বিজ্ঞানীরা কি ডার্ক ম্যাটারের কণা খুঁজে পেয়েছেন?
মহাবিশ্বের অন্যতম বড় রহস্য ডার্ক ম্যাটারের সন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যে চালানো পরীক্ষায় এমন একটি অস্বাভাবিক কণার প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে, যা ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য কণার সঙ্গে মিলে যায়।
তবে বিজ্ঞানীরা এখনই এটিকে ডার্ক ম্যাটারের নিশ্চিত প্রমাণ বলছেন না। তাদের ভাষ্য, পরীক্ষায় মাত্র একটি ব্যাখ্যাতীত কণার প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। তাই বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন।
ডার্ক ম্যাটারকে মহাবিশ্বের অন্যতম বড় রহস্য হিসেবে ধরা হয়। বিজ্ঞানীরা এর অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছেন এর মহাকর্ষীয় প্রভাবের মাধ্যমে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এটিকে সরাসরি দেখা বা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
ডার্ক ম্যাটার কী?
বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিশ্বের মোট পদার্থের প্রায় ২৭ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার। এটি আলো প্রতিফলিত করে না এবং তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের সঙ্গেও সরাসরি মিথস্ক্রিয়া করে না। এ কারণে সাধারণ যন্ত্র দিয়ে এটি দেখা বা শনাক্ত করা কঠিন।
অন্যদিকে, মহাবিশ্বের প্রায় ৬৮ শতাংশ ডার্ক এনার্জি দিয়ে গঠিত বলে ধারণা করা হয়। এই শক্তি মহাবিশ্বের প্রসারণকে আরও দ্রুত করছে।
আমরা যে সাধারণ পদার্থ দেখতে ও স্পর্শ করতে পারি, তা মহাবিশ্বের মোট অস্তিত্বের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ।
ডার্ক ম্যাটারকে দেখা না গেলেও এর মহাকর্ষীয় প্রভাব বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করেছেন। ছায়াপথগুলো কীভাবে ঘোরে এবং বড় ছায়াপুঞ্জের আশপাশে আলো কীভাবে বাঁক নেয়, তা পর্যবেক্ষণ করেই ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ডার্ক ম্যাটারের ধারণা কীভাবে এল?
১৯৩০-এর দশকে সুইস জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রিটজ জভিকি ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্বের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পান।
তিনি কোমা ছায়াপুঞ্জের ছায়াপথগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখেন, সেগুলো এত দ্রুত গতিতে চলছে যে সেখানে দৃশ্যমান পদার্থের মহাকর্ষ দিয়ে ছায়াপথগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখা সম্ভব নয়।
এর পর বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, সেখানে এমন কোনো অদৃশ্য পদার্থ রয়েছে, যার মহাকর্ষ ছায়াপথগুলোকে ধরে রাখছে। পরবর্তী কয়েক দশকে আরও গবেষণায় এই ধারণার পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়।
নতুন পরীক্ষায় কী পাওয়া গেছে?
ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য কণার সন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটার স্যানফোর্ড ভূগর্ভস্থ গবেষণা কেন্দ্রে একটি বড় পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।
৩৮টি প্রতিষ্ঠানের ২৫০ জন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী এই গবেষণায় অংশ নিয়েছেন। মাটির গভীরে থাকা একটি বিশাল ট্যাংকে অত্যন্ত বিশুদ্ধ তরল জেনন রাখা হয়েছে। ট্যাংকের চারপাশে রয়েছে শত শত আলোকসংবেদী যন্ত্র।
বিজ্ঞানীরা এমন একটি কাল্পনিক কণার সন্ধান করছিলেন, যাকে দুর্বলভাবে ক্রিয়াশীল ভারী কণা বলা হয়। ধারণা করা হয়, এই কণা জেনন পরমাণুর কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে নির্দিষ্ট শক্তিতে দুই দফা আলোর ঝলক তৈরি হতে পারে।
২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২২০ দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করেন গবেষকরা। এতে তারা ২০২৩ সালের ১৬ জুন এমন একটি ঘটনার সন্ধান পান, যা তাদের প্রত্যাশিত সংকেতের সঙ্গে মিলে যায়।
তবে গবেষণার মুখপাত্র রিক গেইটস্কেল সতর্ক করে বলেছেন, বিজ্ঞানীরা এখনো ডার্ক ম্যাটার শনাক্ত করার দাবি করছেন না।
কেন ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ?
বিজ্ঞানীদের মতে, এখন পর্যন্ত এই পরীক্ষায় পাওয়া সংকেতগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এটি এমন একটি কণার সম্ভাব্য অস্তিত্বের ইঙ্গিত দিতে পারে, যার ব্যাখ্যা বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব নয়।
গবেষণায় অংশ নেওয়া সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ থেরেসা ফ্রুথ বলেন, ঘটনাটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গবেষকরা এটি বহুবার পরীক্ষা করেছেন এবং প্রতিবারই একই ফল পেয়েছেন।
তবে একটি মাত্র ঘটনার ভিত্তিতে ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আরও তথ্য সংগ্রহ এবং একই ধরনের ঘটনা বারবার শনাক্ত করা প্রয়োজন।
ভবিষ্যতের পরীক্ষায় যদি একই ধরনের সংকেত পাওয়া যায় এবং এর অন্য কোনো সম্ভাব্য কারণ না থাকে, তাহলে এটি অন্ধকার পদার্থের অস্তিত্বের প্রথম শক্তিশালী প্রমাণ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা
এমএসএম
