কবি ও গীতিকার আজিজুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী
তারা ভরা রাতে তোমার কথা যে মনে পড়ে বেদনায়, আমি রূপনগরের রাজকন্যা/রূপের জাদু এনেছি-সহ অসংখ্য কালজয়ী গানের রচয়িতা একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি ও গীতিকার আজিজুর রহমানের ৪৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
১৯৭৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর গ্যাংগ্রিন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কবি আজিজুর রহমান মারা যান।
কবি আজিজুর রহমান প্রায় তিন হাজারেরও অধিক গান এবং তিনশ’র বেশি কবিতা লিখেছেন। তবে, একুশে পদকপ্রাপ্ত এ কবির মৃত্যুর প্রায় অর্ধশত বছর হতে চললেও সরকারিভাবে আজও তার স্মৃতি সংরক্ষণে তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে তার বসতভিটা ও সমাধি চত্বর। নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে তার সমাধিস্থলসহ স্মৃতি চিহ্নগুলো।
তার বাস্তুভিটায় সরকারি উদ্যোগে অডিটোরিয়াম, লাইব্রেরি ও মিউজিয়াম নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা থাকলেও মাজারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন ছাড়া কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি।
এলাকাবাসী মনে করেন, সরকারের গ্রহণকৃত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য সহজেই কবির জীবনকর্ম ও সঠিক ইতিহাস জানার পাশাপাশি তাকে নিয়ে গবেষণার অপার সুযোগ সৃষ্টি হবে। সরকারি এ উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সেখানে গড়ে উঠতে পারে সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র।
জানা যায়, ১৯১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার গড়াই নদীর তীরে হাটশ হরিপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে কবি জন্মগ্রহণ করেন। কবি আজিজুর রহমানের বাবা বশির উদ্দিন প্রামানিক, মা সবুরুন নেছা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ৩ ছেলে ও ৪ মেয়ের জনক।
কিশোর আজিজুর রহমান মাত্র ১০-১২ বছর বয়সে পিতাকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। সহায়সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেও, প্রবল ইচ্ছার কারণে বিভিন্ন বিষয়ের পুস্তক স্বগৃহে পাঠ করে একজন স্বশিক্ষিত ব্যক্তিতে পরিণত হন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সমাজ সেবায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
১৯৩৮ সালে আজিজুর রহমান সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন এবং সওগাত, মোহাম্মদী, আজাদ, নবশক্তি, আনন্দবাজার, ভারতবর্ষ, বুলবুল, শনিবারের চিঠি ইত্যাদি পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। ১৯৫৪ সালে নিজস্ব শিল্পী হিসাবে তিনি ঢাকা বেতারে যোগদান করেন।
সাংবাদিক হিসেবেও তার খানিকটা পরিচিতি ছিল। অধুনালুপ্ত দৈনিক পয়গম পত্রিকায় ১৯৬৪ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক ছিলেন তিনি। ঢাকা থেকে প্রকাশিত কিশোর মাসিক ‘আলপনী’রও সম্পাদক ছিলেন একনিষ্ঠ এই কবি।
১৯৩৪ সালে তার দাদা চাঁদ প্রামাণিকের নামে হরিপুর গ্রামে গড়ে তোলেন ‘চাঁদ স্মৃতি পাঠাগার’। এটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি পাঠাগার ছিলো। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ বইয়ের খোঁজে আসতেন এই পাঠাগারে। তার সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিলো প্রবল।
তার বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- তোমার নামে তসবিহ খোদা/লুকিয়ে যেন রাখি, পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা/আমার এ দেশ ভাইরে, রক্ত রঙিন উজ্জ্বল দিন/বৃক্ষ শিখায় জ্বলছে, তারা ভরা রাতে তোমার কথা যে/মনে পড়ে বেদনায়, মনরে এই ভবের নাট্যশালায়/মানুষ চেনা দায়, আমি রূপনগরের রাজকন্যা/রূপের জাদু এনেছি, এই সুন্দর পৃথিবীতে/আমি এসেছিনু কিছু নিতে, এই রাত বলে ওগো তুমি আমার/ওই চাঁদ বলে ওগো তুমি আমার, দেখ ভেবে তুই মন/আপন চেয়ে পর ভালো তোর/এই রাজধানীর বুকে/কত জীবনের আশা ভেঙে যায়।
এছাড়াও ৩০০ উপরে কবিতা রচনা করেছেন। গ্রন্থের মধ্যে ডাইনোসরের রাজ্যে (১৯৬২), জীবজন্তুর কথা (১৯৬২)’ ছুটির দিনে (১৯৬৩)’ এই দেশ ‘আবহাওয়ার পয়লা কেতাব’ তার উল্লেখযোগ্য অনুবাদ গ্রন্থ।
স্থানীয়রা জানান, বহুগুণে গুণান্বিত একুশে পদক প্রাপ্ত কবির শেষ অস্তিত্ব টুকু হুমকির মুখে। সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর ইউনিয়নের বাজারের পাশে রয়েছে কবির সমাধিস্থল। কবির মাজার রক্ষায় নেওয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ।
কবি আজিজুর রহমান জীবনের শেষ দিনগুলোতে নানা দুশ্চিন্তা, আর্থিক অনটন ও রোগব্যাধিতে জর্জরিত ছিলেন। অর্থ সংকটের কারণে চিকিৎসা পর্যন্ত করাতে পারেননি। গ্যাংগ্রিন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি।
হাটশ হরিপুরে প্রায় এক একর জায়গা নিয়ে কবির বাস্তুভিটায় বর্তমানে কবির দুই ভাইয়ের সন্তান এবং কবির বড় ছেলে মৃত ফজলুর রহমান, মনি মিয়ার ছোট ছেলে আশফাকুর রহমান লিটন ও তার পরিবারের সদস্যরা বসবাস করছেন।
ক্ষোভ এবং হতাশা প্রকাশ করে কবির নাতি আশফাকুর রহমান লিটন বলেন, ‘কবির স্মৃতি রক্ষায় এখানে একাডেমি, মিউজিয়াম নির্মাণসহ সরকারিভাবে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা থাকলেও আজও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এমনকি জন্ম এবং মৃত্যুবার্ষিকী এ দুটি দিবসও রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয় না।’
কবি আজিজুর রহমান ছিলেন একাধারে কবি, গীতিকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার এবং জনপ্রতিনিধি। তার সাহিত্য ও সংগীত কর্মের যথাযথ মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তার অবদান তুলে ধরার দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। কথাগুলো বলছিলেন সম্মিলিত সামাজিক জোটের চেয়ারম্যান লেখক-গবেষক ড. আমানুর আমান।
কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মিজানুর রহমান জানান, রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো দিবস উদ্যাপন করতে হলে সরকারি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। আমরা কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কথা বলে এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।
আল-মামুন সাগর/কেজে/এএসএম
