গুমের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ব্যবস্থা চেয়ে স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি
বাংলাদেশে সংঘটিত গুম, গোপন আটক, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সত্য উদঘাটন, দায়ীদের বিচার এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালন জাতীয় কমিটি।
রোববার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে এসব দাবি জানানো হয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, গত প্রায় দেড় দশকে রাজনৈতিক বিরোধী নেতা-কর্মী, মতপ্রকাশকারী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীসহ বহু মানুষকে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া, গোপন স্থানে আটক, নির্যাতন এবং পরে তাদের অবস্থান অস্বীকার করার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনার সত্য উদঘাটন, বিচার ও জবাবদিহি কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক, সাংবিধানিক ও মানবিক দায়িত্ব।
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে স্মারকলিপিতে বলা হয়, কমিশনের কাছে ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাইয়ের পর ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে শনাক্ত করা হয় এবং ২৮৭টি ঘটনা ‘নিখোঁজ ও মৃত’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলেও কমিশনের সদস্যদের মতামত উল্লেখ করা হয়।
স্মারকলিপিতে ‘আয়নাঘর’-কে গোপন আটক ও নিপীড়নের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে এসব গোপন আটককেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, আলামত সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও নির্দেশদাতাদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
এতে বলা হয়, গুমের অভিযোগের তদন্ত পুলিশের হাতে এককভাবে দেওয়া হলে স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠবে। কারণ অতীতে যেসব রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠেছে, তাদেরই কাঠামোর কোনো সংস্থাকে দিয়ে অভিযোগের তদন্ত করানো হলে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন।
এ কারণে গুমের অভিযোগ তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি স্বাধীন ও কার্যকর তদন্ত কমিশন বা ব্যবস্থা গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপিতে ‘widespread or systematic’ প্রকৃতির গুমের ঘটনায় বিচারিক এখতিয়ার নিয়েও স্পষ্ট আইনি কাঠামোর দাবি জানানো হয়। কোনো ঘটনা তদন্তের শুরুতে বিচ্ছিন্ন মনে হলেও পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর, পরিকল্পিত বা ধারাবাহিক অপরাধের অংশ হিসেবে প্রমাণিত হলে কীভাবে তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হবে, সে বিষয়ে আইনে সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া রাখার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া গুম বা গুমসদৃশ অপরাধ শুধু রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে—এমন সীমাবদ্ধতা না রাখার দাবি জানিয়েছে কমিটি। কোনো সাধারণ ব্যক্তি, সংগঠিত অপরাধী চক্র, রাজনৈতিক বা সশস্ত্র গোষ্ঠী কিংবা অন্য কোনো ‘নন-স্টেট অ্যাক্টর’ এ ধরনের অপরাধ করলে তারও কার্যকর তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপিতে সাম্প্রতিক মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটিও উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, ৩০ বছর বয়সী মৎস্যজীবী মিরাজ শেখকে গত ১০ এপ্রিল সুন্দরবনসংলগ্ন জয়মনি এলাকায় কোস্ট গার্ড সদস্যরা তুলে নিয়ে যান বলে তার পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ। পরে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। কোস্ট গার্ড তাকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করেছে। মিরাজের বাবা হাইকোর্টে রিট করলে ১২ জুলাই আদালত তাকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন।
মিরাজ শেখের অবস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাইকোর্টের নির্দেশ অবিলম্বে বাস্তবায়ন এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে কমিটি।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, গুম থেকে ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সত্য জানার অধিকার, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সময়সীমা নির্ধারণ, দায়ীদের রাজনৈতিক পরিচয় বা পদমর্যাদা নির্বিশেষে বিচারের আওতায় আনা এবং ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায় আইনে স্পষ্ট করার দাবিও জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ প্রণয়নের আগে ভুক্তভোগী পরিবার, মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অর্থবহ ও স্বচ্ছ পরামর্শের দাবি জানিয়েছে জাতীয় কমিটি।
স্মারকলিপিতে মোট ১৪টি দাবি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শক্তিশালী আইন প্রণয়ন, স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা গঠন, গত ১৫ বছরের গুমের ঘটনা পুনরায় যাচাই, নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান নির্ধারণ, গোপন আটককেন্দ্রের তদন্ত, ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
কমিটি বলেছে, গুমের বিচার শুধু অতীতের অপরাধের বিচার নয়; ভবিষ্যতের বাংলাদেশে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যও এটি জরুরি।
এমইউ/এমএমকে



