September 8, 2026

দেশে নিরক্ষর প্রায় পৌনে ৪ কোটি মানুষ

0
duchenne-muscular-dystrophy-mtqve8qpm9dv59z-20260907124248.jpg


প্রতি বছর ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। এটি কেবল কোনো আনুষ্ঠানিক উদযাপনের দিন নয়, বরং বিশ্বের প্রতিটি কোণে নিরক্ষরতার অন্ধকার দূর করে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এক সার্বিক অঙ্গীকার।
​পৃথিবীকে বদলাতে হলে শিক্ষার চেয়ে বড় কোনো অস্ত্র নেই, আর সেই শিক্ষার প্রাথমিক ভিত্তি হলো অক্ষর।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষার সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২২ লাখ ৮০ হাজার। দেশে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ০৯ শতাংশে উন্নীত হলেও এখনো নিরক্ষর রয়েছে প্রায় পৌনে চার কোটি মানুষ। অর্থাৎ ষাট বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী জনগোষ্ঠীর ২২ দশমিক ৯১ শতাংশ এখনো সাক্ষরতার বাইরে।

ইতিহাসের পাতায় আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস

সরকারি সংজ্ঞায় সাক্ষরতা শুধু অক্ষরজ্ঞান অর্জন বা নিজের নাম স্বাক্ষর করতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাতৃভাষায় পড়তে ও তা অনুধাবন করতে পারা, মৌখিক ও লিখিতভাবে বিভিন্ন বিষয় ব্যাখ্যা করতে পারা, যোগাযোগ স্থাপন এবং গণনা করতে পারার সক্ষমতাকেও সাক্ষরতার আওতায় ধরা হয়।

১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইরানের তেহরানে বিশ্ব শিক্ষামন্ত্রীদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনে সাক্ষরতার গুরুত্ব ও এর বৈশ্বিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে ইউনেস্কো ১৯৬৬ সালের ২৬ অক্টোবর ৮ সেপ্টেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।

১৯৬৭ সালে বিশ্বজুড়ে প্রথমবারের মতো উদযাপিত হয় দিবসটি। সেই থেকে প্রতি বছর নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়ে আসছে এই দিনটি, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সাক্ষরতা শুধু সুযোগ নয়, এটি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার।

বদলে যাওয়া সাক্ষরতার ধারণা

কালের বিবর্তনে সাক্ষরতার সংজ্ঞায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। একসময় কেবল নাম দস্তখত করতে পারা বা সাধারণ বর্ণমালা চিনতে পারাকেই সাক্ষরতা বলা হতো। কিন্তু আজকের বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে উঠছে। ফলে কেবল বর্ণমালা চেনার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত জ্ঞান, তথ্য যাচাইয়ের ক্ষমতা এবং কার্যকরী জীবনমুখী দক্ষতাকে সাক্ষরতার মূল অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখন নিরক্ষরতা দূর করার অর্থ কেবল বই পড়া শেখানো নয়, বরং নাগরিককে ডিজিটাল যুগে খাপ খাইয়ে নেওয়ার যোগ্য করে তোলা।

শিক্ষাবিদরাও বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে নিরক্ষরমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জনে নিরক্ষর মানুষের হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা জরুরি। এরপর ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে তাদের সাক্ষরতার আওতায় আনার উদ্যোগ নিতে হবে। এদিকে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করার সরকারি লক্ষ্যের সামনে বিপুল এই জনগোষ্ঠী বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাক্ষরতার ভূমিকা

একটি সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে সাক্ষরতার বিকল্প নেই। সাক্ষরতা দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, শিশুমৃত্যু হ্রাস, বাল্যবিয়ে রোধ এবং নারী ক্ষমতায়নে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। নিরক্ষরতা দূরীকরণে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘সাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে এখনো উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগের বাইরে রয়েছে। তাদের কাছে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।’

একজন সাক্ষর মানুষ তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে বেশি সচেতন। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে সাক্ষরতার হার যত বেশি, সেসব দেশের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও গণতান্ত্রিক সচেতনতা তত সুদৃঢ়। বিশেষ করে নারীদের সাক্ষরতা অর্জনের মাধ্যমে একটি পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ ইতিবাচকভাবে বদলে যায়।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, ‘সাক্ষরতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অগ্রগতি করেছে। তবে এখনো প্রায় পৌনে চার কোটি মানুষ নিরক্ষর থাকা বড় চ্যালেঞ্জ। নিরক্ষরতা দূর করতে হলে প্রথমে নিরক্ষর মানুষের হালনাগাদ তালিকা তৈরি করতে হবে। এরপর এলাকাভেদে বড় ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।’

বিশ্বজুড়ে বিগত কয়েক দশকে সাক্ষরতার হার

উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও চ্যালেঞ্জ এখনো কম নয়। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে আজও বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শিশু ও বয়স্ক মানুষ সাক্ষরতার আলো থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক শিক্ষায় সমতা আনা ও সাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হলেও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং সকলকে কার্যকর ও ডিজিটাল সাক্ষরতার আওতায় আনা এখন সময়ের বড় দাবি।

​আলোর পথে এগিয়ে যেতে সাক্ষরতা

অক্ষরজ্ঞান মানুষের চিন্তা ও চেতনার দুয়ার খুলে দেয়। ৮ সেপ্টেম্বরের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস আমাদের নতুন করে ভাবতে সুযোগ করে দেয় -কীভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এই মিছিলে রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তি পর্যায় থেকে প্রতিটি মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ একটি অক্ষর শেখানো মানে কেবল একটি মানুষকে শিক্ষিত করা নয়, বরং একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারের হাত থেকে মুক্ত করা।

কেএসকে



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *