September 11, 2026

অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে ‘সুপ্ত-গুপ্ত’ নিয়ে ক্ষোভ, সমাধান কী?

0
gov-ms7fxa61dz5c8mj-20260730174050.jpg


অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে ২৬৫ আইন কর্মকর্তার নিয়োগ ঘিরে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে আইনজীবী মহলে। নিয়োগ পাওয়া কয়েকজনকে ‘সুপ্ত দোসর, গুপ্ত’ আখ্যা দিয়ে তাদের অপসারণের দাবি উঠেছে; অন্যদিকে দীর্ঘদিনের আন্দোলনকারী ও যোগ্য অনেক আইনজীবী বাদ পড়ায় ক্ষোভও বাড়ছে। প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—বিতর্কিত নিয়োগ নিয়ে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত হবে?

নিয়োগ নিয়ে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মধ্যে আলোচনা চলছে। বিএনপি ও সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও বিষয়টি সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিক্ষুব্ধ আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর আশ্বাসও এসেছে।

ঢালাও বাদ পড়ায় ইমেজ সংকট

আইনজীবীদের একাংশের অভিযোগ, নতুন নিয়োগে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় এবং যোগ্য অনেক আইনজীবীকে বাদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ায় অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া

এ বিষয়ে বিএনপির আইনজীবী গাজী কামরুল ইসলাম সজল বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট দোসরদের’ নিয়োগ দেওয়ার প্রতিবাদে আইনজীবীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, গুপ্ত ও সুপ্ত ফ্যাসিস্টের দোসরদের কেউ কেউ নতুন তালিকায় স্থান পেয়েছেন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনে থাকা এবং অভিজ্ঞ অনেক আইনজীবী বাদ পড়েছেন।’

নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা ঝুঁকি মনে করা হচ্ছে যে, এই গুপ্ত ও সুপ্ত ফ্যাসিস্টরা যদি কার্যালয়ে অবস্থান করে, তবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বিঘ্নিত হতে পারে।

তিনি বলেন, নিয়োগের পুরো বিষয়টি নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলেরও কিছুটা দায় রয়েছে। তবে তিনি নিয়োগের বিষয়টির পুরো চিত্র জানতেন না এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের বাদ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি সমাধানে বিএনপি ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং সিনিয়র আইনজীবীরা আলোচনা করছেন বলেও জানান তিনি।

বিতর্কিত নিয়োগ ও বাদ পড়াদের অসন্তোষ

সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে পুনর্নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে অনেকদিন ধরে আলোচনা চলছিল। কিন্তু নতুন তালিকায় দলের জন্য ত্যাগী ও দীর্ঘদিনের অনেক আইনজীবী বাদ পড়েছেন।

তবে প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তার মতে, সমস্যা থাকলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। বাদ পড়া এবং আগে আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অনেককে পুনরায় নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছেন। তাই নিয়োগে কোনো অনিয়ম থাকলে তা খতিয়ে দেখে সংশোধনের সুযোগ রয়েছে।

১৭ বছরের আন্দোলনকারীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ

সাবেক বিচারক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফয়সাল মাহমুদ ফয়েজী বলেন, গত ১৭ বছর ধরে যারা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ছিলেন এবং বিভিন্নভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের অনেককেই এবার বাদ দেওয়া হয়েছে।

তার অভিযোগ, নিয়োগে যোগ্যতার পরিবর্তে স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক সুপারিশ, চেম্বারের সম্পর্ক, আত্মীয়তা ও আঞ্চলিকতার মতো বিষয় প্রভাব ফেলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও কোথাও কোথাও গুরুত্ব পেয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

ফয়সাল মাহমুদ ফয়েজীর ভাষ্য, নতুন তালিকায় এমন কয়েকজনের নাম রয়েছে, যারা নিয়মিত আদালতে প্র্যাকটিস করেন না বা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন না। বিপরীতে আন্দোলনে সক্রিয় ও যোগ্য অনেক আইনজীবীকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

অনিয়ম তদন্তের দাবি

বিএনপির আইনজীবী ফোরামের প্রচার সম্পাদক মাহবুবুর রহমান খান বলেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু অনিয়ম এবং রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যোগ্য অনেককে বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।

তবে তার মতে, দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে সবাইকে একইভাবে দেখা ঠিক নয়। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ রয়েছে, তাদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, নিয়োগের প্রতিবাদে আদালত অঙ্গনে যে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে বিএনপির ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই অভিযোগগুলো তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানে আসা প্রয়োজন।

ভুল হয়েছে, সংশোধনের সুযোগ আছে

ব্যারিস্টার মো. সাইফুল আলম উজ্জ্বল বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াটি নিন্দনীয় এবং সমস্যাযুক্ত। জুলাই আন্দোলনের পর আইনজীবীদের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তার প্রতিফলন ঘটেনি।

তবে তিনি বলেন, কোনো একটি নির্দিষ্ট আইনজীবী ফোরাম থেকেই সবাইকে নিয়োগ দিতে হবে—এমন নয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ বা স্বৈরাচারী শাসনের সহযোগী কেউ যেন নিয়োগ না পান, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

তার মতে, বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ থাকলে তা যাচাই করা সম্ভব। প্রয়োজনে প্রকাশ্য যাচাই, সাক্ষাৎকার বা পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতা নির্ধারণ করা যেতে পারে।

সাইফুল আলম উজ্জ্বল বলেন, ‘ভুল হয়েছে, এখন সংশোধনের সুযোগ আছে।’ এ জন্য বিক্ষুব্ধ আইনজীবীদের সঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। একই সঙ্গে প্রতিবাদের নামে অশালীন স্লোগান ও বিশৃঙ্খলা আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার তাগিদ

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইলিয়াস আহমেদ মণ্ডল বলেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। যোগ্য ও দলের জন্য দীর্ঘদিন কাজ করা অনেক আইনজীবীকে মূল্যায়ন করা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (এএজি) নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্থায়ী ও দীর্ঘদিনের আইনজীবীদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, নিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশের অধিকার থাকলেও আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হলে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই ভবিষ্যতে নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

আলোচনায় সমাধানের আশা

বিএনপির কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার এম বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, ‘এখন সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে।’ নিয়োগ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবেই বিষয়টি সমাধানের প্রক্রিয়া এগোচ্ছে বলে জানান তিনি।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি সমাধান হবে, যা সংশ্লিষ্ট সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন পরিস্থিতিকে ‘বেশ বড় ধরনের অস্বস্তিকর’ বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেক আইনজীবী এবার বাদ পড়েছেন।

তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের জন্য অস্বস্তিকর। সুপ্রিম কোর্টের বাইরে এ ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি যেমন আমাদের বিব্রত করছে, তেমনি সরকারের জন্যও এটি অস্বস্তিকর। বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভাবতে হচ্ছে এবং একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।’

ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আরও বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট মহলের সবার সঙ্গে যোগাযোগ করছি। আশা করি, দ্রুতই এ বিষয়ে সমাধান বা একটি গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এফএইচ/এসএইচএস



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *