সোমবার মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে নতুন পে-স্কেল, ভেঙে ভেঙে বাস্তবায়ন
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন পে-স্কেলের খসড়া সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেলে মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতন দেওয়া হবে। তবে তা একবারে না দিয়ে ভেঙে ভেঙে দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি’র নেতৃত্বে গঠিত সচিব কমিটি দুই অর্থবছরে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছিলেন। সচিব কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে মূল বেতন এবং পরবর্তী অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ভাতা কার্যকর করার কথা ছিল।
তবে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা চূড়ান্ত খসড়ায় এ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকেই নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে, কিন্তু তা ভেঙে ভেঙে দেওয়া হবে। অবশ্য নতুন পে-স্কেল কখন ও কীভাবে কার্যকর হবে, তা মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টায় মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকে নতুন পে-স্কেল অনুমোদন পেলে এরপর প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রজ্ঞাপন জারি করতে এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বিকেলে মন্ত্রিসভার বৈঠকে আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে একটি বৈঠক করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ওই বৈঠকেও নতুন পে-স্কেলের বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ চূড়ান্ত করতে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিই নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে নতুন কাঠামোর খসড়া চূড়ান্ত করেছে।
জানা গেছে, নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে চূড়ান্ত খসড়ার বেশকিছু পার্থক্য রয়েছে। কমিশন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন-ভাতা বাড়ানোর সুপারিশ করলেও নাসিমুল গনি কমিটি ১০০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধির সুপারিশ করেনি।
অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানকে চেয়ারম্যান করে গঠিত কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়।
কমিশনের হিসাবে, প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বর্তমানে বছরে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় অর্থের সংস্থান নিয়ে সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এ অর্থ ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতনকাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। এ কারণে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সাংবাদিকদের বলেন, নতুন পে-স্কেলের অর্থের সংস্থান করতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন হলে ঋণও নেওয়া হবে।
তিনি জানান, পে-স্কেল নিয়ে সাধারণত তিনটি পর্যায়ে কাজ হয়। প্রথম পর্যায়ে পে সার্ভিস কমিশন বা সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পে কমিটি এবং বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে জুডিশিয়াল পে কমিশন তাদের প্রতিবেদন দিয়েছে। এসব প্রতিবেদনের মধ্যে প্রথম দুটির বিষয় সচিব কমিটি পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিয়েছে।
তিনি বলেন, বিচার বিভাগের পে-স্কেলের জন্য মন্ত্রিপরিষদ গঠিত একটি কমিটি রয়েছে। ওই কমিটির প্রথম সভাও হয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা, বিষয়টির সংবেদনশীলতা এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় নিয়ে কমিটি তাদের প্রতিবেদন দেবে। এর মাধ্যমে পে-স্কেল প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় পর্যায় শেষ হবে। এরপর তৃতীয় পর্যায়ে মন্ত্রিসভা সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করবে। কোন কোন বিষয় কবে থেকে বাস্তবায়ন করা হবে, সে সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকেই হবে বলে জানান তিনি।
এমএএস/ইএ


