September 2, 2026

নিহারণে বিন্দুর মধ্যে সিন্ধু খোঁজার চেষ্টা

0
chuton-mtb58kecbxky9d9-20260827123535.jpg


অনন্ত পৃথ্বীরাজ

কবি ও গবেষক বঙ্গ রাখাল সম্পাদিত শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক নিহারণ বর্ষ-১৩, সংখ্যা-৬, জুলাই-২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ সংখ্যাটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকাটির সহকারী সম্পাদক হিসেবে আছেন বায়েজিদ চাষা, প্রকাশকের দায়িত্বে নিশিতা খাতুন এবং প্রচ্ছদ এঁকেছেন জয়দেব কর। সবুজস্বর্গ প্রকাশনী, ঈশ্বরদী, পাবনা থেকে মুদ্রিত পত্রিকার কলেবর সাড়ে তিন ফর্মা। শুভেচ্ছা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র একশ টাকা।

লিটলম্যাগ বা ছোটকাগজের ধর্ম অনেকটা বাংলা ছোটগল্পের মতো, হঠাৎ প্রকাশ পেয়ে আবার হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায়। স্বল্পায়ু যেন লিটলম্যাগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিশেষ কোনো সময়ে, বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে, বিশেষ কোনো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে ছোটকাগজ প্রকাশিত হয়ে থাকে। বিবিধ কারণে বেশিরভাগ ছোটকাগজ স্থায়ীত্ব লাভ করতে না পারলেও ছাপ রেখে যায়। তার অস্তিত্বের জানান দিয়ে যায়, কালের যাত্রায়। তাদের কথা রয়ে যায় কোথাও না কোথাও। নিহারণের ক্ষেত্রেও এ কথা সমানভাবে প্রযোজ্য। এর পূর্ববর্তী সংখ্যা আজ থেকে প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল। নানা কারণে দীর্ঘদিন পত্রিকাটির প্রকাশনায় ছিল বিরতি। অভিজ্ঞ সম্পাদনা পরিষদের সফল নেতৃত্বের কারণে শুরু থেকেই নিহারণ তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখেছে। নিহারণ অনেক নবীন লেখকের আঁতুরঘর। তাছাড়া প্রান্তবাসী কবি-লেখকদের অদম্য মেধা কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নিহারণ উৎসাহদাতা হিসেবে কাজ করে।

নিহারণের বর্তমান সংখ্যায় পাঁচজন লেখকের পাঁচটি প্রবন্ধ-নিবন্ধ, সাতজন কবির গুচ্ছকবিতা, নয়জন কবির নয়টি একক কবিতা এবং একজন সুফিধারার লোকসাধকের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে। চলতি সংখ্যার প্রতিটি লেখাই অর্থবহ এবং তাৎপর্যপূর্ণ। সমকালীন সমাজ ও জীবনকে ধারণ করা এসব লেখায় লেখকের নিজস্ব ছাপ স্পষ্ট এবং বাংলা সাহিত্যের উত্তরাধুনিক রূপরেখা তৈরিতে অবদান রাখবে বলে বিশ্বাস করি। লেখক অনিরুদ্ধ হিল্লোল তার ‘সূর্যসেন, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তির লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা’ শিরোনামের প্রবন্ধে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংযোজন করে সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালির হাজার বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অর্থবহ করার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

রণভী শের ‘সংস্কৃতির বিকাশে রাষ্ট্রের ভূমিকা’ শীর্ষক নিবন্ধে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা বলতে গিয়ে প্রগতিশীল ধারার ভিন্নমত অবলম্বীদের প্রতি রাষ্ট্রের রূঢ় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। লেখকের ভাষায়, ‘বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার যুগেও আমরা দেখি, মানুষের স্বাধীন মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই।’ ড. ফুয়াদ হোসেন ‘উচ্চশিক্ষায় আউটকাম বেজড এডুকেশন (ওবিই) এখন সময়ের দাবি’ শীর্ষক প্রবন্ধে বাংলাদেশের শিক্ষা সংকট, শিক্ষাব্যবস্থা এবং পাঠ্য-কারিকুলাম নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। শিশির আজমের ‘সিনেমা বিষয়ে টুকরো কথাবার্তা’ শীর্ষক নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধে বাংলা সিনেমা সম্পর্কে নন্দনতাত্ত্বিক আলোচনা উপস্থাপন করেছেন।

মাকসুদুল হক ‘অন্তরাল-নিবাসী মহান সাধক-দরবেশ সিরাজ সাঁই’ শীর্ষক প্রবন্ধে সাধক লালন সাঁইয়ের আধ্যাত্মিক চেতনার গুরু সিরাজ সাঁইয়ের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে দার্শনিক আলোচনা করেছেন। অপরদিকে এই সংখ্যায় কবি ও গবেষক সৈয়দ তারিকের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে। কবি ও গবেষক বঙ্গ রাখালের নেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি, বিভিন্ন ইজম, ধর্ম ও মতবাদ নিয়ে সৈয়দ তারিক খোলাখুলি কথা বলেছেন। তার ভাষায়, প্রতিটি ধর্মেরই দুটি দিক আছে। মোটা দাগে বলতে গেলে, একদিকে আছে আচার, অনুষ্ঠান, উপাসনা, নিয়মকানুন, বাধ্যবাধকতা আর অন্যদিকে ধ্যান, আত্মশুদ্ধি, আত্ম-উপলব্ধি, ভক্তি, প্রেম, সেবা ও দয়া। সুফিবাদ দ্বিতীয় দিকটি ধারণ করে এবং এটি সব ধর্মের মরমি ধারার সাথেই সাযুজ্যপূর্ণ।’

কবি ও গবেষক মোস্তফা তারিকুল আহসানের ‘নতুন ব্যাকরণ’, ‘ঘাস ও পাখিদের রাজ্যে’ ও ‘হত্যা বিষয়ক ফুটনোট’ শিরোনামে তিনটি গদ্যকবিতা ছাপা হয়েছে। কবিতাগুলোতে কবি মানুষের জীবন, সৌন্দর্যবোধ ও পরপারের চিন্তার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। কবি, কথাকার ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা-ব্যক্তিত্ব লতিফ জোয়ার্দারের ‘প্রিয়মুখ’, ‘মুসাফির’, ‘আলোকলতা আঁধার’, ‘দোতারার স্পন্দন’ ও ‘মহাকালের ঠিকানা’ শীর্ষক কবিতায় নস্টালজিক ভাবনা, স্মৃতি, হাহাকার ও মৃত্যুচেতনা প্রকাশিত হয়েছে।

মামুন রশীদের ‘প্রেম করেন’, ‘স্তুতি’, ‘প্রেমের কবিতা’ ও ‘মুক্তি’ শিরোনামের কবিতাগুলোতে গল্প বলার মতো করে বর্তমানের সান্ত্বনা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনে দিয়েছেন। কবি শামীম রফিকের ‘শ্রমের বিভেদ’, ‘তৃষ্ণা ছাড়াই তৃষিত জীবন’; চঞ্চল নাঈমের ‘নড়ির গিঁট’, ‘নীরবতার কারখানা’ ও ‘জীবিত ছায়া’; এস এম কাইয়ুমের ‘নুনঘুমের অন্তরীপ’, ‘বেঁচে থাকার বহুবচন’ ও ‘শূন্যের জ্যামিতি ও কিছু নিষিদ্ধ ফ্যাক্টাল’ শীর্ষক কবিতাগুলোতে শিল্পের চাতুর্য, সময়ের দায়, উত্তরাধুনিক প্রতিচিন্তা, নগর মানুষের জীবন-সংস্কৃতি, প্রেম প্রভৃতি বিষয় উঠে এসেছে। এ ছাড়া বায়েজিদ চাষা, সুমন শিকদার, আরশি গাইন, রায়হান উল্লাহ, রাকিব হাসান, মিজান খান, অনু ইসলাম, সজল রায়, নাজমুল হোসেন নয়ন, যাহিদ সুবহান প্রমুখ কবির কবিতাগুলো আলাদা করে আলোচনার দাবি রাখে।

সাহিত্যে নব নব ধারার সংযোজন, নতুন ভাব ও ভাষার প্রয়োগ, নতুন দিনের কথায় সাজানো হয় ছোটকাগজ বা লিটলম্যাগের প্রতিটি সংখ্যা। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ, নতুন প্ল্যাটফর্ম বিনির্মাণ এবং জনমানসে তার প্রভাব বিস্তার করতে লিটল ম্যাগাজিনের উজ্জ্বল ভূমিকা ছিল, এখনো আছে এবং অদূর ভবিষ্যতেও থাকবে। নিহারণ সেই পথেই ধাবিত হবে তার স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে। পত্রিকাটির উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।

লেখক: কবি ও এমফিল গবেষক।

এসইউ



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *