বড় হচ্ছে ইলেকট্রিক স্কুটারের বাজার, মাসে বিক্রি সাড়ে ৩ হাজার
- মাসে বিক্রি হচ্ছে গড়ে সাড়ে তিন হাজার ইলেকট্রিক স্কুটার
- এপ্রিলে ইলেকট্রিক স্কুটারের বিক্রি দাঁড়িয়েছিল ৫ হাজারে
- বর্তমানে শেয়ার ১০ শতাংশ থাকলেও ইভির দখলে যাবে ৩০ শতাংশ
- মাসে মোটরসাইকেল বিক্রি হয় প্রায় ৩০ হাজার
দেশে ইলেকট্রিক স্কুটারের বাজার দ্রুত বড় হচ্ছে। গত বছরের নভেম্বরে যেখানে মাসে মাত্র ৯৬৯টি স্কুটার বিক্রি হয়েছিল, চলতি বছরের আগস্টে তা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৪১৪টি। এর আগে জ্বালানি সংকটের মধ্যে গত এপ্রিলে মাসিক বিক্রি বেড়ে প্রায় ৫ হাজারে উঠেছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কম পরিচালন ব্যয় ও জ্বালানি সংকটের কারণে ইলেকট্রিক স্কুটারের প্রতি গ্রাহকদের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে।
জানা গেছে, দেশে বর্তমানে দুই চাকার যেসব ইলেকট্রিক বাহন দেখা যায় তার ৯০ শতাংশের বেশি স্কুটার। তার মধ্যে ই-বাইক রয়েছে খুবই অল্প পরিমাণে। মূলত, দাম বেশি হওয়ায় এখনো ইলেকট্রিক বাইক বা মোটরসাইকেল তেমন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না। তবে ইলেকট্রিক স্কুটারের বাজার বড় হচ্ছে হু হু করে।
সবশেষ আগস্টের বিক্রয় তথ্য অনুযায়ী, মাসটিতে ৩ হাজার ৪১৪টি ইভি (ইলেকট্রিক ভেহিকেল) স্কুটার বিক্রি হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে চীনা ব্র্যান্ড ইয়াদিয়ার স্কুটার বিক্রি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। আগস্টে ব্র্যান্ডটি ৭৩৬টি স্কুটার বিক্রি করে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ বাজার অংশীদারত্ব নিয়ে শীর্ষে রয়েছে।
ছবি: জাগো নিউজ গ্রাফিক্স
এরপর রিভো ৫০০টি স্কুটার বিক্রি করে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং টেইলজি ৩৪৮টি স্কুটার বিক্রি করে ১০ দশমিক ২ শতাংশ বাজার অংশীদারত্ব নিয়ে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। একই সময়ে রাইডো ২৫৮টি এবং ওয়ালটন ১৮০টি ইলেকট্রিক স্কুটার বিক্রি করেছে। বাকি ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ স্কুটার বিক্রি হয়েছে অন্য বিভিন্ন ব্র্যান্ডের।
শিল্প খাতটির তথ্যমতে, গত বছরের নভেম্বরে ৯৬৯টি ইলেকট্রিক স্কুটার বিক্রি হলেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫২৯টিতে। মার্চে বিক্রি হয় প্রায় ২ হাজার ৫০০টি এবং জ্বালানি সংকটের মধ্যে এপ্রিলে সর্বোচ্চ প্রায় ৫ হাজার স্কুটার বিক্রি হয়। এরপর মে মাসে বিক্রি কমে প্রায় ৩ হাজারে নামলেও জুনে তা আবার বেড়ে ৩ হাজার ৮০০, জুলাইয়ে ৩ হাজার ৭৭৫ এবং আগস্টে বিক্রি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৪১৪টিতে। এছাড়া গত ডিসেম্বরে ১২৮৯ ও জানুয়ারিতে ১৪১৭টি স্কুটার বিক্রি হয়।
বিদ্যুৎচালিত স্কুটারের বিক্রি বেড়েছে ৭৫ শতাংশ
দেশে বিদ্যুৎচালিত স্কুটারের মধ্যে ইয়াদিয়া, রিভো, আকিজ, ওয়ালটন ও রাইডো উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে ইয়াদিয়া স্কুটার বিক্রির দায়িত্বে রয়েছে রানার।
রিভোর একটি ইলেকট্রিক স্কুটার/ছবি: সংগৃহীত
রানার অটোমোবাইল পিএলসির চিফ বিজনেস অফিসার মুহাম্মাদ আবু হানিফ জাগো নিউজকে বলেন, গত অর্থবছরে মাসিক গড়ে প্রায় দুই হাজার স্কুটার বিক্রি হলেও চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে তা বেড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজারে উঠেছে। এ হিসাবে মাসিক গড় বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। জুলাইয়ে বিক্রি হয়েছিল ৩ হাজার ৭৭৫টি, আর আগস্টে প্রায় ৩ হাজার ৪১৪টি।
জ্বালানি সংকটের সময় ইলেকট্রিক স্কুটারের বিক্রি আরও বেড়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত এপ্রিলে বিক্রি প্রায় ৫ হাজারে উঠেছিল। এরপর মে মাসে ৩ হাজার, জুনে ৩ হাজার ৮০০ এবং চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৩ হাজার ৭৭৫টি স্কুটার বিক্রি হয়েছে। আগস্টে এসে বিক্রি কিছুটা কমে ৩ হাজার ৪১৪টিতে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎচালিত স্কুটারের মধ্যে দেশে রাইডো ব্র্যান্ডের স্কুটারই সবচেয়ে সাশ্রয়ী। ৫০ হাজার টাকার কমেও এই ব্র্যান্ডের স্কুটার পাওয়া যায়।
রাইডোর একটি ইলেকট্রিক স্কুটার/ছবি: সংগৃহীত
রাইডোর হেড অব মার্কেটিং শরীফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশের ইলেকট্রিক টু-হুইলারের বাজার এখনো মোট মোটরসাইকেলের বাজারের মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ। তবে এই বাজারে প্রবৃদ্ধির গতি খুবই শক্তিশালী। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই ৭ হাজারের বেশি ই-বাইক ও ই-স্কুটার বিক্রি হয়েছে। জুলাই থেকে আগস্টে বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। একই সময়ে ই-বাইকের আমদানিও এক বছরে ৬০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অর্থাৎ, বাজারটি এখন প্রাথমিক পর্যায় পেরিয়ে দ্রুত সম্প্রসারণের দিকে যাচ্ছে।
কেন বাড়ছে বিক্রি
জ্বালানির উচ্চমূল্য, জ্বালানি সংকট ও ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়ায় মানুষ এখন বৈদ্যুতিক বাহনের দিকে ঝুঁকছে। সরকারও দেশে ইলেকট্রিক ভেহিকেলের প্রসারে আগ্রহী।
এ বিষয়ে রানার অটোমোবাইল পিএলসির চিফ বিজনেস অফিসার মুহাম্মাদ আবু হানিফ জাগো নিউজকে বলেন, দিন দিন মানুষ ইলেকট্রিক বাইকের দিকে ঝুঁকছে। এর প্রধান দুটি কারণ হলো—এটি পরিবেশবান্ধব এবং খরচ সাশ্রয়ী। এ দুই কারণে ক্রেতারা প্রচলিত জ্বালানিচালিত মোটরসাইকেলের পরিবর্তে ইলেকট্রিক বাইকের দিকে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন।
আবু হানিফ আরও বলেন, ই-বাইক একবার চার্জ দিলে মাত্র ১৪-১৫ টাকা খরচ হয় আর চলে ১০০ কিলোমিটার। পেট্রোলচালিত বাইকে ১ কিলোমিটার চললে সাড়ে চার টাকা খরচ হয়, আর ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল ১ কিলোমিটার চললে খরচ হয় ১৪ পয়সা। জ্বালানির উচ্চমূল্য ও সংকটের কারণে মানুষ তেলের পেরেশানি থেকে বাঁচতে এখন ইলেকট্রিক ভেহিকেলের দিকে ঝুঁকছেন।
রাইডোর একটি ইলেকট্রিক স্কুটার/ছবি: সংগৃহীত
জানতে চাইলে রাইডোর হেড অব মার্কেটিং শরীফুল ইসলাম বলেন, ইলেকট্রিক টু-হুইলারের বাজার বড় হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ এর কম পরিচালন ব্যয়। মডেল ও চার্জিং খরচভেদে একটি ইলেকট্রিক টু-হুইলার চালাতে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ১৫ থেকে ২০ পয়সা খরচ হয়। বিপরীতে পেট্রোলচালিত মোটরসাইকেলে জ্বালানি খরচ পড়ে প্রায় ২ থেকে ৩ টাকা। এর পাশাপাশি জ্বালানিনির্ভরতা কমানো, কম রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বাড়িতে চার্জ দেওয়ার সুবিধা এবং দৈনন্দিন যাতায়াতে সহজলভ্যতার কারণে গ্রাহকদের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে।
৩০ সালে বছরে বিক্রি হতে পারে ৭০ হাজার ই-বাইক
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ই-বাইক বাজারে প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ইলেকট্রিক টু-হুইলার বিক্রি ৫০ হাজার থেকে ৭০ হাজারে পৌঁছাতে পারে। সে সময় বাজারটির বার্ষিক খুচরা মূল্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা হতে পারে। এমন তথ্যই দিয়েছেন রাইডোর হেড অব মার্কেটিং শরীফুল ইসলাম।
তার মতে, চার্জিং নেটওয়ার্ক, ব্যাটারি সাপোর্ট, গ্রাহক পর্যায়ে অর্থায়ন এবং স্থানীয় উৎপাদন দ্রুত সম্প্রসারণ করা গেলে বছরে ৫০ হাজারের বেশি ইলেকট্রিক স্কুটার বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছর বাংলাদেশের ইলেকট্রিক টু-হুইলার শিল্পের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবৃদ্ধির সময় হতে পারে।
ইয়াদিয়ার একটি ইলেকট্রিক স্কুটার/ছবি: সংগৃহীত
ভবিষ্যৎ বাজার সম্পর্কে শরীফুল আরও বলেন, বাংলাদেশের ইলেকট্রিক ভেহিকেলের বাজারের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা অনেক বড়। সরকারের ইলেকট্রিক মোটর ভেহিকেল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড অপারেশন গাইডলাইনে ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক পরিবহনের অন্তত ৩০ শতাংশ ইলেকট্রিক ভেহিকেলে রূপান্তরের লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত ইভি ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসিতে স্থানীয় উৎপাদন, অ্যাসেম্বলি ও চার্জিং অবকাঠামো সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জানতে চাইলে রানার অটোমোবাইল পিএলসির চিফ বিজনেস অফিসার মুহাম্মাদ আবু হানিফ জাগো নিউজকে বলেন, দেশে ইলেকট্রিক বাইকের বাজার দ্রুত বাড়ছে। তিন-ছয় মাস আগেও মোট মোটরসাইকেলের বাজারে ইভির শেয়ার ছিল প্রায় ২ শতাংশ। এখন মাসে দেশে ৩০ থেকে ৩২ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রির মধ্যে ইলেকট্রিক বাইকের শেয়ার প্রায় ১০ শতাংশে উঠে এসেছে। আগামী এক বছরের মধ্যে ইভির বাজার অংশীদারত্ব ৩০ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আমরা আশা করছি।
ইএইচটি/এমকেআর



