সোনার দাম কি আরও কমবে? জবাব মিলবে যে ৩ প্রশ্নে
সোনার দাম কি আরও কমবে, নাকি ফের বাড়তে শুরু করবে, তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম নির্দিষ্ট একটি সীমার মধ্যে ওঠানামা করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মিরে অ্যাসেট শেয়ারখানের কারেন্সি ও কমোডিটিজ বিভাগের প্রধান প্রবীণ সিংয়ের মতে, আগামী কয়েকদিন সোনার দাম রেঞ্জ-বাউন্ড বা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকতে পারে।
গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) স্পট গোল্ডের দামে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়। তেলের দাম বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী কর্মসংস্থান প্রতিবেদন সোনার বাজারে চাপ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, মার্কিন ডলার সূচকের পতন সোনার দামকে কিছুটা সহায়তা করেছে।
এক সপ্তাহে সোনার দাম কমেছে
গত ৪ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে স্পট গোল্ডের দাম প্রায় ০ দশমিক ৫৫ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৪৩০ ডলারে সপ্তাহ শেষ করেছে।
এর আগে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান তথ্য সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছিল।
৭ সেপ্টেম্বর রাতে একপর্যায়ে স্পট গোল্ডের দাম প্রায় ০ দশমিক ৩৫ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৪১৪ ডলারে লেনদেন হচ্ছিল।
কী বলছে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান তথ্য
৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত আগস্টের নন-ফার্ম পেরোল প্রতিবেদন বাজারের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক শক্তিশালী হয়েছে। আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে ১ লাখ ৬২ হাজার নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে। অথচ পূর্বাভাস ছিল মাত্র ৫৫ হাজার।
জুলাইয়ের চাকরির হিসাবও সংশোধন করে নেতিবাচক ২৩ হাজার থেকে ২১ হাজারে উন্নীত করা হয়েছে। তিন মাসের গড় চাকরি সৃষ্টির সংখ্যা ৩৮ হাজার থেকে বেড়ে ৭১ হাজার হয়েছে।
আগস্টে উৎপাদন খাতে চাকরি বেড়েছে ১৬ হাজার। পূর্বাভাস ছিল ৫ হাজার। বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ১ শতাংশে স্থির ছিল। শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৬১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬১ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে।
তবে মজুরি বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে। গড় ঘণ্টাপ্রতি আয় জুলাইয়ের তুলনায় ০ দশমিক ৩ শতাংশ এবং এক বছর আগের তুলনায় ৩ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। এটি ২০২১ সালের পর সবচেয়ে ধীর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি।
তেলের দামও গুরুত্বপূর্ণ
সোনার দামের ওপর ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত ঘিরে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় সোমবার অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে।
সপ্তাহান্তে দুই দেশের মধ্যে ট্যাংকারে হামলার ঘটনা তেলের বাজারে সরবরাহ-ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
এদিকে ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে শিগগির একটি চুক্তি হতে পারে। এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ।
৭ সেপ্টেম্বর নিকট-মেয়াদি ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৭ দশমিক ২১ ডলারে লেনদেন হচ্ছিল। ৪ সেপ্টেম্বর ডেটেড ব্রেন্টের দাম ছিল ১০০ দশমিক ৬৫ ডলার।
তেলের দাম দীর্ঘ সময় চড়া থাকলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়তে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
চীনের সোনা কেনা অব্যাহত
চীনও সোনার বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আগস্টে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৩ সালের পর এক মাসে সবচেয়ে বেশি সোনা কিনেছে। দেশটির সরকারি সোনার মজুত বেড়েছে প্রায় ৬ লাখ আউন্স বা ২১ টন।
এর মাধ্যমে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনা কেনার ধারাবাহিকতা ২২ মাসে পৌঁছেছে। এ ধরনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রয় সোনার দামের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সহায়ক হতে পারে।
ডলার দুর্বল হলেও সোনার দাম চাপের মুখে
শক্তিশালী কর্মসংস্থান তথ্য প্রকাশের পরও ৭ সেপ্টেম্বর মার্কিন ডলার সূচক কমেছে। জাপানি ইয়েন ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে ওঠায় ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
৭ সেপ্টেম্বর ডলার সূচক প্রায় ৯৮ দশমিক ৮৭ পয়েন্টে ছিল। দিনের হিসাবে সূচকটি কমেছে প্রায় ০ দশমিক ৩ শতাংশ।
১৮ সেপ্টেম্বর ব্যাংক অব জাপানের মুদ্রানীতি ঘোষণা হওয়ার কথা। বাজারে ধারণা করা হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি ও বাড়তে থাকা বন্ডের সুদ সামলাতে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়াতে পারে।
সামনে যেসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ
সোনার দামের জন্য আগামী কয়েকদিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির তথ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
৮ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ফেডের আগস্টের এক বছরের মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার তথ্য প্রকাশ হওয়ার কথা। ১০ সেপ্টেম্বর আসবে আগস্টের প্রডিউসার প্রাইস ইনডেক্স বা পিপিআই। ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হবে আগস্টের কনজ্যুমার প্রাইস ইনডেক্স বা সিপিআই।
চীনের বাণিজ্য ভারসাম্যের তথ্য ৮ সেপ্টেম্বর এবং মূল্যস্ফীতির তথ্য ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হওয়ার কথা। এ ছাড়া ১০ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে।
বাজারে ধারণা করা হচ্ছে, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদের হার বাড়াতে পারে।
সোনার দাম কতটা কমতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের আগে সোনার দাম একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকতে পারে।
ফেডারেল রিজার্ভের কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও সুদের হার নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট। নিউইয়র্ক ফেডের প্রেসিডেন্ট উইলিয়ামস এবং ফেড গভর্নর ওয়ালারের সাম্প্রতিক কিছু তুলনামূলক নমনীয় মন্তব্য সোনার দামকে কিছুটা সহায়তা করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি যদি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে সোনার দামে স্বল্পমেয়াদে বড় চাপ তৈরি হতে পারে।
আবার মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম হলে সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে সোনার দাম আবার দ্রুত বাড়ার সুযোগ রয়েছে।
টেকনিক্যাল হিসাবে সোনার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ‘সাপোর্ট লেভেল’ বা সমর্থনমূলক দাম ৪ হাজার ৩৫০ ডলার। এর নিচে নামলে ৪ হাজার ২৮০ ডলার এবং এরপর ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ২২০ ডলার ‘সাপোর্ট লেভেল’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
সহজভাবে বললে, সোনার দাম কমতে থাকলে ৪ হাজার ৩৫০ ডলারের কাছে এসে পতন থামার বা দাম ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা দেখা যেতে পারে। এই স্তর ভেঙে নিচে নামলে পরবর্তী নজর থাকবে ৪ হাজার ২৮০ ডলারে। সেটিও ভেঙে গেলে ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ২২০ ডলারের অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে ঊর্ধ্বমুখী হলে ৪ হাজার ৫৩০ ডলার প্রথম বাধা। এরপর ৪ হাজার ৬০০ এবং ৪ হাজার ৬৭০ ডলার পরবর্তী প্রতিরোধের স্তর হতে পারে।
অর্থাৎ, এখনই সোনার বড় পতন বা বড় উত্থান নিশ্চিত করে বলা কঠিন। মার্কিন মূল্যস্ফীতির তথ্য এবং ফেডের সুদের হার নিয়ে পরবর্তী ইঙ্গিতই বাজারের দিক নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
কেএএ/








