September 8, 2026

রাজধানীমুখী রোগীর চাপ কমাতে বিভাগীয় সাত হাসপাতালে আসছে আধুনিক যন্ত্র

0
health-minister-mtr51arevhkarta-20260907171029.jpg


রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা বাড়াতে ঢাকাসহ বিভাগীয় সাত মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে প্রায় ৩৭০ কোটি টাকার আধুনিক ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জাপান ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ প্রকল্পের আওতায় এমআরআই, সিটি স্ক্যান, অ্যাঞ্জিওগ্রাফি, ডিজিটাল এক্স-রে, ম্যামোগ্রাফি, গ্যাস্ট্রোস্কোপি, কোলনোস্কোপি ও আলট্রাসনোগ্রাফিসহ অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হবে।

‘শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন (কম্পোনেন্ট-২): দেশের আটটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ডায়াগনস্টিক ইমেজিং ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ (দ্বিতীয় সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় দুটি প্যাকেজে এসব সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর ফলে জটিল রোগ নির্ণয়ে রাজধানী ও বেসরকারি হাসপাতালনির্ভরতা কমার পাশাপাশি বিভাগীয় পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারিত হবে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটির মেয়াদ শুরু হয় ২০১৬ সালের ১ জুলাই। প্রকল্পটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। প্রকল্পটির মোট সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ২০২ কোটি ৩৯ লাখ ২৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ২৭৫ কোটি ৮৮ লাখ ৯ হাজার টাকা এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) ঋণ ৯২৬ কোটি ৫১ লাখ ১৮ হাজার টাকা।

প্রকল্পের আওতায় দেশের আটটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ডায়াগনস্টিক ইমেজিং ব্যবস্থা আধুনিকায়নের কথা বলা হলেও বর্তমান দুটি ক্রয় প্রস্তাবের আওতায় সাতটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য সরঞ্জাম কেনা হচ্ছে। সরঞ্জামগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট ও বরিশাল বিভাগের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডায়াগনস্টিক ইমেজিং ব্যবস্থায় যুক্ত হবে।

জানা যায়, ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রচলিত আইন, বিধি ও নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে জাইকার অনাপত্তিও নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রস্তাব দুটি পর্যালোচনা করে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের সম্মতি দিয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির আগামী বৈঠকে প্রস্তাব দুটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে। দুটি প্যাকেজে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬৯ কোটি ৪৯ লাখ ৪০ হাজার ৩০৬ টাকা।

মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন পাওয়া গেলে পরবর্তী ধাপে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন ও সরঞ্জাম সরবরাহের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো বিভাগীয় পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আধুনিক রোগ নির্ণয় সুবিধা বাড়ানো। এর মাধ্যমে জটিল রোগ শনাক্তকরণে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে এবং রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানী বা বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারের অর্থের পাশাপাশি জাইকা ঋণ ব্যবহার করা হচ্ছে। একটি প্যাকেজে কেনা হবে ডিজিটাল এক্স-রে, এনজিওগ্রাফি, গ্যাস্ট্রোস্কোপি, কোলনোস্কোপি এবং প্যাক্স/রিস (পিএসিএস/আরআইএস)।

এ প্যাকেজের জন্য সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (আরডিপিপি) বরাদ্দ রয়েছে ২১৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এর বিপরীতে সর্বনিম্ন ও যোগ্য দরদাতা হিসেবে জাপানের এরবিস ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডকে সরবরাহকারী হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত দর ২৫০ কোটি ২৭ লাখ ১০ হাজার জাপানি ইয়েন। নির্ধারিত বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২০২ কোটি ৩৬ লাখ ৯১ হাজার ৩০৬ টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের চেয়েও কম অর্থে এ প্যাকেজের সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রথম দফায় ২০২৩ সালের ২৮ মার্চ দরপত্র আহ্বান করা হয়। তখন দুটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিলেও উভয়ের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য না হওয়া এবং জাইকার অনাপত্তি না পাওয়ায় পুনঃদরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

পরে ২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট পুনঃদরপত্র প্রকাশ করা হয়। একই বছরের ১৯ নভেম্বর কারিগরি প্রস্তাব খোলা হয়। এতে এরবিস ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড এবং গ্রিন হাসপাতাল সাপ্লাই ইনকরপোরেটেড অংশ নেয়। কারিগরি মূল্যায়নে এরবিস ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডকে যোগ্য বা ‘রেসপনসিভ’ এবং গ্রিন হাসপাতাল সাপ্লাই ইনকরপোরেটেডকে অযোগ্য বা ‘নন-রেসপনসিভ’ বিবেচনা করা হয়।

এরপর ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে জাইকার অনাপত্তি পাওয়া যায়। পরে ২৪ মে আর্থিক প্রস্তাব খোলা হয়। আর্থিক মূল্যায়নেও এরবিস ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের দর গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়। এ বিষয়ে জাইকার চূড়ান্ত অনাপত্তি পাওয়া যায় ২৯ জুলাই। এরবিস ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড জাপানের টোকিওতে অবস্থিত।

এদিকে, আরেকটি প্যাকেজে রয়েছে এমআরআই, সিটি স্ক্যানার, ম্যামোগ্রাফি ও আলট্রাসনোগ্রাফি। এ প্যাকেজে আরডিপিপিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২১৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় হবে ১৬৭ কোটি ১২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা।

এ প্যাকেজের সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ফুজিফিল্ম হেলথ কেয়ার এশিয়া প্যাসিফিক পিটিই লিমিটেড এবং ফুজিফিল্ম মিডল ইস্ট এফজেডই, দুবাইয়ের যৌথ উদ্যোগকে সরবরাহকারী হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।

যৌথ উদ্যোগটির দর ১ কোটি ৩৭ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার। নির্ধারিত বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ১৬৭ কোটি ১২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। এ দর সরকারি প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে কম এবং প্যাকেজের জন্য নির্ধারিত বরাদ্দের মধ্যে রয়েছে।

এ প্যাকেজের দরপত্রে তিনটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এগুলো হলো- এরবিস ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড, ফুজিফিল্ম হেলথ কেয়ার এশিয়া প্যাসিফিক পিটিই লিমিটেড ও ফুজিফিল্ম মিডল ইস্ট এফজেডই, দুবাইয়ের যৌথ উদ্যোগ এবং সিমেন্স হেলথিনিয়ার্স লিমিটেড।

কারিগরি মূল্যায়নে এরবিস ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ফুজিফিল্মের যৌথ উদ্যোগকে যোগ্য বিবেচনা করা হয়। সিমেন্স হেলথিনিয়ার্সকে কারিগরি মূল্যায়নে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ২৪ মে আর্থিক প্রস্তাব খোলা হলে ফুজিফিল্মের যৌথ উদ্যোগের দর সর্বনিম্ন হিসেবে বিবেচিত হয়।

এরবিস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দর ছিল ২৫০ কোটি ২৭ লাখ ১০ হাজার জাপানি ইয়েন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৯৭ কোটি ৫১ লাখ ৪ হাজার ১৪৯ টাকা। ফলে প্রতিষ্ঠানটি দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। অন্যদিকে, ফুজিফিল্মের যৌথ উদ্যোগের দর বাংলাদেশি মুদ্রায় দাঁড়ায় ১৬৭ কোটি ১২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। এ দরই সর্বনিম্ন হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ফুজিফিল্মের কার্যালয় সিঙ্গাপুরে অবস্থিত।

দুটি প্যাকেজ মিলিয়ে আরডিপিপিতে মোট বরাদ্দ রয়েছে ৪২৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এর বিপরীতে সরঞ্জাম কেনার জন্য প্রস্তাবিত মোট ব্যয় ৩৬৯ কোটি ৪৯ লাখ ৪০ হাজার ৩০৬ টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ৬০ কোটি ৪৫ লাখ ৫৯ হাজার ৬৯৪ টাকা কম ব্যয়ে দুটি প্যাকেজ বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ হিসাবে শুধু বরাদ্দের তুলনায় কম দর পাওয়াই নয়, দুটি প্যাকেজের প্রস্তাবিত ব্যয়ই সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রাক্কলনের মধ্যে রয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে আধুনিক ইমেজিং যন্ত্রপাতির সংকট দীর্ঘদিনের। অনেক ক্ষেত্রেই উন্নত রোগ নির্ণয়ের জন্য রোগীদের রাজধানী কিংবা বেসরকারি হাসপাতালের দিকে যেতে হয়। বিশেষ করে এমআরআই, সিটি স্ক্যান, এনজিওগ্রাফি ও ম্যামোগ্রাফির মতো পরীক্ষা ব্যয়বহুল হওয়ায় সরকারি হাসপাতালে এসব সুবিধা সম্প্রসারণের গুরুত্ব রয়েছে।

তিনি বলেন, ঢাকাসহ দেশের সাতটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আধুনিক রোগ নির্ণয় যন্ত্র বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব যন্ত্র কিনতে যে অর্থ ব্যয় হবে, তার জন্য সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন লাগবে। মন্ত্রিসভা কমিটির আগামী বৈঠকে প্রস্তাব দুটি উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন পাওয়া গেলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।

প্রস্তাবিত দুটি প্যাকেজ বাস্তবায়িত হলে বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে এসব পরীক্ষা ও রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে হৃদ্‌রোগ, ক্যানসার, বিভিন্ন জটিল রোগ এবং নারী ও শিশুদের নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্রুত শনাক্ত করার সুযোগও বাড়তে পারে। এতে রোগীদের উন্নত ও তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।

এমএএস/এমএএইচ/



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *