত দেরিতে সিলেট স্টেশন এসে পৌঁছাচ্ছে। এতে চরম বিপাকে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের। বিশেষ করে যারা সিলেট ঘুরতে আসেন তাদেরকে বেশি ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়। রাত বেশি হওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে হোটেলে যেতে হয় পর্যটকদের।  

সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে ম্যানেজার মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম জাগো ‍নিউজকে বলেন, কালনী এক্সপ্রেস সিলেট থেকে সঠিক সময়েই ছেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু ঢাকা থেকে ছেড়ে আসতে দেরি হওয়ার কারণে সিলেটে সময়মতো পৌঁছাতে পারে না। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি।

তিনি বলেন, ২০১২ সালে কালনী এক্সপ্রেস যাত্রার সময়ে মাত্র চারটি স্টেশনে যাত্রাবিরতি ছিল। কিন্তু এখন ১১টি স্টেশনে বিরতি দেয়। যা কারণে যাত্রার সময় বেড়েছে।

এনএইচআর



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *