মাদায়েনে মুসার (আ.) সঙ্গে দুই নারীর সাক্ষাৎ, আশ্রয় থেকে আত্মীয়তা
মিশর থেকে বের হয়ে দীর্ঘ আট দিন সফর করে মুসা (আ.) মাদায়েনে পৌঁছলেন। তিনি সফরের প্রস্তুতি ছাড়া এক কাপড়ে মিশর ছেড়েছিলেন। তার সঙ্গে কোনো খাবার বা প্রয়োজনীয় রসদপত্র ছিল না। পথে গাছের পাতা আর লতাপাতা চিবিয়ে তিনি বেঁচে ছিলেন। তাই মাদায়েন যখন পৌঁছালেন, তখন তাঁর শরীর ক্লান্ত, অবসন্ন, পেটের চামড়া পিঠের সাথে লেগে যাওয়ার উপক্রম।
একটি পানির কূপের কাছে পৌঁছে মুসা (আ.) দেখলেন, একদল রাখাল তাদের গবাদিপশুকে পানি খাওয়াচ্ছে। আর সেই ভিড় থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে দুটি মেয়ে। তারা নিজেদের ছাগলের পালকে আটকে রাখছে, যাতে পুরুষদের পালের সাথে মিশে না যায়।
মুসা (আ.) অগ্রসর হয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের কী সমস্যা? তারা জবাবে বলল, রাখালরা তাদের পশুগুলো পানি খাইয়ে সরে না যাওয়া পর্যন্ত আমরা পানি খাওয়াতে পারি না। আমাদের বাবা একজন অতি বৃদ্ধ মানুষ; তাঁর পক্ষে এসে এই কাজ করা সম্ভব নয়।
মুসা (আ.) মেয়ে দুটির অসহায় অবস্থার কথা শুনে তাদের প্রতি সহমর্মী হলেন। তাদের গবাদিপশুগুলোকে পানি খাওয়াতে সাহায্য করলেন। রাখালরা নিজেদের পশুগুলোকে পানি খাওয়ানো শেষ করে এক বিশালাকার পাথর দিয়ে কূপের মুখ বন্ধ করে দিত, যা সরাতে অন্তত ১০ জন বলবান পুরুষের প্রয়োজন হতো। মেয়ে দুটি সাধারণত রাখালদের রেখে যাওয়া অবশিষ্ট পানিই ছাগলদের খাওয়াত। কিন্তু সেদিন মুসা (আ.) একাই সেই ভারী পাথরটি তুলে ফেললেন এবং কূপ থেকে পানি তুলে মেয়ে দুটির সম্পূর্ণ পালকে পানি খাইয়ে দিলেন।
তারপর মুসা (আ.) কূপের কাছে একটি বাবলা গাছের ছায়ায় গিয়ে বসলেন। আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, ‘হে আমার রব! তুমি আমার প্রতি যে কল্যাণই অবতীর্ণ করবে, আমি তারই মুখাপেক্ষী।’ (সুরা কাসাস: ২৪)
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এই আকুল প্রার্থনার সময় তিনি এত ক্ষুধার্ত ছিলেন যে, এক টুকরো খেজুর পেলেও তার উপকার হতো।
লাজুক পায়ে ফিরে এলেন একজন মেয়ে
মেয়েরা দ্রুত বাড়ি ফিরে গেলে তাদের বৃদ্ধ বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, এত দ্রুত তারা কীভাবে বাড়ি ফিরলেন। তারা তখন মুসার (আ.) সেই অভূতপূর্ব সহযোগিতার কথা বর্ণনা করেন। সব শুনে তিনি এক মেয়েকে পাঠালেন মুসাকে (আ.) ডেকে আনতে।
মেয়েটি মুসার (আ.) কাছে গেল লাজুক হয়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন, নারীদ্বয়ের একজন তার কাছে সলজ্জ পদে আসল। সে বলল, আমার বাবা তোমাকে ডাকছেন তুমি আমাদের জন্য জন্তুগুলোকে পানি পান করিয়েছ তোমাকে তার প্রতিদান দেওয়ার জন্য। (সুরা কাসাস: ২৫)
মুফাসসিররা লিখেছেন, মেয়েটি যখন মুসাকে (আ.) ডাকতে গেল, সে তার জামার হাতা দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছিল। কাছে গিয়ে সে বলল, আমার বাবা আপনাকে ডাকছেন, যেন আমাদের ছাগলগুলো পানি খাইয়ে দেওয়ার পারিশ্রমিক তিনি আপনাকে দিতে পারেন।
মুসা (আ.) উঠে দাঁড়ালেন এবং মেয়েটির পিছু পিছু হাঁটতে লাগলেন। পথিমধ্যে বাতাসে মেয়েটির পোশাক ওড়াউড়ি শুরু করলে মুসা (আ.) নিজের দৃষ্টি অবনত করলেন এবং বললেন, তুমি আমার পেছনে হাঁটো এবং পাথর ছুড়ে আমাকে দিক বুঝিয়ে দাও। আমরা এমন পরিবারের মানুষ, যারা নারীর পেছনে তাকাই না।
মেয়েদের বৃদ্ধ বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ
মেয়েদের বাবার কাছে পৌঁছে মুসা (আ.) তার জীবনকাহিনি এবং ফেরাউনের মিশর থেকে পালিয়ে আসার বিবরণ শোনালেন। সেই প্রাজ্ঞ বৃদ্ধ তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, কোনো ভয় নেই, তুমি জালেম সম্প্রদায়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছ। (সুরা কাসাস: ২৫)
এ পর্যায়ে মেয়েদের একজন বাবাকে পরামর্শ দিল, আপনি তাকে রাখাল হিসেবে নিযুক্ত করুন, তিনি শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।
বাবা জানতে চাইলেন, তুমি কীভাবে বুঝলে সে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত? মেয়ে জবাবে বলল, তিনি একা এমন এক বিশাল পাথর তুলেছেন যা ১০ জন পুরুষ ছাড়া সরানো অসম্ভব। আর আসার পথে তিনি আমাকে পেছনে হাঁটতে বলেছেন এবং নিজের দৃষ্টি সংযত রেখেছেন।
ইবনে মাসউদ (রা.) বলতেন, পৃথিবীর সবচেয়ে দূরদর্শী মানুষ তিনজন, ইউসুফকে (আ.) ক্রয়কারী মিশরের আজিজ, মুসার (আ.) সেই হবু স্ত্রী যিনি তাকে নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং হজরত আবু বকর (রা.) যিনি ওমরকে (রা.) খলিফা মনোনীত করেছিলেন।
মাদায়েনের ওই বৃদ্ধ কে ছিলেন?
মাদায়েনের এই বৃদ্ধ অভিভাবক কে ছিলেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিক ও তাফসিরকারদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। বহুল প্রচলিত মত হলো, তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী হজরত শুআইব (আ.)। হাসান বসরী (রহ.) ও ইমাম মালেক (রহ.) এই মত পোষণ করেছেন।
তবে অন্য মুফাসসিরদের মতে, তিনি শুআইবের (আ.) ভাতিজা, চাচাতো ভাই অথবা তাঁর সম্প্রদায়ের কোনো একজন বয়োবৃদ্ধ ইমানদার ব্যক্তি ছিলেন, যার নাম ছিল ‘ইয়াফরুন’। আবার অনেকের মতে, তার নাম ছিল শুআইব, তবে তিনি সুপরিচিত রাসুল শুআইব (আ.) নন।
বিয়ে ও রাখালির চুক্তি
বৃদ্ধ পুরুষটি মুসাকে (আ.) প্রস্তাব দিলেন, আমি আমার এই দুই মেয়ের যে কোনো একজনকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে চাই, এই শর্তে যে তুমি আট বছর আমার ছাগল চরাবে। আর যদি দশ বছর পূর্ণ করো, তবে তা তোমার তরফ থেকে অতিরিক্ত অনুগ্রহ।
মুসা (আ.) রাজি হয়ে বললেন, এটি আমার ও আপনার মধ্যে চুক্তি হিসেবে রইল। দুটি মেয়াদের যে কোনো একটি আমি পূরণ করবো।
এরপর মুসা (আ.) বৃদ্ধের একজন মেয়েকে বিয়ে করেন এবং চুক্তি অনুযায়ী তার সেবায় দশ বছর থাকেন। সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রহ.) বলেন, তিনি ইবনে আব্বাসকে (রা.) জিজ্ঞাসা করেছিলেন, মুসা (আ.) ওই বৃদ্ধের সেবায় কত দিন ছিলেন? আট বছর নাকি দশ বছর? জবাবে ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছিলেন, মুসা (আ.) দীর্ঘতর ও পূর্ণাঙ্গ মেয়াদটি অর্থাৎ ১০ বছর তার সেবায় ছিলেন। আল্লাহর রাসুলগণ যা বলেন, তা পূর্ণমাত্রায় আদায় করেন।
তথ্যসূত্র
- ১. আল-কোরআন, সুরা কাসাস
- ২. তাফসিরে ইবনে কাছির
- ৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া
- ৩. সহিহ বুখারি
- ৪. সুনানে ইবনে মাজাহ
ওএফএফ


