August 30, 2026

শিক্ষিকা হত্যা: সিসিটিভি-আসামির সঙ্গে মিলছে না র‍্যাবের দেওয়া তথ্য

0
arrested-mtfgc3e0o944o33-20260830125719.jpg


সংসদ ভবনের সামনে স্কুলশিক্ষিকা রনজিনা পারভীন (৫৬) নিহতের ঘটনায় মূল সন্দেহভাজনসহ দুজনকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে র‍্যাব। একইসঙ্গে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি জব্দের কথাও জানিয়েছে তারা। তবে, সিসিটিভি ফুটেজে দেখতে পাওয়া মোটরসাইকেলের রঙ ও র‍্যাবের জব্দ মোটরসাইকেলের রঙে অমিল পাওয়া গেছে। আবার, গ্রেফতার এক আসামিও বাইকটি তার নয় এবং তিনি নির্দোষ বলে দাবি করছেন।

গ্রেফতার দুই ব্যক্তি হলেন মোশাররফ হোসেন পনি ওরফে পনি গাজী ও তার সহযোগী সেড্রিক। তাদের কাছ থেকে ইয়ামাহা আর-১৫ মডেলের একটি সাদা রঙের মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। র‍্যাব বলছে, বাইকটি ছিনতাইয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল।

রোববার (৩০ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলায় র‍্যাব-২ ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র‍্যাব-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান।

সংবাদ সম্মেলন শেষে গ্রেফতার মূল সন্দেহভাজনসহ দুই ব্যক্তিকে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়। তখন মূল সন্দেহভাজন মোশাররফ হোসেন চিৎকার করে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবি করেন। এমনকি ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের সঙ্গে তার মোটরসাইকেলের কোনো মিল নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

গতকাল শনিবার ছিনতাইয়ের ঘটনায় যে দুটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে, সেখানেও ছিনতাইয়ে নীল রঙের একটি মোটরসাইকেল দেখতে পাওয়া যায়। ফলে গ্রেফতার আসামি ও জব্দ মোটরসাইকেলের রঙ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

গ্রেফতারের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব কর্মকর্তা নয়মুল হাসান বলেন, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় রনজিনা পারভীন হত্যা মামলার মূল সন্দেহভাজন ছিনতাইকারী মোশাররফ হোসেন ও তার সহযোগী সেড্রিককে রাজধানীর পূর্ব তেজতুরী বাজার এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত ইয়ামাহা আর-১৫ মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে র‍্যাব।

র‍্যাব-২ এর অধিনায়ক বলেন, ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির মালিক রাকিব। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছেন তারা। তবে, ঘটনার দিন মোটরসাইকেলটি পনি গাজীর কাছে ছিল। এ ছাড়া রনজিনা পারভীনের স্বামী আবদুল মতিন ঘটনাস্থলে এই বাইক ব্যবহৃত হয়েছে বলে তাদের নিশ্চিত করেছেন বলে দাবি করেছে র‍্যাব।

র‍্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, তারা প্রাথমিক তথ্য অনুসন্ধানে জানতে পেরেছেন, হত্যার মূল সন্দেহভাজন পনি গাজী একজন পেশাদার ছিনতাইকারী। একাধিক অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর তেজগাঁও, শেরেবাংলা নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক, ভয়ভীতি প্রদর্শন করাসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড করে আসছিলেন। তার বিরুদ্ধে রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন থানায় মোট ১৩টি মামলা রয়েছে।

মামলার বিবরণ উল্লেখ করে অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান বলেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) হাতিরঝিল, আদাবর ও কাফরুল থানায় পনি গাজীর বিরুদ্ধে মাদকের তিনটি; ভাটারা, মোহাম্মদপুর, কাফরুল, বাড্ডা, শাহজাহানপুর থানায় চুরি, ভয়ভীতি প্রদর্শনের ছয়টি; আদাবর, খিলগাঁও, কামরাঙ্গীরচর থানায় চুরি ও সিঁধেল চুরির তিনটি মামলা রয়েছে। এছাড়া, চাঁদপুর মডেল থানায় ডাকাতির প্রস্তুতির একটি মামলা রয়েছে।

নয়মুল হাসান বলেন, পনি গাজী এর আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। জামিনে বের হয়েছেন। তবে কবে বের হয়েছেন, সেটি এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তারা। পুলিশ বিষয়টি যাচাই করছে। আর সেড্রিকের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে, মোটরসাইকেলের মালিক নিশ্চিত করেছে যে পনির পেছনের সিটে সেড্রিকই ছিলেন।

র‍্যাবের তিন যুক্তি

এক প্রশ্নের জবাবে দুই আসামিকে গ্রেফতারের বিষয়ে তিনটি যুক্তি তুলে ধরেন নয়মুল হাসান। তিনি বলেন, প্রথমত, মোটরসাইকেলের মালিক রাকিব তার বক্তব্যে জানিয়েছেন, বাইকটি পনি গাজী জোর করে বিভিন্ন সময় নিয়ে যেতেন। ২৬ আগস্ট থেকে শনিবার বিকেল পর্যন্ত মোটরসাইকেলটি তার কাছেই ছিল। মোটরসাইকেলটি নিয়ে পনি গাজী কী করেন, সে বিষয়ে তিনি জানেন না।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, সিসি ক্যামেরায় দেখতে পাওয়া মোটরসাইকেলচালকের সঙ্গে পনির দৈহিক গঠন মিলে যায়। স্থানীয় ১৫ জন সোর্সকেও ভিডিও দেখিয়ে পনির জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন তারা। উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটি নিহত শিক্ষিকার স্বামীকেও দেখিয়েছেন। তিনিও হুবহু এ রকম মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন।

তৃতীয়ত, রাত আড়াইটা থেকে চারটা পর্যন্ত আসামিদের মোবাইল নম্বরগুলো ওই এলাকা দিয়ে ঘোরাফেরা করেছে। এর বাইরে এই মুহূর্তে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।

রাকিবের সঙ্গে পনি গাজীর সম্পর্ক প্রসঙ্গে নয়মুল হাসান বলেন, আসামি পনির মোটরসাইকেলটির মালিক রাকিবের এলাকার বড় ভাই। আর রাকিব একটি ওয়ার্কশপে কাজ করেন। তাকে বাইক না দিলে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দেওয়া হতো। এ কারণে তিনি তাকে বাইক দিতে বাধ্য হন। রাকিবকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। তিনি কতটুকু সম্পৃক্ত, সেটি তদন্ত করে দেখে তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যদি জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাকেও গ্রেফতার করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত হয়নি।

জব্দ বাইকের রঙ নিয়ে প্রশ্ন

সংবাদ সম্মেলন শেষে দুই আসামিকে র‍্যাব-২ ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর প্রাঙ্গণে ক্যামেরার সামনে হাজির করা হয়। র‍্যাবের চার সদস্য তাদের হাজির করেন। এ সময় পনি গাজী সাংবাদিকদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলে ওঠেন, তিনি এ ঘটনায় জড়িত নন। তাকে জোর করে ধরে আনা হয়েছে। তার বাইকের রং সাদাকালো, কিন্তু ছিনতাইয়ে দেখতে পাওয়া গাড়ির রং ছিল নীল। বিষয়টি তিনি সাংবাদিকদের তদন্ত করে দেখার অনুরোধ করেন। এ কথা বলার পর র‍্যাব তাকে দ্রুত সেখান থেকে সরিয়ে নেয়।

এছাড়া, ঘটনার দিন শনিবার ছিনতাইয়ের ঘটনায় দুটি সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সেই ফুটেজে দেখা গেছে, একটি নীল রঙের মোটরসাইকেল নিয়ে দুই সন্দেহভাজন ব্যক্তি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়কে ঘোরাফেরা করছেন। তবে জব্দ মোটরসাইকেল দাবি করে র‍্যাব যে ছবি গণমাধ্যমে সরবরাহ করেছে, সেটির রং সাদাকালো দেখা গেছে। ফলে গ্রেফতার আসামি ও জব্দ মোটরসাইকেলটি আসলেই ছিনতাইয়ে ব্যবহার হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে নয়মুল হাসান বলেন, আমরা বারবার বলছি, সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে। কারণ, মামলায় আসামি অজ্ঞাত। সন্দেহ থেকেই তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। সন্দেহভাজন থেকেই ধীরে ধীরে জিনিসটা ডেভেলপ করবে। আরও স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করবো। একটু ওয়েট করবো। দুজনকে আমরা থানায় হস্তান্তর করবো। তারপর আদালতের অনুমতি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

যা বলছেন শিক্ষিকার স্বামী

মোটরসাইকেলের বিষয়ে জানতে চাইলে নিহত শিক্ষিকার স্বামী আবদুল মতিন জাগো নিউজকে বলেন, যখন ঘটনা ঘটেছে তখন রোগীকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, তখন মোটরসাইকেলের কালার (রঙ) কী, কেমন মোটরসাইকেল ছিল তা খেয়াল করিনি। কোন রঙের মোটরসাইকেল ছিল তা তখন মার্ক করতে পারিনি।

তিনি বলেন, এমন কোনো কাজ নেই যা প্রশাসন চেষ্টা করলে পারবে না। আমি চাই সুষ্ঠু তদন্ত করে যারা অপরাধ করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।

টিটি/এএমএ



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *