August 30, 2026

ইরান যুদ্ধ দীর্ঘ করতে চান না মার্কিন সেনা কর্মকর্তারা

0
og_1788103602_6a944bb270dac.jpeg


ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত ছয় মাসে গড়িয়েছে। যুদ্ধ থামার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর চাপও ক্রমেই বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক সেনা, যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন রাখার ফলে বিশ্বের অন্য অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর প্রস্তুতি ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা মনে করছেন।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে দেশটির সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ইরানের বিরুদ্ধে বড় আকারের সামরিক অভিযান আরও দীর্ঘায়িত করার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। এ বিষয়ে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, তারা মনে করছেন, এভাবে অভিযান চালিয়ে যাওয়া টেকসই নয় ও এতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যত্র, এমনকি নিজ ভূখণ্ডের নিরাপত্তা মোকাবিলার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

গোপনীয় ওই মূল্যায়নের বিষয়টি ১৪ আগস্টের ‘সেক্রেটারি অব ডিফেন্স অর্ডার্স বুক’ বা এসডিওবিতে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। নথিটি সাধারণত মাসে দুইবার তৈরি করা হয়। এতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ, বিমান, সেনাসদস্য ও অস্ত্রব্যবস্থার প্রাপ্যতা সম্পর্কে বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের সামরিক অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে কী ধরনের সম্পদ কোথায় ব্যবহার করা হচ্ছে ও বাহিনীর শীর্ষ জেনারেল ও অ্যাডমিরালরা সেই ব্যবস্থাপনা নিয়ে কী ভাবছেন, তারও প্রতিফলন থাকে।

নথিটির বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে তথ্য দিয়েছেন, কারণ এটি শ্রেণিবদ্ধ বা গোপনীয় নথি।

মধ্যপ্রাচ্যে ৫০ হাজারের বেশি সেনা সতর্ক অবস্থায়

ইরানের সঙ্গে সংঘাত অবসানের জন্য তেহরানকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি শর্ত মেনে নেওয়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি বারবার বলেছেন, প্রয়োজন হলে আরও সামরিক পদক্ষেপসহ সব ধরনের বিকল্প তার হাতে রয়েছে।

এ কারণে ইরান যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম কয়েক মাস ধরে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনাকে সতর্ক অবস্থায় রেখেছে। প্রেসিডেন্ট নতুন করে হামলার নির্দেশ দিলে যাতে দ্রুত তা কার্যকর করা যায়, সে প্রস্তুতিই রাখা হয়েছে।

১৪ আগস্টের আদেশ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন কিছু সেনাকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এবং কিছু বাহিনীকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সেখানে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে নথিটির বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এই মোতায়েন আরও বাড়ানোর সম্ভাবনাই সামরিক নেতাদের উদ্বেগ প্রকাশে বাধ্য করেছে বলে তাঁদের ভাষ্য।

ইউরোপ, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী ইউরোপীয় কমান্ড, প্যাসিফিক কমান্ড ও সাদার্ন কমান্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন বলে মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা ‘নন-কনকার’ অবস্থান নিয়েছেন- অর্থাৎ বাহিনী বাড়িয়ে রাখার আদেশের সঙ্গে তাদের মতভেদ রয়েছে। তবে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও তারা প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর আদেশ বাস্তবায়ন করবেন।

ইরান যুদ্ধের জন্য ইউরোপ, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় দায়িত্ব পালনকারী মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও অন্যান্য সরঞ্জামের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট কমান্ডগুলোর নিজ নিজ এলাকায় মিশন পরিচালনা ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে নৌবাহিনী যুদ্ধকালীন চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে সক্ষমতার সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে বলে মূল্যায়নে উঠে এসেছে।

নৌবাহিনীতে সবচেয়ে বড় চাপ

মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর ইরান যুদ্ধের চাপ সবচেয়ে বেশি বলে মূল্যায়নে উঠে এসেছে। নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল হেগসেথকে জানিয়েছেন, বর্তমান মাত্রায় ইরান যুদ্ধকে আর দীর্ঘ সময় সমর্থন করা সম্ভব নয়। কারণ সংঘাত শেষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেখা যাচ্ছে না।

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং ইরানের পাল্টা আক্রমণ মোকাবিলায় নৌবাহিনীকে বিপুলসংখ্যক যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ করতে হয়েছে। পরবর্তী কয়েক মাসে ট্রাম্পের ইরানি বন্দর অবরোধ কার্যকর করা এবং হরমুজ প্রণালি খুলতে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেও এসব জাহাজ ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে কিছু যুদ্ধজাহাজ ও নৌসদস্যের মোতায়েনের মেয়াদ কয়েক মাস করে বাড়ানো হয়েছে।

কডল নথিতে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ডেস্ট্রয়ার বহরের মাত্র প্রায় এক-চতুর্থাংশ এখন মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য পতন।

ইরান অভিযান থেকে তৈরি চাপ একইভাবে চলতে থাকলে যুদ্ধজাহাজগুলোর রক্ষণাবেক্ষণও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে অন্য কোনো সংঘাত তৈরি হলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জাহাজ দ্রুত প্রস্তুত করার সক্ষমতা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে মূল্যায়নে সতর্ক করা হয়েছে।

সম্প্রতি নরফোকে এক অনুষ্ঠানে মোতায়েনের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে কডল বলেন, এটি নৌসদস্যদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। তিনি সাধারণত মোতায়েনের সময় বাড়ানোর পক্ষে নন এবং এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জোরালোভাবে অবস্থান নেন বলেও জানান। তবে তাঁর ভাষায়, যুদ্ধে শত্রুপক্ষেরও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকে।

সেনা ও বিমানবাহিনীতেও বাড়ছে ঝুঁকি

সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর নেতৃত্ব অবশ্য হেগসেথের বর্তমান পরিকল্পনার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে একমত হয়েছে। তবে উভয় বাহিনীই জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি রয়েছে।

মার্কিন সেনাবাহিনীর ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় ২ হাজার সদস্য মার্চে ইরান যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় মোতায়েন করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ইউনিটটি অন্তত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে থাকবে। স্থলপথে ইরানে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হলে এই ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সে কারণে সেপ্টেম্বরের পরও তাদের মোতায়েনের মেয়াদ বাড়তে পারে বলে কিছু সামরিক কর্মকর্তা ধারণা করছেন।

এছাড়া মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে রক্ষা করতে ব্যবহৃত প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনাকারী সেনা ইউনিটগুলোর মোতায়েনও বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

ইরান যুদ্ধ ও এর আগে ইউক্রেনকে দেওয়া সহায়তার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমে গেছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনায় ইরানের হামলা প্রতিহত করার সক্ষমতা সীমিত হয়েছে। তেহরান এখনো ওই অঞ্চলে মার্কিন স্থাপনাগুলোতে সফলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

এর পাশাপাশি থাড বা টার্মিনাল হাই অ্যালটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স ইন্টারসেপ্টর এবং দীর্ঘপাল্লার টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও ইরান যুদ্ধের কারণে কমেছে। থাড শুধু মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনা নয়, ওই অঞ্চলের মিত্রদের সুরক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের রিপার ড্রোন বহরের প্রায় ২৫ শতাংশ হারিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোও কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন অস্ত্র ও গোলাবারুদের ঘাটতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো সঠিক নয় বলে দাবি করেছে।

বিমানবাহিনীর অনেক ইউনিটকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে। এসব ইউনিট বোমাবর্ষণসহ দিনরাত চলা বিভিন্ন সামরিক অভিযানে অংশ নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন, এসব ইউনিটের অনেককেই ২০২৭ সাল পর্যন্ত ওই অঞ্চলে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে শ্রেণিবদ্ধ নথির বিষয়ে বিমানবাহিনী কোনো মন্তব্য করেনি।

অন্য অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ

ইরান যুদ্ধের জন্য শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই চাপ বাড়েনি। ইউরোপীয় কমান্ড ও সাদার্ন কমান্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা হেগসেথকে সতর্ক করেছেন, তাঁদের যুদ্ধজাহাজ ও নজরদারি বিমান সেন্টকমকে দিতে গিয়ে নিজ নিজ এলাকায় এবং মার্কিন ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা কমে গেছে।

প্যাসিফিক কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল পাপারোও তার কমান্ড থেকে নিয়মিত যে পরিমাণ সহায়তা নেওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে একমত নন বলে মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ ও নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার রয়েছে।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্ররাও উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমে যাওয়ায় চীনের বিরুদ্ধে তারা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়তে পারে। এমনকি প্রশান্ত মহাসাগরে চীনকে ঠেকানোর মার্কিন কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান একমাত্র নির্দিষ্ট বিমানবাহী রণতরীও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে। এর আগে ওই রণতরীর জায়গায় থাকা আরেকটি রণতরী টানা ৩০০ দিনের বেশি সময় মোতায়েনে ছিল।

এর আগে যুদ্ধ শুরুর আগেই জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন হোয়াইট হাউসকে সতর্ক করেছিলেন যে দীর্ঘমেয়াদি বড় আকারের সামরিক অভিযান চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পর্যাপ্ত গোলাবারুদ ও মিত্রদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নেই। সম্প্রতি ইউরোপীয় কমান্ডের প্রধান জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকেউইচও পেন্টাগনকে ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেন যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষার জন্য তার হাতে পর্যাপ্ত নৌবাহিনী নেই।

সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রকে একদিকে তেহরানের ওপর সামরিক চাপ বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। সামরিক নেতাদের সাম্প্রতিক ‘নন-কনকার’ অবস্থান সেই দ্বন্দ্বকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট

এসএএইচ



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *