পড়াশোনার ফাঁকে ৩৬০ টাকায় শুরু, এখন মাসে আয় ৩ লাখ
মাত্র ৩৬০ টাকা পুঁজি নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি শুরু করেছিলেন সিল তৈরির কাজ। সেই ছোট উদ্যোগই এখন পরিণত হয়েছে সফল ব্যবসায়। ‘বেঙ্গলস সিগনেচার’ নামে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানে সিল তৈরি ও বিক্রি করে বর্তমানে মাসে প্রায় ৩ লাখ টাকা আয় করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দম্পতি এস এম রিজন ও রিসা আফরিন। নিজেদের স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি তাদের উদ্যোগে তৈরি হয়েছে ১৫ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থানের সুযোগ।
এস এম রিজন ও রিসা আফরিনের যাত্রার শুরু ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ঢাকা থেকে কিছুসংখ্যক সিল তৈরি করে এনে অর্ডার নিতে শুরু করেন তারা। বিভিন্ন ফেসবুক ও মেসেঞ্জার গ্রুপ এবং অফলাইনে পরিচিতজনদের কাছ থেকে অর্ডার সংগ্রহ করতেন। অল্প সময়ের মধ্যেই পান কাঙ্ক্ষিত সাড়া। কিন্তু তখন তারা ছিলেন অনেকটাই এলোমেলো অবস্থায়। একদিকে বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না, অন্যদিকে জানতেন না কীভাবে সিল তৈরি করতে হয় কিংবা কোথা থেকে এর কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয়।
এস এম রিজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং রিসা আফরিন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে অধ্যয়নরত। সবার থেকে আলাদা ও ভিন্ন কিছু করার তীব্র বাসনা, মনের মধ্যে বুনতে থাকা স্বপ্ন এবং আত্মবিশ্বাস থেকেই ছোট পরিসরে কাজ শুরু করেন তারা। ক্রেতাদের পছন্দ ও চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত কাজ করতে করতে ধীরে ধীরে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শুরুতে অল্প টাকা আয় হলেও ব্যবসার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে সিল তৈরি ও বিক্রি করে প্রতিমাসে প্রায় ৩ লাখ টাকা আয় করছেন এই দম্পতি।
‘প্রথমদিকে পড়াশোনার কথা চিন্তা করে আমি ওর এই উদ্যোগকে সেভাবে সমর্থন করিনি। আমার কাছে লেখাপড়াটাই আগে ছিল। তবে এখন ও পড়াশোনার পাশাপাশি উদ্যোগটিও চালিয়ে যাচ্ছে, বিষয়টি আমি ইতিবাচকভাবেই দেখছি। ছেলের সাফল্যে আমিও খুব আনন্দিত। লেখাপড়ার ক্ষতি না করে যদি নিজের উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই ভালো লাগে। ভবিষ্যতে ও কী করবে, সেটা ওর নিজের পছন্দ। ও যে কাজ করে খুশি থাকবে এবং ভালো থাকবে, সেটাই আমি চাই।’
রিজন ও রিসা বুকভরা স্বপ্ন ও দৃঢ় সাহস নিয়ে শুরু করেন সিল-অর্থাৎ দাফতরিক কাজে ব্যবহৃত মোহর-তৈরির কাজ। ব্যর্থতার বেড়াজাল ও নানা সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে আজ তারা ‘বেঙ্গলস সিগনেচার’ নামে গড়ে তুলেছেন সিল তৈরি ও প্রদর্শনীর শোরুম। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে দেশব্যাপী সাড়া ফেলেছে। মানসম্মত পণ্য ও চমৎকার ডিজাইনের কারণে অনলাইন ও অফলাইনে ক্রেতাদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাস্টমারদের চাহিদা অনুযায়ী সিল পৌঁছে দিচ্ছেন তারা।

তবে এই যাত্রায় অনিশ্চয়তার পাশাপাশি বড় বাধা ছিল পরিবার। রিজনের বাবা ছিলেন এমন ব্যবসার ঘোর বিরোধী। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলে সিল তৈরি করবেন-বিষয়টি তার কাছে ছিল চরম দৃষ্টিকটু। তবে মায়ের মানসিক সমর্থন এবং বড় ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া কিছু অর্থ তাকে এগিয়ে যেতে সাহস জোগায়। পরে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে চীন থেকে সিল তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ করেন তারা। একই সঙ্গে মনোযোগ দেন কাজ শেখার দিকে। প্রথম দিকে কিছুটা লোকসানও হয়। অনেক সামগ্রী নষ্ট হলেও ধীরে ধীরে কাজ শিখে একটি আধাপাকা টিনের দোকান নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন তারা। সেই ছোট পরিসরের উদ্যোগই এখন বড় হয়েছে। বর্তমানে পদ্মা আবাসিক এলাকায় অফিস নিয়ে পুরোদমে ব্যবসা পরিচালনা করছেন তারা।
নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি বর্তমানে ১৫ জন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন এই দম্পতি। রাজশাহীতে শিক্ষার্থীদের জন্য পার্টটাইম কাজের সুযোগ তুলনামূলক কম হওয়ায় বেঙ্গলস সিগনেচারে কাজের সুযোগ পেয়ে খুশি কর্মরত শিক্ষার্থীরাও। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য খাতে প্রতি মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয় হয়। সব খরচ বাদ দেওয়ার পরও রিজনের মাসিক আয় হচ্ছে প্রায় দেড় থেকে ২ লাখ টাকা।
‘রাজশাহীতে আসার পর প্রায় এক বছর চাকরি খুঁজেছি। শিক্ষার্থীদের জন্য এখানে পার্টটাইম কাজের সুযোগ কম হওয়ায় বেঙ্গলস সিগনেচারে কাজের সুযোগটি আমার জন্য ভালো একটি অপরচুনিটি। বিকেল ৫টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করার পাশাপাশি এখানে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও কমিউনিকেশন স্কিল বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছি। ভবিষ্যতে করপোরেট সেক্টরে যেতে চাই, তাই এই অভিজ্ঞতা আমার ক্যারিয়ারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’

এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা হয় রিজন-রিসা দম্পতির সঙ্গে। তারা জানান, গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে ভিন্ন কিছু করার ইচ্ছা থেকেই তাদের ব্যবসার চিন্তা আসে। এমন কিছু নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন, যা একদিকে মানুষের প্রয়োজন মেটাবে, অন্যদিকে শৌখিন ও ব্যতিক্রমী হবে। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে তারা লক্ষ্য করেন, অনলাইনে ভালো মানের কাস্টম সিল সরবরাহ করে-এমন নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা খুবই কম। সেখান থেকেই আমরা ফ্ল্যাশ সিল নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই এবং লক্ষ্য ঠিক করে ধীরে ধীরে কাজ শুরু করি।
তারা আরও বলেন, শুরুতে আমাদের এ ধরনের ব্যবসা সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণাই ছিল না। কীভাবে কাজ করতে হবে, কীভাবে পণ্য তৈরি করতে হবে কিংবা কাস্টমারের চাহিদা অনুযায়ী সেবা দিতে হবে-এসব কিছুই ধীরে ধীরে শিখেছি। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি এবং সময়ের সঙ্গে নিজেদের কাজকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করেছি। আলহামদুলিল্লাহ, বর্তমানে আমরা একটি অবস্থানে আসতে পেরেছি।
এ দম্পতি বলেন, বর্তমানে বেঙ্গলস সিগনেচারের মাধ্যমে আমরা সারাদেশে ফ্ল্যাশ সিল পৌঁছে দিচ্ছি। সিল আমাদের কাছে শুধু একটি প্রয়োজনীয় পণ্য নয়, এটি অনেকটা শৌখিন প্রোডাক্টও। তাই প্রতিটি কাস্টমারের চাহিদা ও পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে সিল তৈরির চেষ্টা করি। আমরা চাই, একটি সিল দেখলেই যেন বোঝা যায়-এটি একজন শৌখিন মানুষের চিন্তা, রুচি ও মনন থেকে তৈরি।
‘আমি এখানে প্রায় আট মাস ধরে কাজ করছি। এটি আমার প্রথম চাকরি। এখানে আসার আগে আমার কোনো কাজের অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রথমবার ইন্টারভিউ দিতে এসে ফ্রেশার হিসেবে কাজের সুযোগ পাই। শুরু থেকেই এখানে কাজ করতে গিয়ে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য পার্টটাইম কাজের সুযোগ তুলনামূলক কম, তাই বেঙ্গলস সিগনেচারে কাজের সুযোগ পাওয়া আমার জন্য খুবই ভালো একটি অভিজ্ঞতা ও সুযোগ।’
কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রসঙ্গে তারা বলেন, সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আমাদের এই উদ্যোগের মাধ্যমে বর্তমানে ১৫ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একটি ছোট উদ্যোগ থেকে কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারাটাই আমাদের কাছে অনেক বড় অর্জন ও আনন্দের বিষয়। ভবিষ্যতে বেঙ্গলস সিগনেচারকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে গিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রাহকদের জন্য আরও মানসম্মত ও বৈচিত্র্যময় পণ্য দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

বেঙ্গলস সিগনেচারের জুনিয়র সেলস এক্সিকিউটিভ দিশামনি বলেন, আমি এখানে প্রায় আট মাস ধরে কাজ করছি। এটি আমার প্রথম চাকরি। এখানে আসার আগে আমার কোনো কাজের অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রথমবার ইন্টারভিউ দিতে এসে ফ্রেশার হিসেবে কাজের সুযোগ পাই। শুরু থেকেই এখানে কাজ করতে গিয়ে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য পার্টটাইম কাজের সুযোগ তুলনামূলক কম, তাই বেঙ্গলস সিগনেচারে কাজের সুযোগ পাওয়া আমার জন্য খুবই ভালো একটি অভিজ্ঞতা ও সুযোগ।
বেঙ্গলস সিগনেচারের ক্রিয়েটিভ হেড লক কাউসার বলেন, বর্তমানে আমি বেঙ্গলস সিগনেচারে কনটেন্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছি এবং পাশাপাশি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা বিষয়ে ফাইনাল ইয়ারে পড়ছি। বেঙ্গলস সিগনেচারের সঙ্গে আমার প্রায় দেড় বছরের পথচলা। রাজশাহীতে টিউশন পাওয়া কঠিন, পেলেও আয় তুলনামূলক কম। তাই প্রায় দেড় বছর আগে গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে এখানে কাজ শুরু করি। ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতা বাড়িয়ে আজকের অবস্থানে এসেছি। নিঃসন্দেহে বেঙ্গলস সিগনেচার আমার জন্য একটি লাইফ চেঞ্জিং অভিজ্ঞতা।
তিনি আরও বলেন, এখানে ডিজাইন, কনটেন্ট, সেলস, ম্যানেজমেন্ট ও প্রোডাকশনসহ বিভিন্ন টিম সমন্বয় করে কাজ করে। কোনো একটি টিমে ঘাটতি থাকলে অন্য টিমগুলো সহযোগিতার মাধ্যমে তা পূরণ করার চেষ্টা করে। এই টিমওয়ার্কের পরিবেশই আমাদের কাজকে আরও সহজ ও গতিশীল করেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে পড়াশোনার পাশাপাশি বেঙ্গলস সিগনেচারে সেলস এক্সিকিউটিভ হিসেবে কাজ করছেন রায়হান আহমেদ।
তিনি বলেন, রাজশাহীতে আসার পর প্রায় এক বছর চাকরি খুঁজেছি। শিক্ষার্থীদের জন্য এখানে পার্টটাইম কাজের সুযোগ কম হওয়ায় বেঙ্গলস সিগনেচারে কাজের সুযোগটি আমার জন্য ভালো একটি অপরচুনিটি। বিকেল ৫টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করার পাশাপাশি এখানে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও কমিউনিকেশন স্কিল বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছি। ভবিষ্যতে করপোরেট সেক্টরে যেতে চাই, তাই এই অভিজ্ঞতা আমার ক্যারিয়ারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পড়াশোনার ক্ষতি হবে ভেবে প্রথমে সমর্থন না করলেও এখন ছেলের সাফল্যে খুশি রিজনের বাবা ড. মো নিজাম উদ্দিন।
তিনি বলেন, প্রথমদিকে পড়াশোনার কথা চিন্তা করে আমি ওর এই উদ্যোগকে সেভাবে সমর্থন করিনি। আমার কাছে লেখাপড়াটাই আগে ছিল। তবে এখন ও পড়াশোনার পাশাপাশি উদ্যোগটিও চালিয়ে যাচ্ছে, বিষয়টি আমি ইতিবাচকভাবেই দেখছি। ছেলের সাফল্যে আমিও খুব আনন্দিত। লেখাপড়ার ক্ষতি না করে যদি নিজের উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই ভালো লাগে। ভবিষ্যতে ও কী করবে, সেটা ওর নিজের পছন্দ। ও যে কাজ করে খুশি থাকবে এবং ভালো থাকবে, সেটাই আমি চাই।
এনএইচআর/জেআইএম



