উদ্যোক্তা নাকি প্রতারক? ধনকুবের ইলন মাস্ককে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যচিত্র
বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ধনকুবের ইলন মাস্ক। তিনি কি সত্যিই একজন দূরদর্শী উদ্যোক্তা, নাকি নিজের তৈরি গল্প ও প্রভাবের মাধ্যমে মানুষকে প্রভাবিত করা প্রতারক এক ‘কনফিডেন্স ম্যান’? এমন প্রশ্নই সামনে এনেছে অস্কারজয়ী নির্মাতা অ্যালেক্স গিবনির নতুন তথ্যচিত্র ‘মাস্ক’।
প্রায় চার ঘণ্টার এই তথ্যচিত্রটি ২০২৬ সালের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে। এতে ব্যবসা, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ- বিভিন্ন ক্ষেত্রে মাস্কের বিপুল প্রভাব এবং তার ব্যক্তিজীবনের নানা দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
তথ্যচিত্রটি নির্মাণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে গিবনি বলেন, তিনি বুঝতে চেয়েছেন ‘মাস্ক আসলে কী খেলা খেলছেন।’

দীর্ঘদিন ধরে মাস্ককে নিয়মভাঙা প্রতিভাবান উদ্যোক্তা হিসেবে দেখা হলেও তার আচরণ, রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন এবং ডানপন্থি রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অনেককেই বিভ্রান্ত করেছে।
গিবনির ভাষ্য, মাস্কের গল্প তার আগের কিছু আলোচিত চরিত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। এনরন কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী এবং থেরানোসের প্রতিষ্ঠাতা এলিজাবেথ হোমসকে নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার সঙ্গেও তিনি মাস্কের গল্পের মিল খুঁজে পেয়েছেন।
নির্মাতার দাবি, মাস্কের অনেক বক্তব্যের মধ্যেই ‘অবাস্তবতার ছাপ’ রয়েছে। তার ভাষায়, মাস্কের গল্প অনেকটা পুরোনো কনফিডেন্স ম্যান বা শেয়ারবাজারে অতিরঞ্জিত প্রচারণা চালানো ব্যক্তিদের গল্পের মতো।
ইলন মাস্কের ‘কাল্ট’
তথ্যচিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাস্ককে ঘিরে তৈরি হওয়া এক ধরনের ‘কাল্ট’। টেসলার ভক্তদের উচ্ছ্বাস থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা MAGA সমর্থকদের সঙ্গে মাস্কের ঘনিষ্ঠতা। সবই তুলে ধরা হয়েছে এতে।

মাস্কের সিলিকন ভ্যালির শুরুর সময় থেকে শুরু করে স্পেসএক্স ও টেসলার উত্থান এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন ডানপন্থি রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তার সম্পর্ক, সবকিছুরই ধারাবাহিক বিশ্লেষণ রয়েছে তথ্যচিত্রে।
গিবনি মনে করেন, মাস্কের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাস্তববাদী ও স্বার্থনির্ভর দিক রয়েছে। তার দাবি, মাস্কের অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতিই শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
তথ্যচিত্রে টেসলার বহুল প্রচারিত অটোপাইলট প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রাণহানির ঘটনাগুলোও আলোচনায় এসেছে। একইভাবে সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি’ বা DOGE-এর কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে তথ্যচিত্রটির ফটোসেশনে পরিচালক অ্যালেক্স গিবনি, অ্যাশলি সেন্ট ক্লেয়ার ও জো শিফার। – রয়টার্স
মাস্ক অবশ্য তথ্যচিত্রটিকে আগে থেকেই ‘হিট পিস’ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণাত্মক কাজ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি এতে অংশ নেওয়ার জন্য গিবনির আহ্বানও গ্রহণ করেননি।
ব্যক্তিজীবনও আলোচনায়
ইলন মাস্কের ব্যক্তিজীবনও বাদ যায়নি এই তথ্যচিত্রে। তার একাধিক সম্পর্ক এবং অন্তত ১৪ সন্তানের বাবা হওয়ার বিষয়টি এতে উঠে এসেছে। মাস্কের প্রথম স্ত্রী জাস্টিনও তথ্যচিত্রে কথা বলেছেন। তার বক্তব্যে মাস্কের ক্রমবর্ধমান সন্তানসংখ্যাকে অনেকটা ‘অ্যাসেম্বলি লাইন’-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
মাস্কের সাবেক প্রেমিকা ও তার এক সন্তানের মা অ্যাশলি সেন্ট ক্লেয়ারও তথ্যচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি জানান, সম্পর্কের অবসানের পর মাস্কের কাছ থেকে ৪ কোটি ডলারের একটি গোপনীয়তা চুক্তির প্রস্তাব পেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

সেন্ট ক্লেয়ার আরও বলেন, একসময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থি রাজনীতির প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন। এখন সেই ভূমিকার জন্য তার অনুশোচনা রয়েছে।
মাস্কের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ ব্যবহারের সমালোচনাও করেছেন তিনি। তার মতে, মাস্কের বিতর্কিত মন্তব্যগুলো এমন বিভাজনকে উসকে দিচ্ছে, যার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
সবশেষে গিবনি বলেন, তথ্যচিত্রটির কেন্দ্রে ইলন মাস্ক থাকলেও এই গল্পে সমাজের সবাই কোনো না কোনোভাবে জড়িত। তার মতে, মাস্কসহ প্রযুক্তিখাতের বড় বড় ধনকুবেরকে বিপুল ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ সমাজই তৈরি করে দিয়েছে।
এলআইএ
