September 13, 2026

৯ হাজার নটিক্যাল মাইল বেশি ঘুরে এসে দুর্যোগের মুখে এমটি নিনেমিয়া

0
dron-ms4si5qcmrtls3u-20260728210951.jpg


লোহিত সাগরে হুতি ও ইরানি ড্রোন আতঙ্কে প্রায় ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল বেশি ঘুরে এসেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অপরিশোধিত জ্বালানিবাহী ট্যাংকার জাহাজ ‌‘এমটি নিনেমিয়া’।

শনিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়ার পূর্বনির্ধারিত স্থানে পৌঁছায় জাহাজটি। কিন্তু সাগর উত্তাল ও প্রবল স্রোতের কারণে নোঙর না করেই নিরাপত্তাজনিত কারণে মহেশখালীর গভীর সাগরে চলে যায়। সন্ধ্যায় আগের স্থানে এসে ক্রুড খালাসের কথা রয়েছে এমটি নিনেমিয়ার।

এর আগে সৌদি আরবের ইয়ানবু থেকে প্রায় এক লাখ টনের বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি নিয়ে গত ২৩ আগস্ট বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয় ‌‘এমটি নিনেমিয়া’। ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য আমদানি করা এসব ক্রুড পরিবহন করছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)।

সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে স্বাভাবিক চার হাজার ২শ নটিক্যাল মাইল দূরত্বের রুটের পরিবর্তে সুয়েজ খাল, জিব্রাল্টার প্রণালি দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ হয়ে প্রায় ১৩ হাজার ১২৯ নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসেছে জাহাজটি।

বিএসসির ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে সৌদি আরবের ইয়ানবু থেকে লোহিত সাগর দিয়ে বাব আল মান্দেব প্রণালি হয়ে (লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল) বিপিসির আমদানি করা ক্রুডবাহী জাহাজ ভারত মহাসাগর হয়ে বাংলাদেশে আসতো। কিন্তু লোহিত সাগর ও বাব আল মান্দেবে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঝুঁকি থাকায় রুট পরিবর্তন করে সুয়েজ খাল-জিব্রাল্টার এবং দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ (কেপ অব গুড হোপ) হয়ে বাংলাদেশে আসতে হয়েছে নিনেমিয়াকে।

বিএসসির তথ্য অনুযায়ী, ইয়ানবু থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের দূরত্ব ৪২শ নটিক্যাল মাইল। ইয়ানবু থেকে অপরিশোধিত তেলের জাহাজ চট্টগ্রামে আসতে সময় লাগতো ১৩-১৫ দিন। রুট পরিবর্তনের কারণে ইয়ানবু থেকে বর্তমানে ১৩ হাজার ১২৯ নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হচ্ছে এমটি নিনেমিয়াকে। এতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে আরও ৩৪ দিনের মতো সময় বেশি লাগছে।

এতে পার্সেলটি বহনের ক্ষেত্রে মূল ভাড়ার পাশাপাশি ৫৩ লাখ ৯৬ হাজার ৭৩৩ ডলার অতিরিক্ত খরচের কথা জানিয়ে গত ২৩ জুলাই বিপিসিকে চিঠি দেয় বিএসসি। যা বাংলাদেশি টাকায় ৬৬ কোটি ৬২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১২৩ দশমিক ৪৬ টাকা হিসেবে)।

মূলত লোহিত সাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে সুয়েজ খাল। এটি ইউরোপ এশিয়ার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সমুদ্রপথ। পাশাপাশি ভূমধ্যসাগরকে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে যুক্ত করে জিব্রাল্টার প্রণালি। আর দক্ষিণ আফ্রিকার আটলান্টিক মহাসাগর উপকূলে অবস্থিত পাথুরে অন্তরীপ উত্তমাশা।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি পরিশোধন করে ইআরএল। এতে পরিশোধনে ব্যবহৃত শতভাগ অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ জি টু জি পদ্ধতিতে সৌদি আরব থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে মারবান ক্রুড আমদানি করে। আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের শতভাগ পরিবহন করে সরকারি পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিএসসি।

বিএসসির তথ্য বলছে, ২২ জুলাই লে-কেন সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে এক লাখ টন অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড টনপ্রতি ১২২ দশমিক ৩১৮৪৭১ ডলারে পরিবহনের দায়িত্ব পায় এমটি নিনেমিয়া। এজন্য জাহাজটি শিডিউল অনুযায়ী ২৩ জুলাই ইয়ানবু বন্দরে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল লোড করে। কিন্তু লোহিত সাগরে ইরানি হামলার আশঙ্কা থাকায় বাব আল মান্দেব দিয়ে জাহাজ চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ থাকার কথা জানিয়ে ওই দিনই বিএসসিকে ইমেইল দেয় জাহাজটির শিপিং এজেন্ট। ইমেইলে রুট পরিবর্তন করে বাব আল মান্দেবের পরিবর্তে বিকল্প রুট সুয়েজ খাল-কেপ অব গুড হোপ হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসার অনুমতি পায় জাহাজটি।

এমটি নিনেমিয়া শনিবার দুপুরে এসেছে। কিন্তু সাগর উত্তাল থাকার কারণে নির্ধারিত স্থানে নোঙর করতে পারেনি। আজ আবার নির্ধারিত স্থানে নোঙর করবে। আশা করছি সন্ধ্যা থেকে ক্রুড ডিসচার্জ (খালাস) শুরু হবে।-ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন অ্যান্ড প্ল্যানিং) মো. মোস্তাফিজার রহমান

বিএসসির তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি ২৬ দশমিক ৩ দিন বাঙ্কারিং খরচ হিসেবে দৈনিক ৪২ দশমিক ৫ টন ভিএলএসএফও (ভেরি লো সালফার ফার্নেস অয়েল) এবং দক্ষিণ আফ্রিকার শীতকালীন খারাপ আবহাওয়ার জন্য অতিরিক্ত ৭ শতাংশ জ্বালানি হিসেবে মোট ১১৯৫ দশমিক ৯৯২৫ টন বাংকারের মূল্য ১০ লাখ ৩৪ হাজার ৫৩৩ ডলার, ভূমধ্যসাগরে দৈনিক ৪২ দশমিক ৫ টন হিসেবে ৭ দশমিক ৬ দিনে ৩২৩ টন এমজিও (মেরিন গ্যাস অয়েল) বাঙ্কারিংয়ের মূল্য ৪ লাখ ৫২ হাজার ২শ ডলার, সুয়েজ খালের টোল ৫ লাখ ২০ হাজার ডলার এবং ৩৩ দশমিক ৯ দিনে অতিরিক্ত জাহাজের ভাড়া দৈনিক ১ লাখ ডলার হিসেবে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ডলার মিলে সাকুল্যে ৫৩ লাখ ৯৬ হাজার ৭৩৩ ডলার অতিরিক্ত ব্যয়ের কথা জানানো হয়।

ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন অ্যান্ড প্ল্যানিং) মো. মোস্তাফিজার রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‌‌‘এমটি নিনেমিয়া শনিবার দুপুরে এসেছে। কিন্তু সাগর উত্তাল থাকার কারণে নির্ধারিত স্থানে নোঙর করতে পারেনি। আজ আবার নির্ধারিত স্থানে নোঙর করবে। আশা করছি সন্ধ্যা থেকে ক্রুড ডিসচার্জ (খালাস) শুরু হবে।’

জাহাজটির স্থানীয় শিপিং এজেন্ট প্রাইম ওশান ট্রেড লিমিটেডের অপারেশনস ম্যানেজার প্রবীর কুমার রায় জাগো নিউজকে বলেন, ‘এমটি নিনেমিয়া স্থানীয় সময় শনিবার দুপুর একটায় কুতুবদিয়ার নির্ধারিত স্থানে আসে। কিন্তু সাগরে প্রবল স্রোত থাকার কারণে ক্যাপ্টেন জাহাজটি অ্যাংকরিং করতে অনিরাপদ বোধ করছিলেন। এজন্য লাইটারিং শুরু করা যায়নি।’

তিনি বলেন, ‘পরে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য জাহাজটিকে মহেশখালীর গভীর সাগরে নিয়ে যাওয়া হয়। আজ বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আগের অবস্থানে নোঙর করবে। আমাদের লাইটারও প্রস্তুত। সন্ধ্যার দিক থেকে লাইটারগুলো ক্রুড নিতে জাহাজের কাছে যেতে পারবে। আশা করছি সন্ধ্যা থেকে লাইটারিং শুরু হবে।’

এমটি নিনেমিয়া জাহাজটি ২০২৪ সালে নির্মিত। মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী জাহাজটির দৈর্ঘ্য ২৫০ মিটার, প্রস্থ ৪৪ মিটার। জাহাজটির ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৮৩৯ টন।

এমডিআইএইচ/এএসএ



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *