ডেনমার্কের বর্নহোম দ্বীপে বাংলাদেশিদের সপ্তাহব্যাপী সামার ক্যাম্প
নুরুল ইসলাম জাহাঙ্গীর, ডেনমার্ক
ডেনমার্কের বর্নহোম দ্বীপে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে সপ্তাহব্যাপী সামার ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৩১ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা এ আয়োজনে ছিল খেলাধুলা, হাইকিং, রান্না প্রতিযোগিতা, ঘোরাঘুরি, বাংলা খাবার, আড্ডা ও পারস্পরিক সহযোগিতার নানা আয়োজন।
প্রবাসের ব্যস্ততা ও একঘেয়েমি থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে পরিবার নিয়ে অংশ নেওয়া মানুষদের কাছে আয়োজনটি হয়ে ওঠে আনন্দ ও নতুন সম্পর্ক তৈরির এক বিশেষ উপলক্ষ।

ইসলামিক ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি ডেনমার্কের (আইডব্লিউএসডি) কোপেনহেগেন সাউথ শাখার উদ্যোগে ‘হ্যাপি মুসলিম সামার ক্যাম্প ২০২৬’ শীর্ষক এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় ডেনমার্কের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা বর্নহোম দ্বীপে। এতে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ মোট ৩৪ জন অংশ নেন।
৩১ আগস্ট সোমবার রাত ১২টার দিকে কোপেনহেগেনের খৈই থেকে ফেরিযোগে বর্নহোমের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন অংশগ্রহণকারীরা। এরপর পুরো এক সপ্তাহ দ্বীপটির বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা, খেলাধুলা এবং নানা সামাজিক আয়োজনে সময় কাটান তারা।

বর্নহোম ডেনমার্কের বাল্টিক সাগরে অবস্থিত একটি স্বতন্ত্র দ্বীপ। পাথুরে উপকূল, পাহাড়ি এলাকা, বনভূমি, হ্রদ ও সমুদ্রসৈকতের বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে দ্বীপটি পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। ঐতিহাসিক হ্যামারশুস দুর্গ, হ্যামারেন বাতিঘর, ওপাল হ্রদ, ডিউওডে সৈকতসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখেন ক্যাম্পের অংশগ্রহণকারীরা। প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্যময় পরিবেশে দলবদ্ধভাবে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা তাদের কাছে হয়ে ওঠে বিশেষ আনন্দের।
সাত দিনের আয়োজনে ক্রিকেট, ফুটবল, টেবিল টেনিস, বিলিয়ার্ড, লুডু, বালিশ পাসিংসহ বিভিন্ন খেলাধুলার ব্যবস্থা ছিল। শিশুদের জন্যও ছিল আলাদা খেলাধুলা ও বিনোদনের আয়োজন। পাশাপাশি হাইকিং, প্রকৃতির মাঝে হাঁটা এবং বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার সুযোগ পান অংশগ্রহণকারীরা। সন্ধ্যায় ছিল ক্যাম্পফায়ার ও গ্রিলের আয়োজন। স্থানীয় দোকান থেকে তাজা মাছ ভাজা খাওয়ার অভিজ্ঞতাও অংশগ্রহণকারীদের আনন্দ বাড়িয়ে দেয়।

ক্যাম্পের অন্যতম আকর্ষণ ছিল দেশীয় খাবারের আয়োজন। সপ্তাহজুড়ে বিরিয়ানি, ভুনা খিচুড়ি, পায়েস, গরুর মাংসের ভুনা, আরবীয় খেপসাসহ নানা ধরনের বাংলাদেশি খাবার ও মিষ্টান্ন তৈরি করা হয়। বিশেষ দিক ছিল রান্না ও গৃহস্থালি কাজের বড় একটি অংশ পুরুষ সদস্যরা নিজেরাই সামলান। ফলে নারী অংশগ্রহণকারীরা রান্নাবান্না ও ঘরের কাজের চাপ থেকে অনেকটাই মুক্ত থেকে পরিবার ও অন্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পান।
এমন অভিজ্ঞতায় দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার কারণে যে পারিবারিক আপনত্ব ও একসঙ্গে থাকার অনুভূতি অনেকেই মিস করেন, সেটিই যেন ক্যাম্পে ফিরে পান অংশগ্রহণকারীরা। বাংলাদেশের যৌথ পরিবারের মতো সবাই একে অপরের খোঁজখবর নেওয়া, সহযোগিতা করা ও আপনজনের মতো পাশে থাকার অভিজ্ঞতা তাদের কাছে বিশেষ হয়ে ওঠে।

ক্যাম্পে নারী, পুরুষ ও শিশুদের জন্য বিভিন্ন আয়োজনের পাশাপাশি ছিল বিশেষ রান্না প্রতিযোগিতা। এতে ডেনমার্কের আলবর্গ শহর থেকে অংশগ্রহণকারি শাহরিয়ার মাহিন বিজয়ী হন। পরে তার হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
এছাড়া ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলা ও অন্যান্য প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়। ক্যাম্পে অংশ নেওয়া প্রত্যেকের জন্যও ছিল বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থা।
ক্যাম্পে সুইডেনের মালমো থেকে বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দেন আব্দুল হাদি আল-হেলালী। তিনি ইউরোপের বাস্তবতায় বাংলাদেশি মুসলিমদের পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব, সন্তানদের নিজেদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত রাখা এবং প্রবাসে সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়ে কথা বলেন।

ইউরোপে বসবাসের কারণে অনেক পরিবার নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি প্রবাসে নিজেদের দক্ষতা বাড়িয়ে স্থানীয় সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা এবং বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের একটি ভালো পরিচয় তুলে ধরার বিষয়েও গুরুত্ব দেন।
ক্যাম্পে ডেনমার্কের আলবর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক গবেষক ড. মোহাম্মদ আহসানুল হকের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে জরুরি ব্যক্তিগত কারণে তিনি এতে অংশ নিতে পারেননি।

ডেনমার্কের প্রত্যন্ত অঞ্চল স্কেগেনে বসবাসকারী অংশগ্রহণকারী আরমান বলেন, সেখানে বাংলাদেশি কোনো কমিউনিটি না থাকায় দীর্ঘ সময় বাংলা খাবার খাওয়ার সুযোগ হয় না। এই ক্যাম্পে এসে প্রিয় বাংলা খাবার খাওয়া এবং অনেক পরিচিত মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটানো তার কাছে সৌভাগ্যের বিষয়।
একজন অংশগ্রহণকারী অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘ প্রবাসজীবনে বাংলাদেশের যৌথ পরিবারের যে আপনত্ব, তা অনেকটাই মিস করেন তিনি। তবে বর্নহোমের এই ক্যাম্পে এসে সেই হারিয়ে যাওয়া অনুভূতির স্বাদ পেয়েছেন।
ক্যাম্পের সহআয়োজক শামীম ইমন বলেন, এমন আয়োজনের মাধ্যমে কাছের মানুষদের এক ছাতার নিচে একত্রিত করা সম্ভব হয়েছে।
আইডব্লিউএসডি ডেনমার্কের বহির্বিষয়ক সম্পাদক মেহেদী হাসান তালহা বলেন, বর্নহোমের মতো সুন্দর একটি দ্বীপে এমন আয়োজন অংশগ্রহণকারীদের আরও কাছাকাছি আসতে এবং পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতার বন্ধন দৃঢ় করতে সহায়তা করেছে।

আয়োজক ও আইডব্লিউএসডি কোপেনহেগেন সাউথ শাখার সম্পাদক মির্জা জুলকারনাইন সৃজন বলেন, ব্যস্ততার মধ্যেও যারা সময় বের করে ক্যাম্পে অংশ নিয়েছেন এবং পুরো আয়োজন সফল করতে সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ। ভবিষ্যতেও এমন আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
৭ সেপ্টেম্বর সোমবার বেলা ১১টার দিকে মেহেদী হাসান তালহার সমাপ্তি বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যাম্পের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। পরে বিকেল ৫টার দিকে অংশগ্রহণকারীরা ফেরি যোগে কোপেনহেগেনের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা, একাকিত্ব ও একঘেয়েমি থেকে বেরিয়ে পরিবার ও স্বজনদের মতো মানুষদের সঙ্গে কয়েকটি দিন কাটানোর এই আয়োজন অংশগ্রহণকারীদের মনে তৈরি করেছে নতুন স্মৃতি। হাসি-আড্ডা, খেলাধুলা, প্রকৃতির সান্নিধ্য ও দেশীয় খাবারের স্বাদে বর্নহোম দ্বীপে সাত দিনের জন্য যেন সত্যিই তৈরি হয়েছিল এক টুকরো বাংলাদেশ।
এমআরএম

