September 5, 2026

মহানন্দা নদী এবং আমিনুল ইসলামের কবিতায় জীবন-ভূগোল

0
dukhu-mtbaya8b4ara9pm-20260827151148.jpg


চাঁপাইনবাবগঞ্জের পলিসমৃদ্ধ চরাঞ্চলে জন্ম নেওয়া আমিনুল ইসলামের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পদ্মা, পাগলা, পাঙ্গাশমারী আর মহানন্দার কোলঘেঁষে। তার কবিতায় মাটি ও মানুষের প্রতি যে গভীর মগ্নতা, তার মূল উৎসই হলো এই নদী। বিশেষ করে মহানন্দা হয়ে উঠেছে তার কবিতার অন্যতম শক্তির জায়গা। আমিনুল ইসলামের কবিতায় মহানন্দার প্রবাহ শৈশবের নস্টালজিয়া বা স্মৃতিকাতরতাকে জাগিয়ে তোলে। জীবনানন্দের চিত্ররূপময়তার মতোই আমিনুল ইসলামের নদী-নিসর্গও বহুমাত্রিক চিত্রে উজ্জ্বল। মহানন্দার শান্ত জলধি, বর্ষার রূপান্তর কিংবা চরের জনজীবন কবির কাব্যিক ক্যানভাসে চিত্রিত হয়েছে গভীর আত্মিক টানে। ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’ কবিতায় নদীটি হয়ে উঠেছে মহাজীবনের বিশাল আয়না। কবি এই নদীর ঘাটে ঘাটে প্রাচীন সভ্যতার পদচিহ্ন খুঁজেছেন।

নদী অববাহিকার লৌকিক সংস্কৃতি, উপনিবেশ-বিরোধী চেতনা এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকারের লড়াই তার কবিতায় উত্তর-উপনিবেশবাদী দৃষ্টিতে ধরা দিয়েছে। নদী এখানে শোষিত চরাঞ্চলের মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক। আমিনুল ইসলাম পেশাগত ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। কিন্তু তার এই বিশ্বভ্রমণ বা বিস্তৃত ভূগোল শেষপর্যন্ত তাকে নিজের শেকড়ের কাছেই ফিরিয়ে এনেছে। ভিনদেশি নদী ও প্রকৃতির সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে তিনি বারবার ফিরে এসেছেন আপন মহানন্দার চরে। যমুনা পার হয়ে এসে প্রাচীন নগরের ঠিকানা কিংবা ব্যস্ত বন্দরের কোলাহলেও কবির মনে বেজে ওঠে মহানন্দার শান্ত সুর। অর্থাৎ মহানন্দা কবির কাছে আঞ্চলিকতার গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বজনীন রূপক হয়ে উঠেছে। নদীমাতৃক চেতনা প্রকাশের জন্য আমিনুল ইসলাম নিজস্ব এক শব্দবুনন তৈরি করেছেন। জল, পলি, নৌকা, ঘাট, চিল ও চরের অনুষঙ্গ তার কবিতায় চিত্রকল্প ও প্রতীকের নতুন মাত্রা যোগ করে। ছন্দের সাবলীল প্রবাহ যেন মহানন্দা নদীরই বহমানতার প্রতিরূপ। নদী তার কাব্যের বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গ উভয় রূপকেই সমৃদ্ধ করেছে।

নদী ও কবিতা—উভয়েরই ধর্ম বহমানতা। একটি জলধারা বয়ে নিয়ে চলে জনপদের পলি ও সংস্কৃতি, অন্যটি শব্দের স্রোতে ধারণ করে মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ এবং অস্তিত্বের গভীর সংকট। বাংলা কবিতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে নদী এক অবিচ্ছেদ্য উপাদান। বাংলা সাহিত্যে নদী ও জনপদকে কেন্দ্র করে বহু কালজয়ী সৃষ্টি রচিত হয়েছে। কবি আমিনুল ইসলাম তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের নাম রাখেন ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’ (২০০৪)। কবিতাগুলো একটি নদীর ভৌগোলিক বিবরণী হিসেবেই থাকেনি, বরং তা হয়ে উঠেছে মানবজীবন, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং স্মৃতির এক অনন্য আলেখ্য। অদ্বৈত মল্লবর্মণ যেমন তিতাস নদীকে তাঁর উপন্যাসের কেন্দ্রে রেখে অমর করে রেখেছেন; আমিনুল ইসলামও তেমনই কবিতার রাজ্যে মহানন্দা নদীকে চিরস্থায়ী রূপ দিয়েছেন। মহানন্দা নদী আমিনুল ইসলামের কবিতায় কেবল কোনো ভৌগোলিক জলধারা নয়; তা মানুষের প্রেম, বিরহ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির মহাকাব্যিক আখ্যান।

নদী ও কবির এই অবিচ্ছেদ্য বন্ধন সমকালীন বাংলা কবিতাকে এক নতুন নন্দনতাত্ত্বিক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। মহানন্দা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সমাজ, বরেন্দ্র অঞ্চলের রুক্ষতা ও উর্বরতার দ্বন্দ্ব এবং পদ্মা-মহানন্দার অববাহিকায় মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই কবিকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছে। মহানন্দাকেন্দ্রিকতা এ গ্রন্থের মূল চালিকাশক্তি। কাব্যের নামকরণ ও রূপক অর্থগ্রন্থটির নামেই লুকিয়ে আছে এক গভীর নস্টালজিয়া এবং বেদনা। ‘সোনালি নদীর নাম’ মহানন্দার অতীতের গৌরব নিয়ে, এখানে গড়ে ওঠা জনপদ নিয়ে, তাদের প্রাত্যাহিক জীবনগাথার অতীতের সুখময় স্মৃতিময় ইতিহাস-ঐতিহ্য বোঝানো হয়েছে। অদ্বৈত মল্লবর্মণ যেমন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে মালো সম্প্রদায়ের জীবনের উত্থান-পতন দেখিয়েছেন, কবি আমিনুল ইসলামও তেমনই মহানন্দার অববাহিকার ক্ষয়িষ্ণু সংস্কৃতিকে কবিতার পঙ্‌ক্তিতে ধারণ করতে চেয়েছেন।

কবি মহানন্দার সোনালি অতীত ও তার সমৃদ্ধময় ঐতিহ্য নিয়ে আফসোসও করেছেন:
‘এই যে মহানন্দা—দেবরাজের বর ছিল কি না কে জানে!
এই জলের আরশিতে বিম্বিত মহাজীবনের জলছবি।
ওই যে বারঘরিয়ার ঘাট—আজ মাঝিশূন্য, একদিন ওই ঘাটে
এসে থেমেছিল তুর্কিদের ঘোড়া সাম্যের সোয়ারি বয়ে কাঁধে;
আর নক্ষত্রের মতো হেসে উঠেছিল প্রাকৃত নারীর চোখ!
এই জলেই মুখ দেখে আপন, তলোয়ার রেখে জমিনে
মাটি চুমেছিলেন সুলতানের সেনাপতি।
আজ কোথায় সে মরুর অরণ্য! আর কোথায় সে প্রত্যাদেশ!’
(মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম)

অথবা
‘বাইনোকুলারে আমার চোখ—এপারে রেহাইচর—
ওপারে মহারাজপুর-চকলামপুরের আম্রকানন,
থোকা থোকা আম—ল্যাংড়া ক্ষীরসাপাত মোহনভোগ-
স্বর্গীয় লোভের মতন ঝুলে আছে হাতের নাগালে,
নাকের ডগায়; রসনায় জল এসে যায়। আর ছায়া।
আর প্রকৃতির কিন্নরী কোকিল শ্যামার গান, খঞ্জনার নাচ।
মাঝখানে বয়ে চলে মহানন্দা—সর্পিলা অলকনন্দা বরেন্দ্রীর।
ও বাতাস! অক্সিজেন ভরে আসে বুক। আহা! আমের ট্রাকে
যদি তার নেয়া যেতো কিছুটাও রুগ্নতার রাজধানী ঢাকায়!
জান্নাত—স্বর্গ-হেভেন! কী আর বেশি পাবেন মহাগ্রন্থসমূহে?’
(মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম)

শব্দের আধুনিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োগ আমিনুল ইসলামের কবিতাকে সমকালীন অন্যান্য কবিদের চেয়ে আলাদা করেছে। পরিবেশগত চেতনা ও সাবঅল্টার্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে দেখা যায় যে, কাব্যগ্রন্থটিতে কেবল প্রেমের গুঞ্জন বা স্মৃতির রোমন্থন নেই, এতে রয়েছে পরিবেশগত সংকটের এক নীরব প্রতিবাদ। নদী শুকিয়ে যাওয়া, চরের জমি দখল হওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রান্তিক বা নিম্নবর্গীয় মানুষের যে জীবনসংকট, তা কবির কবিতায় রাজনৈতিক ও সামাজিক মাত্রা লাভ করেছে। নদীকেন্দ্রিক মানুষের এই অস্তিত্বের লড়াই যেন বিশ্বজনীন এক মানবিক সংকটকে নির্দেশ করে। আমিনুল ইসলামের ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’ কেবল উত্তরবঙ্গের একটি নদীকে কেন্দ্র করে লেখা কোনো আঞ্চলিক কাব্য নয়। এটি মানুষের শেকড় সন্ধানের কাব্য, ক্ষয়ে যাওয়া সময়কে ধরে রাখার আকুল আকুতি এবং সমকালীন বাংলা কবিতার এক উজ্জ্বল মাইলফলক। বিভিন্ন বিষয় প্রসঙ্গক্রমে এনেছেন; বিভিন্ন প্রতীক ব্যবহার করেছেন, প্রতিতুলনা করেছেন। ক্ষেত্রমতে ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ভূগোলের সান্নিধ্য নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে মহানন্দার অনেক অবদানও আছে—ইতিহাস আছে। আমিনুল ইসলাম বলেছেন:
‘তারপর সাতচল্লিশ মাড়িয়ে একাত্তর; ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর—
বীরবংশের উত্তরাধিকার বুক দিয়েছে মহানন্দায়।
ওই তো রেহাইচরের ঘাট! মহানন্দায় সেতু—
জাহাঙ্গীরের প্রশস্ত কাঁধ হাত বিছিয়ে দুই পাড়ে—
আর দৃপ্ত পায়ে পার হয়ে আসে স্বাধীনতা!’
(মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম)

কবি আমিনুল ইসলাম বারবার ফিরে গেছেন তার ফেলে আসা চরের জীবনে, যেখানে শ্রাবণের অন্ধপূর্ণিমা কবিকে জাগিয়ে রাখত। আধুনিকতার আগ্রাসনে ও পরিবেশগত বিপর্যয়ে নদী কীভাবে তার জৌলুস হারাচ্ছে এবং এর সাথে কীভাবে একটি জনপদের সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে, তা অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। গ্রামীণ জীবনের অতি সাধারণ অনুষঙ্গকে বৈশ্বিক আধুনিক চেতনার সাথে মেলানোর এক অপূর্ব প্রয়াস রয়েছে এই কাব্যে। আমিনুল ইসলামের কবিতার অন্যতম প্রধান শক্তি হলো তার চিত্রকল্প। নদী, চর, কাশফুল, মাছ ধরার নৌকা এবং চরের মানুষের মুখের ভাষাকে তিনি অলংকারে রূপ দিয়েছেন। নদীমাতৃক বাংলার শিল্প ও সাহিত্যে জল এবং জলধারার ভূমিকা সুগভীর। বাংলা কবিতার বাঁকে বাঁকে নদী কখনো জীবনসংগ্রামের প্রতীক, কখনো বা আধ্যাত্মিক চেতনার স্মারক। সমকালীন বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর কবি আমিনুল ইসলামের কাব্যে নদী শুধু বাহ্যিক উপাদান নয় বরং তা তার কাব্য-অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের সীমান্তঘেঁষা ঐতিহ্যবাহী মহানন্দা নদী তার সৃষ্টিশীলতায় অনন্য রূপ পরিগ্রহ করেছে। এই নদী তার স্মৃতির আরশি, ইতিহাস অন্বেষণের অনুঘটক এবং ভৌগোলিক বাস্তবতায় শেকড় সন্ধানের এক নান্দনিক চাবিকাঠি।

আমিনুল ইসলাম কবিতার চাদরে মহানন্দার দুই পাড়ের মানুষের শ্রম, ঘাম এবং মহাজীবনকে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশ্বায়নের যুগে যখন কবিতা অনেক সময় স্থানচ্যুত বা শেকড়হীন হয়ে পড়ে; তখন আমিনুল ইসলাম তার কবিতাকে সুনির্দিষ্টভাবে মহানন্দার তীরে নোঙর করিয়েছেন। মহানন্দা নদী আমিনুল ইসলামের কবিতার ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। নদীর তরঙ্গের মতো তার পঙ্‌ক্তিমালায় এক ধরনের সহজাত গতিশীলতা লক্ষ্য করা যায়। তিনি গ্রামীণ জনপদের শব্দ, নদীর চরের মানুষের কথ্য ভাষা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক পরিভাষাগুলোকে কবিতার মূল স্রোতে চমৎকারভাবে মিশ্রিত করেছেন। নদী, জল, বালুচর, পলিমাটি তার কবিতায় বারবার রূপক ও উপমা হিসেবে ঘুরেফিরে এসেছে, যা তার শব্দবুননকে করেছে সমৃদ্ধ ও শিল্পিত। নদীমাতৃক বাংলাদেশের সমকালীন কবিতায় ঐতিহ্য, নিসর্গ ও উত্তর-উপনিবেশবাদের মেলবন্ধনে কবি আমিনুল ইসলাম অনন্য কণ্ঠস্বর। জীবনানন্দ দাশের ‘ধানসিড়ি’ কিংবা আল মাহমুদের ‘তিতাস’ নদীর মতোই আমিনুল ইসলামের কাব্যবিশ্বের কেন্দ্রীয় ধমনী হিসেবে স্পন্দিত হয়েছে মহানন্দা নদী। পরিবেশ-সমালোচনা ও মনস্তাত্ত্বিক ভূগোলের নিরিখে কবির কবিতায় নদী কেবল জলাধার নয় বরং ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির স্মারক হয়ে উঠেছে।

কবি আমিনুল ইসলাম দুঃখ করে বলেছেন, ‘আমাদের একজন অদ্বৈত মল্ল নেই; থাকলে আমরাও/ পেতাম: কালের স্রোতে মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’। কিন্তু আমিনুল ইসলামের মহানন্দা আজ জীবনানন্দের ধানসিড়ি কিংবা আল মাহমুদের তিতাস নদীর মতো সর্বজনীন করতে পেরেছেন, আমাদের হিসাবে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন। মহানন্দা নদীকে বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী উপাদানে পরিণত করেছেন। নদী, মানুষ, ইতিহাস এবং প্রকৃতিকে এক সুতোয় বেঁধে তিনি বাংলা কবিতায় যে নতুন ধারা তৈরি করেছেন, সেখানে মহানন্দা কেন্দ্রীয় চরিত্র। আল মাহমুদের তিতাস যেমন প্রকৃতি-বাংলার প্রতীক, জীবনানন্দ দাশের ধানসিড়ি যেমন রূপসী বাংলার প্রতীক; তেমনই সমকালীন বাংলা কবিতায় কবি আমিনুল ইসলামের ‘মহানন্দা কেবল একটি নদী নয়, বরং তা একটি ক্ষীয়মাণ ঐতিহ্য, আঞ্চলিক আত্মপরিচয় এবং এক সোনালি অতীতের মহাকাব্যিক স্মারক—তার কাব্যদর্শনের এক মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।

এসইউ



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *