৭ বছর ধরে বন্ধ শাহবাগ শিশুপার্ক, শৈশবের আনন্দ বঞ্চিত নতুন প্রজন্ম
রাজধানীর শাহবাগের শহীদ জিয়া শিশু পার্কের আধুনিকায়ন যেন শেষ না হওয়া এক প্রকল্পের নাম। এক বছরের মধ্যে সংস্কার কাজ শেষের কথা বলে সাত বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে পার্কটি। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় শিশুদের অন্যতম প্রধান বিনোদনকেন্দ্রের নামটিই আড়ালে হারিয়ে গেছে।
এখন শাহবাগ শিশু পার্কে নেই আগের কোনো রাইড, নেই শিশুদের কোলাহল। কবে নাগাদ আধুনিকায়নের কাজ শেষ হবে, কবে আবার শিশুদের জন্য খুলে দেওয়া হবে—তারও সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা ধাপের কারণে কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে পার্কের রাইড কেনাসহ আনুষঙ্গিক কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৭ সালের জুনে পার্কটি চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।
শাহবাগের শহীদ জিয়া শিশু পার্ক সাত বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে, ছবি: জাগো নিউজ
তবে নাগরিকদের অভিযোগ, শহীদ জিয়া শিশুপার্ক আধুনিকায়নের নামে নগরবাসীর সঙ্গে তামাশা করছে ডিএসসিসি। এক বছরের কথা বলে বন্ধ করা পার্ক সাত বছরেও খোলেনি। এতে শহরের একটি প্রজন্মের শিশু-কিশোররা ওই পার্কের আনন্দ-বিনোদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কালক্ষেপণ না করে দ্রুত সময়ের মধ্যে পার্কের যাবতীয় কাজ শেষ করে তা খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সরকার একটি প্রজন্মের শিশুদের শৈশবের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। এজন্য সরকারকে ক্ষমা চাইতে হবে। পাশাপাশি পার্কের কাজটি যাতে দ্রুত সময়ে শেষ হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। – পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান
দেশের নগর, আঞ্চলিক ও গ্রামীণ পরিকল্পনাবিদদের জাতীয় পেশাজীবী সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। শাহবাগ শিশুপার্কের বিষয়ে ওই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান জাগো নিউজকে বলেন, শাহবাগ শিশুপার্কে অবকাঠামো উন্নয়নের নামে দীর্ঘদিন পার্কটি বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এটি শুধু গণপূর্ত অধিদপ্তর বা সিটি করপোরেশনের সমন্বয়হীনতা নয়, এটি মূলত সরকারের গাফিলতি। সরকার একটি প্রজন্মের শিশুদের শৈশবের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। এজন্য সরকারকে ক্ষমা চাইতে হবে। পাশাপাশি পার্কের কাজটি যাতে দ্রুত সময়ে শেষ হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
যে পার্ক ছিল শিশুদের বিনোদনের ঠিকানা
শাহবাগের এ শিশুপার্ক একসময় ছিল শিশু-কিশোরদের অন্যতম আকর্ষণ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিভাবকরা সন্তানদের নিয়ে আসতেন এখানে। অল্প টাকায় বিভিন্ন রাইডে চড়ার সুযোগ থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছেও এটি ছিল সহজলভ্য বিনোদনকেন্দ্র।

৭ বছরেও সংস্কার হয়নি শহীদ জিয়া শিশু পার্ক, আনন্দবঞ্চিত শিশুরা

৪০ বছর পর বন্ধ হলো শাহবাগ শিশুপার্ক
পার্কটি বন্ধ হওয়ার পর সেই চিত্র বদলে গেছে। দীর্ঘ সাত বছরে নতুন প্রজন্মের অনেক শিশুই পার্কের রাইডে চড়ার সুযোগ পায়নি। নগরে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও পার্কের সংকটের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনোদনকেন্দ্র দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় শিশুদের স্বাভাবিক বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগও কমেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, আগে যেখানে শিশু পার্ক ছিল, এখন তার বড় একটি অংশে ভূগর্ভস্থ পার্কিং নির্মাণ করা হয়েছে। পার্কিংয়ের ছাদ মাটি থেকে প্রায় চার ফুট উঁচু। আগে পার্কের ভেতরে থাকা রাইডগুলোর এখন কোনো অস্তিত্ব নেই। পার্কের সামনে বসেছে নয়টি টং দোকান।
গত ২৯ আগস্ট বিকেলে ঢাকার মুগদা থেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে শাহবাগ শিশুপার্কের সামনে যান জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, ‘আগে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিভাবকরা বাচ্চাদের নিয়ে এখানে আসতেন। মাত্র ১০ টাকায় ছয়টি রাইড ব্যবহার করতে পারত শিশুরা। ছুটির দিনগুলোতে পার্কে কোলাহল লেগে থাকত। কিন্তু এখন সংস্কারের নামে পার্কটি সাত বছর ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে। এটি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ছাড়া আর কিছুই নয়।’
শাহবাগের শহীদ জিয়া শিশু পার্ক সাত বছর ধরে বন্ধ, ছবি: জাগো নিউজ
পার্কের ফটকের ভেতর ছয় মাস ধরে টং দোকানে চা-পান বিক্রি করেন আতাউর। তিনি বলেন, ‘সরকারি ছুটির দিনে অনেক বাবা-মা শিশুদের নিয়ে এই পার্কে আসেন। কিন্তু পার্কের কাজ শেষ না হওয়ায় মন খারাপ করে তারা ফিরে যান। যাওয়ার সময় অধিকাংশ অভিভাবকই সরকার তথা সিটি করপোরেশনের সমালোচনা করেন।’
ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে ‘স্বাধীনতাস্তম্ভ নির্মাণ–তৃতীয় পর্যায়’ প্রকল্পের আওতায় শাহবাগের শিশুপার্কের নিচে ভূগর্ভস্থ পার্কিং নির্মাণের পরিকল্পনা করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তখন পার্কের যেসব রাইড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় নতুন রাইড কেনা ও পার্ক আধুনিকায়নের জন্য ডিএসসিসিকে ৭৮ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেয় মন্ত্রণালয়। তবে টাকার পরিমাণ কম হওয়ায় ডিএসসিসির তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন প্রস্তাবটি নাকচ করেন। তখন নিজ উদ্যোগে পার্কটি আধুনিকায়নে পরিকল্পনা করে ডিএসসিসি।
এরপর ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে পার্কের সামনে বিজ্ঞপ্তি টাঙিয়ে এটি বন্ধ ঘোষণা করে ডিএসসিসি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পের আওতায় শাহবাগ শিশু পার্কের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করছে। অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে শিশু পার্ক সর্বসাধারণের জন্য বন্ধ থাকবে।
২০২০ সালের মে মাসে ডিএসসিসির মেয়রের দায়িত্ব নেন শেখ ফজলে নূর তাপস। এরপর নিজেদের উদ্যোগে শিশু পার্ক আধুনিকায়নের ফের সিদ্ধান্ত নেয় ডিএসসিসি। এজন্য ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার একটি প্রকল্প তৈরি করা হয়।
২০২৩ সালের আগস্টে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। প্রকল্প অনুযায়ী, সরকারের দেওয়ার কথা ৪৮৩ কোটি টাকা। এর অর্ধেক অনুদান এবং বাকি অর্ধেক ঋণ হিসেবে দেওয়ার কথা। আর ডিএসসিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করার কথা ১২০ কোটি টাকা।
‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর পার্কের সংস্কার কাজের খোঁজখবর নিয়েছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছি। আশা করি, এবার প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।’ – ডিএসসিসির প্রশাসক আব্দুস সালাম
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অংশ ৪৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয় শিশু পার্কের জন্য ১৫টি রাইড কেনা ও স্থাপনে। এসব রাইড ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আনার কথা। কিন্তু দরপত্র চূড়ান্ত হওয়ার আগেই রাইডগুলোর দাম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কিছুদিন আগে গোপনে দেশ ছাড়েন মেয়র শেখ তাপস। এরপর রাইড কেনার কাজ আটকে যায়।
পরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পার্কের রাইড কেনাসহ সার্বিক প্রকল্প মূল্যায়ন করে ডিএসসিসি। এরপর পার্কের অবকাঠামো উন্নয়নের বাধাগুলো দূর হয়। এভাবে প্রায় সাত বছর কেটে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত উন্নয়ন কাজ শেষ হয়নি।

ঝোপঝাড়ে ছেয়ে গেছে ৭৭ লাখ টাকার শিশুপার্ক

কুষ্টিয়া / নামের কারণে দুই দশক ধরে ‘পরিত্যক্ত’ জিয়াউর রহমান শিশু পার্ক
ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, পার্কের নিচে ভূগর্ভস্থ পার্কিং নির্মাণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় যে প্রকল্প নিয়েছিল, সেটি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে শেষ হয়েছে। তারপর ডিএসসিসিকে পার্কের জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন শিশুপার্কের রাইড স্থাপনে কাজ চলছে। ২০২৭ সালের জুনে পার্কটি চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রশাসক আব্দুস সালাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর পার্কের সংস্কার কাজের খোঁজখবর নিয়েছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছি। আশা করি, এবার প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।’
এমএমএ/এমএমএআর/ এমএফএ


