আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস: নাগরিক অধিকার ও আগামীর উত্তরণ
প্রতিবছর ১৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস’। গণতন্ত্র শুধু ক্যালেন্ডারের একটি নির্দিষ্ট দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, গণতন্ত্র হলো প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় নাগরিকের মৌলিক সম্মান ও অধিকারের প্রতিফলন। দিবসটি উপলক্ষ্যে এক বাণীতে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন দেশে বিদ্যমান গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতিকে সাধুবাদ জানাই।’
২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে ১৫ সেপ্টেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস’ হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মূলত ১৯৮৭ সালে বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে বেগবান করতে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এবং ১৯৯৭ সালে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের গৃহীত ‘গণতন্ত্র সংক্রান্ত সার্বজনীন ঘোষণা’ স্মরণে রাখতে এই দিনটি নির্ধারণ করা হয়। বিশ্বের প্রতিটি দেশে গণতন্ত্রের মূল্যবোধ রক্ষা করা গণতন্ত্রের অবস্থা মূল্যায়ন করা, মূল্যবোধ রক্ষা করা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
ভোটের বাক্সের বাইরের গণতন্ত্র
আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তায় গণতন্ত্রের পরিধি অনেক বেশি বিস্তৃত। অনেকেই সাধারণ অর্থে গণতন্ত্রকে কেবল নির্দিষ্ট মেয়াদ পর পর ব্যালট বাক্সে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। একটি কার্যকর গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো মুক্ত ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম: যেখানে সাংবাদিকতা কোনো অদৃশ্য ভয় বা সেন্সরশিপের মুখোমুখি হবে না যেখানে সাধারণ মানুষ ও ক্ষমতাবানের জন্য আইনের বিচার সমান হবে এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা থাকবে, ভিন্নমতের সম্মান থাকবে, সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের পাশাপাশি সংখ্যালঘুর কণ্ঠস্বর শোনা এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা থাকবে। সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ নাগরিকের জানার অধিকার থাকবে। অর্থাৎ গণতন্ত্র মানে হলো সেই পরিবেশ, যেখানে একজন সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রযন্ত্রের অনিয়মের বিরুদ্ধে ভয়হীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন।
একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ
বিশ্বজুড়ে দেখা যাচ্ছে ‘হাইব্রিড রেঝিম’ বা ছদ্মবেশী শাসনব্যবস্থার আধিক্য, যেখানে আপাতদৃষ্টিতে নির্বাচনের কাঠামো বজায় রাখা হলেও ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকারকে সংকুচিত করা হয়।ভবর্তমান বিশ্বে গণতন্ত্র এক অভূতপূর্ব ও সূক্ষ্ম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সোশ্যাল মিডিয়া যেমন মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্র প্রসারিত করেছে, তেমনি ভুয়া তথ্য, ঘৃণা ছড়ানো এবং রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে জনমতকে বিকৃত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
তরুণ সমাজ ও আগামীর পথ
আজকের দিনে তরুণরা কেবল ভোটার হিসেবেই নয়, বরং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি, অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হওয়া এবং সমাজ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যে কোনো গণতান্ত্রিক চর্চাকে বাঁচিয়ে রাখার বড় শক্তি হলো তরুণ সমাজ। তাই তরুণদের রাজনীতি বিমুখ না করে বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা না গেলে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব।
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় রাষ্ট্রের আসল মালিক জনগণ। গণতন্ত্র কোনো নিশ্চল বিষয় বা স্থায়ী ট্রফি নয় যা একবার অর্জন করলেই কাজ শেষ হয়ে যায়; এটি প্রতিনিয়ত চর্চা, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের একটি প্রক্রিয়া। নাগরিক হিসেবে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সোচ্চার থাকা, বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মাধ্যমেই গণতন্ত্র তার প্রকৃত রূপ পায়।
কেএসকে


