শীর্ষ ১০ দেশের ৬টি থেকেই কমেছে রেমিট্যান্স
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর শীর্ষ ১০ দেশের ছয়টি থেকেই অর্থপ্রবাহ কমেছে। বিপরীতে চার দেশ থেকে বেড়েছে প্রবাসী আয়। তবে দেশভিত্তিক ওঠানামা থাকলেও সামগ্রিকভাবে জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সাধারণত বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা বিশ্বের কয়েকটি দেশ থেকে। শীর্ষ রেমিট্যান্স উৎসের তালিকায় রয়েছে সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ইতালি, সিঙ্গাপুর, কুয়েত, ওমান ও কাতার। এছাড়া বাহরাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, জর্ডান, অস্ট্রেলিয়া, পর্তুগাল, গ্রিস, কানাডা, স্পেন ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও উল্লেখযোগ্য রেমিট্যান্স আসে।
ছয় দেশ থেকে কমেছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে কাতার, ওমান, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স কম এসেছে। কাতার থেকে জুলাইয়ে ১২ কোটি ১৫ লাখ ৯০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স আসে। আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ১১ কোটি ৩০ লাখ ৯০ হাজার ডলারে। অর্থাৎ এক মাসে কমেছে ৮৫ লাখ ডলার।
ওমান থেকে জুলাইয়ে আসে ১৪ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার। আগস্টে তা কমে হয়েছে ১৩ কোটি ৩৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার। অর্থাৎ কমেছে ৮০ লাখ ডলার। কুয়েত থেকে জুলাইয়ে ১৪ কোটি ৮৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার এলেও আগস্টে এসেছে ১৪ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। এতে এক মাসে কমেছে ৫০ লাখ ৪০ হাজার ডলার।
সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসা দেশ সৌদি আরব থেকেও আগস্টে প্রবাহ কমেছে। জুলাইয়ে দেশটি থেকে ৫৮ কোটি ৭২ লাখ ৯০ হাজার ডলার এলেও আগস্টে এসেছে ৫৫ কোটি ৮৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার। এক মাসে কমেছে ২ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার
সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জুলাইয়ে ২৫ কোটি ৫৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। আগস্টে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৪ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ডলারে। কমেছে ৬০ লাখ ৪০ হাজার ডলার।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে জুলাইয়ে রেমিট্যান্স আসে ২৭ কোটি ৩১ লাখ ৮০ হাজার ডলার। আগস্টে তা কমে হয়েছে ২৬ কোটি ৬৪ লাখ ১০ হাজার ডলার। অর্থাৎ কমেছে ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার।
সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসা দেশ সৌদি আরব থেকেও আগস্টে প্রবাহ কমেছে। জুলাইয়ে দেশটি থেকে ৫৮ কোটি ৭২ লাখ ৯০ হাজার ডলার এলেও আগস্টে এসেছে ৫৫ কোটি ৮৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার। এক মাসে কমেছে ২ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
চার দেশ থেকে বেড়েছে
অন্যদিকে জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, ইতালি ও সিঙ্গাপুর থেকে রেমিট্যান্স বেড়েছে। যুক্তরাজ্য থেকে জুলাইয়ে ৩৯ কোটি ৬৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। আগস্টে তা বেড়ে হয়েছে ৪৫ কোটি ৮০ লাখ ৯০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক মাসে বেড়েছে ৬ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
মালয়েশিয়া থেকে জুলাইয়ে ২০ কোটি ১৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার এলেও আগস্টে এসেছে ২২ কোটি ৮৭ লাখ ১০ হাজার ডলার। বেড়েছে ২ কোটি ৭৩ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
ইতালি থেকে জুলাইয়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ২০ কোটি ৩১ লাখ ১০ হাজার ডলার। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ কোটি ২৫ লাখ ৩০ হাজার ডলারে। এক মাসে বেড়েছে ৯৪ লাখ ২০ হাজার ডলার।
সিঙ্গাপুর থেকেও রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। জুলাইয়ে দেশটি থেকে ১৩ কোটি ৬৯ লাখ ৮০ হাজার ডলার এলেও আগস্টে এসেছে ১৫ কোটি ১ লাখ ৯০ হাজার ডলার। অর্থাৎ বেড়েছে ১ কোটি ৩২ লাখ ১০ হাজার ডলার।
সব মিলিয়ে শীর্ষ রেমিট্যান্স উৎস দেশগুলোর মধ্যে ছয়টি থেকে অর্থপ্রবাহ কমলেও চারটি দেশ থেকে তা বেড়েছে। ফলে দেশভেদে রেমিট্যান্সের ওঠানামা থাকলেও আগস্টে সামগ্রিক প্রবাহ জুলাইয়ের তুলনায় ঊর্ধ্বমুখী ছিল। জুলাই মাসে এসেছে ২৮৫ কোটি ৮৬ লাখ ডলার এবং আগস্টে আসে ২৯৬ কোটি ৬৬ লাখ ডলার, যা তিন বিলয়ন ডলারের নিচে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটে বিশ্ব অর্থনীতির উৎপাদন খাতে কিছুটা চাপ তৈরি হলেও বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে এখনো এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। তবে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী আয়ে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।- আরিফ হোসেন খান, মুখপাত্র, বাংলাদেশ ব্যাংক
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে চাকরি হারানো এবং দেশে ফেরার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প দেশগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন খাত বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটে বিশ্ব অর্থনীতির উৎপাদন খাতে কিছুটা চাপ তৈরি হলেও বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে এখনো এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। তবে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী আয়ে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবে উপাচার্য এবং অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবদুল বায়েস জাগো নিউজকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব এখনো প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর ব্যাপকভাবে পড়েনি। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও কর্মসংস্থান কমে যাওয়া বা মজুরি হ্রাসের বড় ধরনের প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।’
তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে তেল উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম অনেকটা চাপের মুখে। এর ফলে প্রবাসীদের দেশে অর্থ পাঠানোর সক্ষমতা কিছুটা কমছে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।’
এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ‘চলমান সংকট দীর্ঘ সময় কর্মহীন থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষেও তাদের বেতন-ভাতা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। এতে কর্মসংস্থান ও আয় কমে গিয়ে শেষ পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা থাকে।’
ইএআর/ইএ





