ঊনসত্তর থেকে একাত্তর: চোখের সামনে বদলে যাওয়া ইতিহাস
(পূর্ব প্রকাশের পর-পর্ব ১৩)
১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বের করলেন তাঁর বই ‘প্রভু নয় বন্ধু—একটি রাজনৈতিক আত্মজীবনী’ (Friends Not Masters—A Political Autobiography)। সবাই জানত, এই বই আসলে লিখেছিলেন তাঁর তথ্যমন্ত্রী গওহর আইয়ুব। হিটলারের যেমন গোয়েবলস, আইয়ুব খানের তেমনি ছিল গওহর আইয়ুব। বইটি একজন সামরিক শাসক তথা তথাকথিত নির্বাচিত স্বৈরাচারের উন্নয়নের বয়ান এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানি বাঙালিদের নিকৃষ্টতম জাতি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দলিল।
১৯৬৮ সালটি ছিল স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের এক দশক পূর্তির বছর। মহোৎসাহে জাঁকজমকের সঙ্গে পালন করা হচ্ছিল ‘উন্নয়নের দশক’; অপরদিকে শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে রুজু করা হয় ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’। সম্ভবত একই বছরের ডিসেম্বর মাসে পল্টনে গিয়েছিলাম মওলানা ভাসানীর জনসভা দেখতে। পরনে পাঞ্জাবি, লুঙ্গি এবং বেতের টুপি মাথায় শুভ্রশ্মশ্রুমণ্ডিত এক মজলুম জননেতা। পল্টনের বিপুল জনসমাগমে হুংকার ছাড়লেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি না মানিয়া লইলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বিচ্ছিন্ন হইয়া স্বাধীন পূর্ববাংলা গঠন করিবে।’
দুই
স্বভাবতই ১৯৬৮ সালের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ হয়ে ওঠে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অগ্নিগর্ভ বছর। রাজবন্দীদের মুক্তির দাবির আন্দোলন রূপ নিল গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। ১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর ছাত্রনেতাদের সমন্বয়ে। এই সংগ্রাম পরিষদ ছিল ঐক্যবদ্ধ ও সক্রিয় গণশক্তি তথা ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টির সূতিকাগার।
তিন
ওই সময়টাতে অর্থনীতি বিভাগ শিক্ষকদের পদভারে সরগরম। তৃতীয় বর্ষে আমাদেরকে রেহমান সোবহান পাকিস্তানি ‘ইকোনমিক্স’ পড়াচ্ছিলেন তাঁর স্বভাবসুলভ রসালো উক্তি এবং অকাট্য যুক্তি ঢেলে। এরই মাঝে একটা পর একটা মিছিল গগনবিদারী স্লোগানে বারান্দা প্রদক্ষিণ করছে—টের পাচ্ছিলাম রুমের ভেতর থেকেই।
হঠাৎ কেউ একজন দরজাটায় সজোরে ধাক্কা মারলে স্যার দরজা খুললেন। ছেলেটি বলল, ‘ছেলেমেয়েদের মিছিলে নিতে চাই, এই তোমরা বেরিয়ে আসো।’ স্যার ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে বললেন, ‘আমি তো বৈষম্য এবং বঞ্চনা পড়াচ্ছি। তুমি এ বিষয়ে একটা লেকচার দাও, যাতে ওরা তোমার মিছিলে যেতে উদ্বুদ্ধ হয়।’ বলাবাহুল্য, শমিত ছেলেটি ‘সরি স্যার’ বলে শশব্যস্তে প্রস্থান করল।
চার
চারদিকে বারুদের গন্ধ এবং লাশের মিছিল। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি আসাদুজ্জামান এবং আরও কয়েকজন শহীদ হলেন। সেই থেকে মোহাম্মদপুরে ‘আসাদ গেট’ এবং শামসুর রাহমানের বিখ্যাত কবিতা ‘আসাদের শার্ট’। এর মাত্র চার দিন পর, ২৪ জানুয়ারি, পুলিশের গুলিতে নিহত হন নবকুমার ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী মতিউর এবং আরও অনেকে। পরিণতিতে সংগ্রামী জনতার পদভারে স্পন্দিত হয়ে ওঠে রাজপথ, অলি-গলি, গণজাগরণের অকল্পনীয় উত্তুঙ্গ ঢেউ। গণজোয়ারকে দমন করার জন্য আন্দোলনকারীদের ওপর নেমে আসে নৃশংস পুলিশি নির্যাতন। কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে আটক আগরতলা মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে ১৫ ফেব্রুয়ারি হত্যা করা হয়। এর তিন দিন পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মৌন মিছিলে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় ড. শামসুজ্জোহাকে।
এই আন্দোলন শুধু ছাত্র বা রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে নয়, বরং কৃষকদের মধ্যে, শ্রমিক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল—ফলে তা হয়ে উঠেছিল গণঅভ্যুত্থান, যার জেরে আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে। ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবসহ মামলার অভিযুক্তদের মুক্তি দেওয়া হয়। এখন যেটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত, সেখানে ২৩ ফেব্রুয়ারি তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় এবং ভূষিত করা হয় বঙ্গবন্ধু উপাধিতে।
সকাল থেকেই সকল প্রস্তুতি নিয়ে গিয়ে দেখলাম, রেসকোর্স ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ—তিল ধারণের ঠাঁই নেই। টিএসসি-লাগোয়া একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে অন্যদের মতো আমিও চাতকের মতো চেয়ে রইলাম সুউচ্চ, সুবিশাল সেই মঞ্চের দিকে। পরবর্তীকালে কবি নির্মলেন্দু গুণ ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতায় অপরূপে ধারণ করেছেন রেসকোর্স ময়দানের সেই দিনের সেই বিকেলটি।
পাঁচ
১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে কবি হেলাল হাফিজ ছাত্রাবস্থায় লিখেছিলেন তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’—
“এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।”
এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে প্রথম উপন্যাস কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচিত ‘চিলেকোঠার সেপাই’।
আর কবি শামসুর রাহমান লিখলেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাখানি:
‘………………………………
আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা, কলুষ আর লজ্জা
সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।’
ছয়
আমাদের সময় বিভিন্ন হলে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অন্যান্য হলের ছেলেরাও অংশগ্রহণ করতে পারত। জগন্নাথ হলের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় আমি নাম লিখালাম ‘আসাদের শার্ট’ কবিতা আবৃত্তি করার জন্য। সকালে উঠে বাংলা বিভাগে গেলাম কারও সাহায্য নেওয়ার জন্য। গিয়ে দেখি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার—বিখ্যাত গীতিকার এবং বিশেষত ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়…’ গানের রচয়িতা—রুমে আছেন।
বলার পর স্যার বললেন, ‘ঠিক আছে, আগে তোমার আবৃত্তি শুনি।’ তারপর আমাকে আবৃত্তি করা শিখিয়ে দিলেন। বলাবাহুল্য, আমি সেবার কোনো পুরস্কার পাইনি। তবে বিখ্যাত সেই উক্তি থেকে সান্ত্বনা পুরস্কার নিতাম—‘হারজিত বড় কথা নয়, অংশগ্রহণ করাই বড় কথা।’
১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে এক ভয়ানক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভোলা, হাতিয়া এবং মনপুরা। বলা হয়, সেটা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যাপক দুর্বিপাক। অনুমান করা হয়, ৩–৫ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে ওই দুর্যোগে; যারা বেঁচেছিল, তাদের অনেকে গাছের ডাল কিংবা বাঁশের খাম্বা ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিকেছিল।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এই ভয়ঙ্কর সময়টিতে মানুষের জন্য আশানুরূপ কিছু তো করেনি, এমনকি উপদ্রুত এলাকায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের প্রত্যাশিত সফরও বাস্তবায়িত হয়নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক জনসভায়, পত্রপত্রিকায় এবং বক্তৃতা-বিবৃতিতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এই নিষ্ঠুর দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর সমালোচনা অব্যাহত থাকে।
আগেই বলেছি, আমি কৈশোর থেকে গোগ্রাসে পত্রিকা পড়ুয়া—গভীর রাত অবধি হলের কমন রুমে রক্ষিত পত্রিকার পাতা উল্টাই, খবর পাই। এমনিতে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান প্রায় ঐক্যবদ্ধ, তার ওপর ঘটে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে আক্রান্ত মানুষকে অবহেলা করে শাসকগোষ্ঠী অমানবিকতার প্রমাণ রেখে অগ্নিশিখায় যেন তেল ঢেলে দিল। সংগত কারণেই ফুঁসছিল সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তান।
অতএব দেশটিতে উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহাওয়া বহমান। জহির রায়হান নির্মিত ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেল এপ্রিল মাসে। সামাজিক এই চলচ্চিত্রে তৎকালীন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনকে রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। ছবিটি মুক্তি পাওয়া মাত্রই গুলিস্তান সিনেমা হলে গিয়ে ২–৩ বার দেখেছিলাম।
আজও মনে আছে ছবিতে ব্যবহৃত সেই গানগুলো—‘আমার সোনার বাংলা’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ (কাজী নজরুল ইসলাম), ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ (আব্দুল গাফফার চৌধুরী), ‘এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে’ (খান আতাউর রহমান)।
শেষ গানটির গীতিকার এবং সুরকার খান আতা, যিনি স্বয়ং উক্ত ছবির প্রধান একটি চরিত্রে। একনায়কসুলভ বউয়ের ভয়ে ছাদে গিয়ে হারমোনিয়ামে গান গাইতে গিয়েও ধমকে ধরাশায়ী। সত্তর সালে লেখা হলেও ওই গানটির প্রাসঙ্গিকতা আজও আছে বলে মনে করি:
“এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে?
দিকে দিকে বাজল যখন
শেকল ভাঙার গান,
আমি তখন চোরের মত
হুজুর হুজুর করায় রত।
চাচা আপন বাঁচা বলে
বাঁচিয়েছি প্রাণ,
আসলে ভাই একা একা
বাঁচার নামে আছি মরে।
এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে?”
সাত
১৯৭০ সালের মার্চে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরে অনার্স পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এ সময় নির্বাচনের জন্য পরীক্ষা পিছানোর একটা দাবি জোরেশোরে উপস্থিত হয়। এর পেছনে থাকা যুক্তিগুলো অনেকটা অখণ্ডনীয়—যেমন অনেকে গ্রামে যাবে নির্বাচনী প্রচারের জন্য; ১৯৬৯-এর আন্দোলনের ধাক্কায় সিলেবাস শেষ হয়নি, সব পড়া হয়নি; এখন সময় দরকার ইত্যাদি। দাবির সঙ্গে আমরাও সহমতে ছিলাম।
একপর্যায়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর পরীক্ষা পেছানোর দাবি মেনে নিলেন তদানীন্তন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।
সেই বহু প্রতীক্ষিত এবং প্রত্যাশিত পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে। আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করল। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী বিজয়ী দলটির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে যেন অনীহ; যেভাবেই হোক ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিবিদদের হাতে থাকতেই হবে। সম্ভবত একেই বলে, বিচার মানি কিন্তু তালগাছটা আমার।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশন আহ্বান করে অপ্রত্যাশিতভাবে ১ মার্চ অনির্দিষ্টকালের জন্য তা মুলতবি ঘোষণা করেন। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ এই ত্যাঁদড়ামিতে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল, চারদিকে বহ্নিজ্বালা।
আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারা দেশে একযোগে হরতাল পালিত হয়। তিনি ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসভায় সমগ্র পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
এদিকে আমাদের স্থগিত পরীক্ষা নিয়ে মজার এক ব্যাপার ঘটল। যখন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় হলো এবং পরীক্ষার তারিখ ঠিক হলো, তখন কিছু কিছু ছাত্র অটো পাসের দাবি তুলল—‘অটো অটো’ চাই, নইলে কারও রক্ষা নাই—দাবি তুলে ক্যাম্পাস কাঁপাত। আমার বন্ধু রেজাউদ্দিন তাদের নাম দিয়েছিল ‘অটো পাখি’। মনে আছে, কেউ যাতে ‘মিরজাফর’ তকমা লাগাতে না পারে, সে জন্য আমরা বেশ কিছু ছাত্র গভীর রাতে চাদর মুড়ি দিয়ে ভিসির কাছে পরীক্ষা নেওয়ার দাবি নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি আমাদের জানালেন, ‘পরীক্ষা অবশ্যই হবে।’
তার পরের ইতিহাস অন্য রকম। আমাদের পরীক্ষা শুরু হলো ১৯৭০-এর ডিসেম্বরে, কিন্তু মুক্তিসংগ্রামের কারণে অর্থনীতির সম্ভবত দুই পেপার বাকি ছিল। যুদ্ধ চলাকালে কেউ কেউ পাকিস্তানি শাসকদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল, যখন দখলদার সরকার ধমকধামক দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। আমি পণ করেছিলাম, ওদের অধীনে পরীক্ষা দেব না, যায় যাক ডিগ্রি তাতে। অবশ্য যুদ্ধ শেষে স্থগিত পরীক্ষাগুলো না নিয়ে অনুশীলনী নম্বর যোগ করে, কোথাও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে, একটা ‘হাইব্রিড’ পদ্ধতিতে ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
আট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে আমার অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন কর্মসূচি প্রত্যক্ষ করা। বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উড়েছিল দেশটি স্বাধীন হওয়ার আগেই—পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে—১৯৭১ সালের ২ মার্চে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে সে পতাকা উড়িয়েছিলেন তখনকার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা। সবুজ জমিনের ওপর লাল গোলাকার বৃত্তের ওপর বাংলাদেশের মানচিত্র-সম্বলিত পতাকার নকশাবিদ ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শিব নারায়ণ দাশ; ইকবাল হলের ১০৮ নম্বর কক্ষে এই ঐতিহাসিক কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছিল বলে জানতে পেরেছিলাম।
একাত্তরের ২ মার্চে ছাত্রদের পক্ষে পতাকাটি উত্তোলন করেছিলেন তৎকালীন ডাকসুর ভিপি আ স ম আব্দুর রব। এই পতাকা উত্তোলনের ঘটনা মুক্তিকামী ছাত্র-জনতাকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে প্রচণ্ডভাবে আন্দোলিত করেছিল। সেদিন সমাবেশ ছিল বটতলায়, কিন্তু বটতলায় পতাকা ওড়ালে সবাই দেখবে না বলে কলাভবনের দক্ষিণ-পশ্চিমের গাড়ি বারান্দার ছাদ থেকে সেটি উত্তোলন করেছিলেন।
পতাকা ওড়াতে আ স ম আব্দুর রব ছাড়াও ডাকসুর তৎকালীন জিএস আব্দুল কুদ্দুস মাখন, ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ কলাভবনের দোতলায় ওঠেন। সেখান থেকে রেলিং টপকে তাঁরা গাড়ি বারান্দার ছাদে অবস্থান নিয়েছিলেন।
কলা ভবনের দোতলার বারান্দার রেলিঙে দুহাত রেখে এই দৃশ্য স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।
নয়
বোধ করি সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা অন্যটি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পটভূমিতেই ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় বিপুলসংখ্যক লোক একত্রিত হয়; পুরো ময়দান পরিণত হয় এক মহাজনসমুদ্রে। এই জনতা এবং সার্বিকভাবে সমগ্র জাতির উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণটি প্রদান করেন।
সকাল থেকেই সকল প্রস্তুতি নিয়ে গিয়ে দেখলাম, রেসকোর্স ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ—তিল ধারণের ঠাঁই নেই। টিএসসি-লাগোয়া একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে অন্যদের মতো আমিও চাতকের মতো চেয়ে রইলাম সুউচ্চ, সুবিশাল সেই মঞ্চের দিকে। পরবর্তীকালে কবি নির্মলেন্দু গুণ ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতায় অপরূপে ধারণ করেছেন রেসকোর্স ময়দানের সেই দিনের সেই বিকেলটি—
“একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে
ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ‘কখন আসবে কবি?’
…………………………………………………
শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি:
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।”
(চলবে)
লেখক : অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীনরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
এইচআর/জেআইএম
