September 13, 2026

তাড়াশের উলুপুর দিঘিতে অতিথি পাখির মেলা, মুগ্ধ দর্শনার্থীরা

0
og_1789281487_6aa644cf7c4b0.jpeg


মুক্ত আকাশে ডানা মেলে উড়ে চলা, খাবারের সন্ধানে যেখানে-সেখানে অবাধ বিচরণ দেখতে কার না ভালো লাগে। এমনই ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখির দেখা মিলছে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ পৌর শহরের উলুপুর দিঘির পাড়ে। এই দিঘি যেন হয়ে উঠেছে হাজারো পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল। বিশ্বের শীতপ্রধান নানা দেশ থেকে পাখি গুলো প্রতি বছরের ন্যায় এবারও এসেছে এই দীঘিতে।

তাড়াশে দিঘি ছাড়াও রয়েছে বৃহৎ চলনবিল। এ বিলে অতিথি পাখিদের জন্য আবহাওয়া অনুকূল আর পর্যাপ্ত খাবার থাকায় প্রতিবছর লাখো অতিথি পাখির দেখা মিলে। শীতকালে সোলি, বদর, লালমোন, শামুকখোল, বক, বালিহাঁস, কাইয়ুম ও বাগাড়িসহ নানা প্রজাতির পাখির কিচিরমিচির ডাকে বিল ও দিঘি মুখরিত থাকে। বিল ও দিঘির দেশি ছোট ছোট মাছই মূলত এসব পাখির প্রধান খাদ্য।

বর্তমানে চলনবিল ও দীঘিতে অতিথি পাখির সংখ্যা কয়েক লাখ হবে বলে স্থানীয় পাখি প্রেমীদের ধারণা। সেখানে প্রতিদিনই সকাল-বিকেল দর্শনার্থীরা যাচ্ছেন পাখির কলতান, নীলাকাশে ডানা মেলে উড়ে চলার মতো মোহময় দৃশ্য উপভোগ করতে। আবার কেউ কেউ ক্যামেরা বন্দি করছেন সেই মুহূর্ত।

স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী শিবু রাজ জাগো নিউজকে বলেন, উলুপুর দিঘির চারপাশের গাছপালা পাখিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। গাছপালা রক্ষা এবং পাখিদের নির্বিঘ্নে বিচরণের পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এখানে আরও বেশি পাখির সমাগম ঘটতে পারে। তার প্রত্যাশা, স্থানীয় প্রশাসন পাখিদের এই নিরাপদ আবাসস্থল রক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন। সেই সঙ্গে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় পাখিদের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণে সবার সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

তাড়াশ বারুহাস ইউনিয়ন থেকে পাখি দেখতে আসা মোকাদ্দেস ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, পাখির বিচরণ সত্যিই মনোমুগ্ধকর। সারাক্ষণ পাখির কিচিরমিচিরে মুখরিত চারপাশ। যা দেখে খুবই ভালো লাগল। আবার বন্ধুবান্ধব নিয়ে আসবো।

জানা যায়, এসব অতিথি পাখির আগমন ঘটে উত্তর মেরু থেকে। পৃথিবীর উত্তর মেরুর দেশ সাইবেরিয়া, ফিলিপস, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, এন্টার্কটিকাসহ অনেক অঞ্চলে তাপমাত্রা যখন মাইনাস শূন্য ডিগ্রিতে নেমে আসে, তখন সেগুলোতে দেখা দেয় প্রচণ্ড খাদ্যাভাব। তীব্র শীতে পাখির দেহ থেকে পালক খসে পড়ে। প্রকৃতি যখন পাখিদের জীবনধারণের জন্য অনুকূলে থাকে না, তখন পাখিগুলো অপেক্ষাকৃত কম শীত ও অনুকূল প্রকৃতির দেশে অতিথি হয়ে আসে। নাতিশীতোষ্ণ দেশ হিসেবে এ দেশ প্রতিবছর সাদরে গ্রহণ করে নেয় এসব অতিথি পাখিকে। এ দেশ হয়ে ওঠে তখন অতিথি পাখিদের খাদ্য ও জীবনধারণের নিরাপদ আবাসস্থল।

তা ছাড়া সৃষ্টিগতভাবে পাখিদের শারীরিক গঠন খুবই মজবুত। তাই অতিথি পাখিরা ৬০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ মিটার উঁচু আকাশসীমা পাড়ি দিয়ে উড়ে আসতে পারে। বড় পাখিরা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার অনায়াসে উড়তে পারে আর ছোট পাখিরা উড়তে পারে ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার। দিনে-রাতে মোট ২৪ ঘণ্টায় তারা প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে পারে। কিছু পাখি বছরে প্রায় ২২ হাজার মাইল পথ অনায়াসে পাড়ি দিয়ে চলে আসে বাংলাদেশে।

প্রাণিবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশে ৭৪৪ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। এর মধ্যে ৩০১ প্রজাতি বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করে বলে এদের আবাসিক পাখি বলা হয়। খণ্ডকালীন সময়ে নিয়মিতভাবে আসে ১৭৬ প্রজাতির পাখি, যা বাংলাদেশের অতিথি পাখি হিসেবে গণ্য। এ দেশে অতিথি পাখিদের আগমন শুরু হয় সেপ্টেম্বর থেকে। তবে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি-এ দুই মাসে বেশি পাখি আসে এ দেশে। এ সময়টিতে বাংলাদেশের নানা প্রান্তে দেখা মেলে অতিথি পাখিদের। এসব অতিথি পাখির কিচিরমিচিরে মুখর থাকে পুরো প্রকৃতি। এক মোহনীয় রূপ ধারণ করে হাওরাঞ্চলগুলো।

একদিকে দীঘিতে শান্ত জলরাশি, অন্যদিকে সবুজের সমারোহ-তারই মাঝে হাজারো পাখির কলকাকলি। সব মিলিয়ে উলুপুর দিঘির পাড় এখন হয়ে উঠেছে প্রকৃতি ও পাখির এক অপূর্ব মিলনমেলা। পাখিদের এই নিরাপদ বিচরণ যেন প্রতিবছর আরও সমৃদ্ধ হয় এবং উলুপুর দিঘির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন থাকে-এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

যমুনা সেতু পশ্চিম ইকোপার্কের ফরেস্টার রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘শীতের প্রকোপ কমে গেলে অতিথি পাখিরা আবার ছুটে চলে নিজ জন্মভূমিতে। বাংলাদেশে অবকাশ যাপনের ইতি ঘটিয়ে আপন ভূমিতে যাওয়ার জন্য আবারও হাজার মাইল পাড়ি দেয় তারা।’

তিনি আরও বলেন, ‌‘যে নিরাপত্তার জন্য এ দেশে অতিথি পাখি আসে, সে নিরাপত্তা তারা পায় না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য কিছু অসাধু মানুষ বিভিন্ন সময় তাদের শিকার ও হত্যা করে। শিকারিদের ফাঁদে পড়ে প্রতিবছর অতিথি পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এভাবে প্রতিবছর অতিথি পাখি নিধন হতে থাকলে প্রকৃতি হারাবে তার নিজস্ব রূপ, বিলুপ্তি ঘটবে বহু পাখি প্রজাতির। তাই সবার উচিত অতিথি পাখিদের নিরাপত্তাদানে মানবিক হওয়া।’

এম এ মালেক/এসজেডএইচ



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *