‘গুলিতে আশরাফুলের ডান চোখ অন্ধ হয়ে যায়, ইফতিকে তুলে নিয়ে যায় ছাত্রলীগ’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন মো. জাকির হোসেন।
ট্রাইব্যুনালে তিনি বলেন, মোহাম্মদ আশরাফুলের ডান চোখ গুলিতে অন্ধ হয়ে যায় এবং ডান হাতও গুলিতে অচল হয়ে যায়। আর আমার ছেলে ইমতিয়াজ হোসেন ইফতিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ছাত্রলীগের ছেলেরা তুলে নিয়ে যায়।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারিক প্যানেলে প্রথম দিনের জবানবন্দিতে জাকির হোসেন এমন তথ্য জানান। এরপর মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ৯ সেপ্টেম্বর পরবর্তী দিন ধার্য করেন আদালত।
মেনন ও কামরুলের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর বাড্ডাসহ আশপাশের এলাকায় ২৩ জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দুটি ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের দাবি, শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে মেনন ও কামরুল বিভিন্ন ধরনের উসকানি দেন। আওয়ামী লীগ সরকার ও ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ পদে থেকে তারা নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহার ও কারফিউ জারির প্ররোচনা দেন। তাদের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে রাজধানীর বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মেনন ও কামরুল গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন।
জবানবন্দিতে জাকির হোসেন জানান, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই বড় ছেলে রেজাউল করিম রেজাকে খুঁজতে বাসা থেকে নীলক্ষেতে যান তিনি। রেজা ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র এবং ঢাকা কলেজের সামনে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।
ওই দিন ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের বিপরীতে ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেন জাকির। তার ভাষ্য, সেদিন ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশের গুলিতে বহু আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হন। তাদের মধ্যে দুজনকে পপুলার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান তিনি।
পরদিন সকালে সাড়ে ১০টার দিকে আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন জাকির। তিনি বলেন, দুপুর ৩টার দিকে আজিমপুর মেয়র হানিফ জামে মসজিদের সামনে গিয়ে দেখেন পুলিশ, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, মহিলা লীগ ও হেলমেট বাহিনীর সদস্যরা আন্দোলনকারী ছাত্রদের ওপর গুলি চালাচ্ছেন।
জীবন বাঁচাতে আজিমপুরে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিপরীতে নির্মাণাধীন একটি সরকারি ভবনের তৃতীয় তলায় আশ্রয় নেন তিনি।
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, সেখান থেকে দক্ষিণ দিকে একটি গলির ভেতর হাজী সেলিমের ছেলে সোলায়মান সেলিম, ইরফান সেলিম, মতিউর রহমান জামাল, হুমায়ুন কবির, নাসির আহমেদ, সজিব, রাকিব, কমিশনার হাসিবুর রহমান মানিক, আনোয়ার হোসেন আনুসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও যুব মহিলা লীগের লোকজনকে দেখতে পান।
জাকিরের দাবি, তারা তৎকালীন সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্য ছিলেন। তাদের অনেকের হাতে অস্ত্র ছিল এবং তারা পুলিশের সঙ্গে থেকে গুলি চালাচ্ছিলেন।
ছাত্রলীগের ছেলেরা ইফতিকে তুলে নিয়ে যায়
জাকির হোসেন বলেন, আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডের মসজিদের পেছনে সাততলা সরকারি কোয়ার্টারের সামনে তার ছোট ছেলে ইমতিয়াজ হোসেন ইফতি, তার বন্ধু খালেদ সাইফুল্লাহ, মোহাম্মদ আশরাফুলসহ আরও অনেকে আন্দোলনে ছিলেন।
ওই দিন বিকেলে অনেক আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হন। আন্দোলনকারী ছাত্ররা আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেলের কর্তব্যরত চিকিৎসক খালেদ সাইফুল্লাহকে মৃত ঘোষণা করেন। মোহাম্মদ আশরাফুলের ডান চোখ গুলিতে অন্ধ হয়ে যায় এবং ডান হাত গুলিতে অচল হয়ে যায়।
জাকির বলেন, আমার ছেলে ইফতিকে ঢাকা মেডিকেল থেকে ছাত্রলীগের ছেলেরা তুলে নিয়ে যায়। তাকে নির্মম নির্যাতন করে। রাত ১১টার দিকে তার দুই বন্ধু তাকে বাসায় দিয়ে যায়। তার কাছ থেকে এই ঘটনা জানতে পারি।
সায়েমের বুকে গুলি লেগে বুকের পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়
জবানবন্দিতে ১৯ জুলাইয়ের ঘটনার বর্ণনাও দেন জাকির হোসেন। তিনি বলেন, ওই দিন বাড্ডা থেকে তার এক সাবেক সেনা সদস্য বন্ধু ফোন করে জানান, সেখানে অনেক ছাত্র আহত হয়েছেন। তাদের চিকিৎসার জন্য টাকা পাঠাতে বলেন তিনি।
বিকাশ ও ব্যাংকিং সেবা বন্ধ থাকায় বাসা থেকে যতটুকু সম্ভব টাকা নিয়ে বের হন জাকির। ফার্মগেটে বাইতুস শরফ জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করে জাহাঙ্গীর গেটে যান। সেখানে গিয়ে মহাখালী রেলগেটের দিক থেকে জাহাঙ্গীর গেটের দিকে গুলি ছোড়ার শব্দ শুনতে পান।
জাকির বলেন, গুলির শব্দ কমে গেলে মহাখালী রেলগেটের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখেন, আন্দোলনরত কয়েকজন ছাত্র গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত অবস্থায় পড়ে আছেন। তাদের মধ্যে পরিচিত সায়েম খানও ছিলেন।
‘সায়েমের বুকে গুলি লেগে বুকের পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। আন্দোলনকারীদের সহায়তায় তাকে একটি রিকশায় তুলে হাসপাতালে পাঠাই। চিকিৎসার জন্য আমার কাছ থেকে কিছু টাকা দেই।’
প্রয়োজনে গুলি করার পরামর্শ দেন কামরুল-মেনন
জাকির হোসেন আরও বলেন, ওই দিন রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে বাসায় ফিরে জানতে পারেন, ১৪ দলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গে গণভবনে শেখ হাসিনার একটি বৈঠক হয়েছে। সেখানে কারফিউ জারি ও সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয় বলে জানতে পারেন তিনি।
তার ভাষ্য, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ছাত্রদের আন্দোলন বলপ্রয়োগ করে দমন করার জন্য প্রয়োজনে গুলি করার পরামর্শ দেন।
‘তাদের কু-পরামর্শ অনুযায়ী আমাদের শত শত ছেলে-মেয়েকে গুলি করে হত্যা করেছে, আহত করেছে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ’—জবানবন্দিতে বলেন জাকির হোসেন।
এফএইচ/কেএসআর


