পাকিস্তান ক্রিকেটে আবারও ফিক্সিংয়ের কালো ছায়া, সন্দেহে দুই ক্রিকেটার!
আবারও ইংল্যান্ড সফর, আবারও একটি বিতর্কের মুখে পাকিস্তান ক্রিকেট। আবারও ফিক্সিং বিতর্কে টালমাটাল হতে যাচ্ছে দেশটির ক্রিকেটাঙ্গন। ২০১০ সালে ইংল্যান্ড সফরে সেই আলোচিত ফিক্সিং বিতর্কে ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গিয়েছিল সালমান বাট, মোহাম্মদ আসিফ এবং মোহাম্মদ আমিরের।
এবার ঠিক ২০১০ সালের মত করে পাকিস্তান দলের ভেতরে ‘ফিক্সিং’ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় টেস্টের আগে দলে বড় ধরনের রদবদল, সাত ক্রিকেটারকে দেশে ফেরত পাঠানো এবং দুই কোচকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরই এ নিয়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে। পাকিস্তানের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই পরিবর্তনের নেপথ্যে শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, ‘ক্রিকেটের বাইরের’ আরও কিছু বিষয় রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে অভিজ্ঞ দুই ক্রিকেটার মোহাম্মদ রিজওয়ান ও ইমাম-উল-হক। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, দলের কয়েকজন ক্রিকেটারের মোবাইল ফোন জব্দ করেছিল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কার কার ফোন নেওয়া হয়েছিল, তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রতিবেদনে রিজওয়ান ও ইমামের নাম এসেছে।
বিষয়টি আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে পিসিবির পক্ষ থেকে অভ্যন্তরীণ তদন্তের ঘোষণা দেওয়ার পর। পিসিবির মিডিয়া ও ডিজিটাল কমিউনিকেশনসের পরিচালক আমির মির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, শৃঙ্খলা ও আচরণ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর পর বোর্ড অভ্যন্তরীণভাবে তদন্ত শুরু করেছে।
তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বর্তমানে অভ্যন্তরীণভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং পিসিবির নিয়ম ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তদন্ত পরিচালিত হবে। সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
সাত ক্রিকেটার বাদ, কোচিং স্টাফেও পরিবর্তন
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে পাকিস্তানের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। এর পরই দল ঢেলে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেয় পিসিবি।
মোহাম্মদ রিজওয়ান, সহ-অধিনায়ক সালমান আলি আগা, ইমাম-উল হক, আলি উসমান, খুররম শাহজাদ, আমির জামাল ও মুহাম্মদ আওয়াইজ জাফরকে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদ এবং বোলিং কোচ উমর গুলকেও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
তখন দলের প্রথম দুই ম্যাচের ব্যর্থতাকেই এই বড় পরিবর্তনের কারণ হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল। এরপর সাতজন নতুন ক্রিকেটারকে স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করে পাকিস্তান। তাদের মধ্যে পাঁচজনের এখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়নি। বাকি দুজন হলেন ব্যাটার সাইম আইয়ুব ও আবদুল্লাহ ফজল, যারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন।
তবে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, এত বড় পরিবর্তনের কারণ শুধু মাঠের পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ নয়। বিষয়টির সঙ্গে দলের শৃঙ্খলা ও আচরণসংক্রান্ত আরও কিছু বিষয় জড়িয়ে থাকতে পারে।
দুই ক্রিকেটারের ফোনের তথ্য নেওয়ার দাবি
পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের প্রতিবেদনে, ডন-এর বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, পিসিবি মোহাম্মদ রিজওয়ান ও ইমাম-উল-হকের মোবাইল ফোন থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, লন্ডনে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজ চলাকালে দুই ক্রিকেটারের কর্মকাণ্ড ও যোগাযোগের বিষয়ে তদন্তের অংশ হিসেবে তাদের ফোন থেকে তথ্য নেওয়া হয়।
লর্ডসে ইংল্যান্ডের কাছে পাকিস্তানের ১৯৪ রানের বড় পরাজয়ের পর দলের নিরাপত্তা কর্মকর্তা রিজওয়ান ও ইমামের ফোন নিজেদের হেফাজতে নেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কয়েক ঘণ্টা পর ফোন দুটি তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে ফোনের তথ্য অন্য একটি ডিভাইসে স্থানান্তর করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব দাবির বিষয়ে রিজওয়ান বা ইমামের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্যের কথা এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। পাকিস্তানের আরেক সংবাদমাধ্যম ৩৬৫ নিউজের দাবি, আরও কয়েকজন ক্রিকেটারের ফোনও পিসিবি জব্দ করেছে। শেষ টেস্ট শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব ফোন বোর্ডের হেফাজতে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইমাম-উল হকের চোট নিয়েও প্রশ্ন
এদিকে ইমাম-উল হকের চোট নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন পিসিবির হাই পারফরম্যান্সের পরিচালক আকিব জাভেদ। লর্ডস টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে চোটের কারণে ব্যাট করতে নামেননি ইমাম। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে আকিব বলেন, ইমামের চোটের বিষয়টি বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে এবং এটি হতাশাজনক।
অতীতে ক্রিকেটাররা চোট পেয়েও মাঠে নামার চেষ্টা করতেন- এমন উদাহরণ টেনে তিনি ইমামের চোট নিয়ে তদন্তের কথা জানান।
জিও টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আকিব বলেন, ‘ইমামের চোটের বিষয়টি তদন্তের মুখোমুখি হবে।’ তবে তিনি সরাসরি ইমাম চোটের ভান করেছেন- এমন দাবি করেননি। তার প্রশ্ন ছিল, পেশির টান কিভাবে একজন ক্রিকেটারকে পুরোপুরি ব্যাটিং থেকে বিরত রাখতে পারে।
আকিবের ভাষায়, ‘আমি বলতে পারি না যে সে চোটের ভান করেছে। কিন্তু এমন পেশির টান আপনাকে পুরোপুরি ব্যাটিং থেকে থামিয়ে দিতে পারে না।’
তদন্তেই মিলবে আসল কারণ
সব মিলিয়ে ইংল্যান্ড সফরে পাকিস্তান দলের সাম্প্রতিক ব্যাপক পরিবর্তনকে ঘিরে নতুন করে তৈরি হয়েছে রহস্য। প্রথম দুই টেস্টে ব্যর্থতার পর সাত ক্রিকেটারকে বাদ দেওয়া এবং কোচিং স্টাফে পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে শুরুতে ক্রিকেটীয় কারণ হিসেবে দেখা হলেও এখন শৃঙ্খলা ও আচরণ নিয়ে পিসিবির অভ্যন্তরীণ তদন্ত সেই আলোচনাকে আরও গভীর করেছে।
বিশেষ করে রিজওয়ান ও ইমামের ফোন থেকে তথ্য নেওয়ার দাবি এবং ইমামের চোট নিয়ে আকিব জাভেদের প্রকাশ্য প্রশ্নের পর পাকিস্তান দলের ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে জল্পনা বেড়েছে।
আইএইচএস/
