September 6, 2026

জোনাকিরা কেন ভুলে গেল আমাদের উঠানের পথ?

0
fireflies-4-20260906124034.avif.avif


গ্রীষ্মের সন্ধ্যা নামলেই একসময় গ্রামের আঁধার ভেদ করে জ্বলে উঠত ছোট ছোট আলো। উঠানের ঘাসে, পুকুরপাড়ে, ঝোপঝাড়ে কিংবা ধানক্ষেতের আল ধরে হঠাৎ জ্বলে উঠত ছোট্ট জোনাকির মিটিমিটি আলো। কিছুক্ষণ পর আরেকটি। তারপর একসঙ্গে অনেকগুলো।

শিশুরা ছুটে যেত সেই আলোর পেছনে। কেউ হাতের মুঠোয় ধরত, কেউ কাচের বোতলে জমাত। আবার কেউ শুধু দূর থেকে তাকিয়ে থাকত। অন্ধকার রাতের বুকজুড়ে জোনাকির সেই আলো ছিল প্রকৃতির নিজস্ব আলোকসজ্জা।

কিন্তু সেই দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না বললেই চলে। বেলজিয়ামের গবেষক রাফায়েল দ্য ককের শৈশবের স্মৃতিও এমনই। মাত্র নয় বছর বয়সে দাদার প্রকৃতিবিষয়ক বইয়ে পড়া জোনাকি বাস্তবে খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। পরে এক আর্দ্র গ্রীষ্মের রাতে সেই জায়গায় শত শত জোনাকির আলো দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন।

বহু বছর পর সেখানে ফিরে গিয়ে দেখলেন, জোনাকিরা আর নেই। জায়গাটিতে তৈরি হয়েছে বাড়িঘর ও শিল্পকারখানা।

দ্য কক এখন জোনাকি নিয়েই গবেষণা করেন। তার শৈশবের অভিজ্ঞতা এখন বিশ্বের অনেক মানুষেরই অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। গ্রীষ্মের রাতে জোনাকি কম দেখা যাচ্ছে—এমন স্মৃতি শুধু নস্টালজিয়া নয়, এর পেছনে বৈজ্ঞানিক কারণও রয়েছে।

জোনাকি পোকা/ ছবি: পেক্সেলস

জোনাকিরা কেন হারিয়ে যাচ্ছে

পৃথিবীতে জোনাকির ২ হাজার ৬০০টির বেশি প্রজাতি রয়েছে। অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া প্রায় সব মহাদেশেই তাদের দেখা যায়।

তবে এসব প্রজাতির বেশিরভাগ সম্পর্কেই বিজ্ঞানীদের কাছে থাকা তথ্য খুব সীমিত। এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫০টির মতো প্রজাতির সংরক্ষণগত অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়েছে। এগুলোর প্রায় ২০ শতাংশ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

গবেষকেরা বলছেন, জোনাকির সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে আবাসস্থল ধ্বংস, আলোকদূষণ, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন।

বাড়িঘর ও শিল্পকারখানায় হারাচ্ছে আবাস

জোনাকির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি হলো আবাসস্থল হারিয়ে যাওয়া।

যেসব জলাভূমি, বন, ঘাসভূমি ও ঝোপঝাড়ে তারা বংশবিস্তার করত, সেসব জায়গা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। শহর ও জনবসতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক এলাকা পরিণত হচ্ছে বাড়িঘর, রাস্তা ও শিল্পাঞ্চলে।

কোনো জোনাকি প্রজাতির জন্য যদি নির্দিষ্ট পরিবেশ প্রয়োজন হয়, সেই পরিবেশ হারালে তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।

মালয়েশিয়ার Pteroptyx tener প্রজাতির জোনাকি এর ভালো উদাহরণ। একই সময়ে একসঙ্গে আলো জ্বালানোর জন্য বিখ্যাত এই প্রজাতির প্রজননের জন্য ম্যানগ্রোভ বন প্রয়োজন। কিন্তু অনেক ম্যানগ্রোভ এলাকা পাম তেলের বাগান ও জলজ খামারে রূপান্তরিত হওয়ায় তাদের আবাসস্থল সংকুচিত হয়েছে।

জোনাকি পোকা/ ছবি: পেক্সেলস

হারিয়ে যাচ্ছে রাতের আঁধার

জোনাকির আরেক শত্রু কৃত্রিম আলো।

রাস্তার বাতি, বাড়িঘরের আলো, বাণিজ্যিক সাইনবোর্ড থেকে শুরু করে শহরের আকাশে ছড়িয়ে পড়া আলোর আভা—সবই রাতকে আগের চেয়ে উজ্জ্বল করে তুলছে। অথচ জোনাকির জীবনেই অন্ধকার রাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

অনেক প্রজাতির জোনাকি শরীরের ভেতরের রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে আলো তৈরি করে। সেই আলো ব্যবহার করে তারা সঙ্গীকে আকর্ষণ করে।

কৃত্রিম আলো বেড়ে গেলে তাদের আলোর সংকেত সহজে চোখে পড়ে না। ফলে প্রজনন ও যোগাযোগ ব্যাহত হতে পারে।

গবেষকদের হিসাবে, পৃথিবীর স্থলভাগের ২৩ শতাংশের বেশি এলাকায় রাতে কোনো না কোনো মাত্রায় কৃত্রিম আলো রয়েছে। অর্থাৎ জোনাকির জন্য প্রয়োজনীয় অন্ধকারও ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

জোনাকি পোকা/ ছবি: পেক্সেলস

কীটনাশকের আঘাত

জোনাকির সংকটে আরেকটি বড় কারণ কীটনাশক।

অতিরিক্ত কীটনাশক জোনাকির জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষতি করতে পারে। একই সঙ্গে তাদের খাদ্য হিসেবে থাকা ছোট প্রাণীর সংখ্যাও কমিয়ে দিতে পারে।

ফলে জোনাকির সরাসরি ক্ষতির পাশাপাশি তাদের খাদ্যের উৎসও সংকুচিত হয়। গবেষকেরা কৃষিতে ব্যবহৃত বেশ কিছু কীটনাশক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ

জোনাকির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বাড়ছে।

দীর্ঘস্থায়ী খরায় কোনো কোনো এলাকা জোনাকির বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠতে পারে। উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও শক্তিশালী ঝড়ও তাদের আবাসস্থল প্লাবিত বা ধ্বংস করতে পারে।

অর্থাৎ জোনাকির সংকট শুধু স্থানীয় পরিবেশের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনেরও যোগ রয়েছে।

জোনাকি পোকা/ ছবি: পেক্সেলস

জোনাকি দেখতে গিয়ে জোনাকির ক্ষতি

জোনাকির আলো দেখতে মানুষ এখন বিভিন্ন দেশে ছুটে যাচ্ছে। জাপান, তাইওয়ান ও মালয়েশিয়ায় জোনাকি পর্যবেক্ষণ দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় বিনোদন। কিন্তু এই পর্যটন দ্রুত বাড়ছে। প্রতিবছর ২ লাখের বেশি মানুষ জোনাকি দেখার জন্য বিভিন্ন স্থানে যান বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

পর্যটকের অতিরিক্ত চাপও জোনাকির ক্ষতি করতে পারে। থাইল্যান্ডে ম্যানগ্রোভ নদীতে পর্যটকদের মোটরবোট চলাচলের কারণে গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে নদীর তীর ও জোনাকির আবাসস্থল।

আবার যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা এবং মেক্সিকোর কিছু এলাকায় উড়তে না পারা জোনাকি পর্যটকদের পায়ের নিচে চাপা পড়ছে। ফলে জোনাকি রক্ষায় পর্যটন ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জোনাকি ফেরাতে কী করা যায়

জোনাকি ফেরাতে প্রথমেই প্রয়োজন তাদের আবাসস্থল রক্ষা করা।

জলাভূমি, বন, ঘাসভূমি, ম্যানগ্রোভ ও ঝোপঝাড়ের মতো প্রাকৃতিক এলাকা সংরক্ষণ করতে হবে। বাড়ির উঠানেও জোনাকির জন্য ছোট আবাস তৈরি করা সম্ভব।

অপ্রয়োজনীয় রাতের আলো কমানো যেতে পারে। অতিরিক্ত উজ্জ্বল বাতি এড়িয়ে চলা যায়।

বাগান ও কৃষিজমিতে অপ্রয়োজনীয় কীটনাশকের ব্যবহার কমানোও জরুরি। ঘাস খুব ছোট করে না কেটে কিছুটা লম্বা রাখা যেতে পারে।

শুকনো পাতা দ্রুত সরিয়ে না ফেললেও জোনাকির উপকার হয়। কারণ জোনাকির জীবনচক্রের একটি পর্যায় পাতার স্তর ও মাটির কাছাকাছি পরিবেশে সম্পন্ন হয়।

আর শিশুদের জোনাকি ধরার পুরোনো আনন্দ পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। তবে ধরলে কিছুক্ষণ পর আবার প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া উচিত।

জোনাকি পোকা/ ছবি: পেক্সেলস

জোনাকি রক্ষায় বিশ্বজুড়ে উদ্যোগ

জোনাকির বিষয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো তথ্যের ঘাটতি। পৃথিবীতে হাজার হাজার প্রজাতি থাকলেও বেশিরভাগ প্রজাতির জীবন ও আবাসস্থল সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা খুব কম জানেন।

এই ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়নের (আইইউসিএন) ফায়ারফ্লাই স্পেশালিস্ট গ্রুপ কাজ করছে। ২০১৮ সাল থেকে তারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জোনাকি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ, প্রজাতির তালিকা তৈরি এবং সংরক্ষণগত অবস্থা মূল্যায়নের কাজ করছে।

গবেষকেরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ বাড়ানো জরুরি। এতে কোন প্রজাতির সংখ্যা কতটা কমছে, কোথায় তারা টিকে আছে এবং কোন পরিবেশ তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এসব জানা সম্ভব হবে।

জোনাকি পর্যটনের ক্ষেত্রেও আলাদা নীতিমালা তৈরির কথা বলছেন গবেষকেরা। পর্যটকের পদচারণা, কৃত্রিম আলো ও কীটনাশকের প্রভাব কমিয়ে কীভাবে জোনাকি পর্যবেক্ষণ করা যায়, তা নির্ধারণ করতে হবে।

আবার ফিরবে জোনাকির আলো? 

জোনাকির গল্প আসলে শুধু একটি পোকার গল্প নয়। এটি বদলে যাওয়া প্রকৃতির গল্প। বদলে যাওয়া রাতের গল্প। আর মানুষের শৈশবের হারিয়ে যাওয়া একটি দৃশ্যের গল্প।

আজ কোনো গ্রামে কিংবা শহরের প্রান্তে হঠাৎ কয়েকটি জোনাকি দেখা গেলে সেটি হয়তো নিছক সুন্দর একটি দৃশ্য মনে হয়। কিন্তু সেই ছোট আলো মনে করিয়ে দেয়, আশপাশের পরিবেশ এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

অন্ধকার রাত ফিরিয়ে দেওয়া, প্রাকৃতিক আবাস রক্ষা, কীটনাশক কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার মতো উদ্যোগই পারে সেই আলোকে টিকিয়ে রাখতে।

তাতে হয়তো একদিন আবার গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় ঘাসের ওপর শত শত আলো জ্বলে উঠবে। শিশুরা আবার ছুটবে জোনাকির পেছনে। আর শৈশবের সেই দৃশ্য শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবে না।

সূত্র: সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
কেএএ/



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *