September 9, 2026

ইরান যুদ্ধের মধ্যেই চীন-কাতার সম্পর্ক কেন আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে?

0
og_1788939175_6aa10ba701189.jpeg


কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ও মঙ্গলবার চীন সফর করেন। চীনা কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন ‘স্বর্ণযুগে’ প্রবেশের পর্যায়ে রয়েছে।

আল থানির দুই দিনের এই সফরকে বেইজিং ও দোহা এমন এক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক যোগাযোগ হিসেবে দেখছে, যখন ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে অস্থিরতা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে চাপে ফেলেছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে কাতারকে ‘গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে বিবেচনা করে চীন। সফর শেষে দুই দেশ জ্বালানি, বিনিয়োগ ও উন্নত প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি ইরান যুদ্ধ এবং তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতায় কাতারের প্রচেষ্টাও এবারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিডিয়া ও যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক ইব্রাহিম বিন সুলতান আল-হাশমি মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দোহায় সাংবাদিকদের বলেন, যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার ভাষায়, এই অবস্থা অঞ্চল, আঞ্চলিক দেশ ও সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনছে না। কাতার তার অংশীদারদের, যার মধ্যে চীনও রয়েছে, সঙ্গে নিয়ে সংকট সমাধানে কাজ করছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে ও নতুন নতুন ধারণা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

চীনও দোহাকে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। একই সময়ে কাতার চীনকে জানিয়েছে, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তারা জ্বালানি সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেবে।

হরমুজ প্রণালির অস্থিরতায় কেন ঝুঁকি বাড়ছে

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় চীন ও কাতার- উভয়ের জন্যই পরিস্থিতির গুরুত্ব বেড়েছে। কাতার বিশ্বের অন্যতম বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি রপ্তানিকারক। অন্যদিকে, চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিকারক। বিশ্বে স্বাভাবিক সময়ে যে পরিমাণ তেল ও এলএনজি পরিবহন হয়, তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দুই দেশের অর্থনীতিতেই বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

জ্বালানি খাতই চীন-কাতার সম্পর্কের মূল ভিত্তি। চীন কাতারের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩.৮ বিলিয়ন বা ২৩৮০ কোটি ডলার। ২০২৫ সালে কাতার চীনকে ১ কোটি ৯৪ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করেছে, যা কাতারকে চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারীতে পরিণত করেছে।

এ সম্পর্ক শুধু জ্বালানি কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ নয়। কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি কাতারএনার্জি চীনের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সিএনপিসি ও সিনোপেকের সঙ্গে ২৭ বছরের এলএনজি সরবরাহ চুক্তি করেছে। চীনা এই দুই প্রতিষ্ঠান কাতারের বিশাল নর্থ ফিল্ড গ্যাস সম্প্রসারণ প্রকল্পেও অংশীদার হয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালির স্থিতিশীলতা দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

ইরান প্রশ্নে একই স্বার্থ, ভিন্ন কৌশল

চীন ও কাতারের স্বার্থের বড় একটি জায়গায় মিল থাকলেও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের কৌশলে পার্থক্য রয়েছে। চীন বারবার কাতারের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছে। তবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলা কিংবা জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার ঘটনায় বেইজিং সরাসরি তেহরানের সমালোচনা থেকে অনেকটাই বিরত থেকেছে। বরং চীনের কর্মকর্তারা সংঘাতের জন্য মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে আসছেন।

চীনা কূটনীতিকদের ভাষায়, এই সংঘাত ‘কখনোই হওয়া উচিত ছিল না’। একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু বছর ধরে চীন ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। সেই সঙ্গে তেহরানের ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতাও করে আসছে বেইজিং।

কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইও কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে চাপ সৃষ্টি কোনো সমাধান নয়; সংলাপ ও আলোচনাই একমাত্র কার্যকর পথ।

তবে কাতারের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। ইরানের হামলায় নিজেদের ভূখণ্ড ও উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলো আক্রান্ত হওয়ায় দোহা প্রকাশ্যে তেহরানের নিন্দা করেছে। সংকট সমাধানের বিভিন্ন উদ্যোগ ব্যর্থ বা থমকে যাওয়ায় কাতার হতাশ হলেও তারা এখনো সংলাপের পথ খোলা রাখতে মধ্যস্থতা করে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় কাতারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তেহরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ শক্তিশালী। ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকট কমাতে কাতারের প্রচেষ্টায় চীনকে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা গেলে দোহা এমন একটি প্রভাবশালী পক্ষকে পাশে পেতে পারে, যার তেহরানের ওপর নিজস্ব প্রভাব রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও অটুট রাখতে চায় চীন

তবে কাতারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর সময় চীনকে আরেকটি বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। কাতারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ও সামরিক অংশীদারত্ব রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি আল উদেইদও কাতারে অবস্থিত।

৩ মার্চ ইরান কাতারের দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হলেও অন্যটি আল উদেইদে আঘাত হানে। এতে কেউ হতাহত না হলেও ওই হামলার পর দোহা ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিল।

চীন অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা নিয়ে কাতারের নিরাপত্তার প্রধান নিশ্চয়তাদাতা হতে চাইছে না। বেইজিংয়ের সেন্টার ফর চায়না অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশনের গবেষক জোন আহমেদ খানের মতে, বর্তমানে চীন এমন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে অতিরিক্ত বিকল্প খুঁজছে।

তবে প্রশ্ন হলো, ইরানের ক্ষেত্রে চীন তার প্রভাব কতটা ব্যবহার করতে প্রস্তুত। এখন পর্যন্ত ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির ওপর বড় ধরনের চাপ প্রয়োগে চীনের খুব বেশি আগ্রহ দেখা যায়নি।

ইরানের বাইরেও সম্পর্কের বিস্তৃতি

কাতারের প্রধানমন্ত্রীর দুই দিনের চীন সফরের আলোচনার বিষয় শুধু ইরান ছিল না। বরং চলমান যুদ্ধ দুই দেশকে তাদের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়েছে। কাতার যে সম্পর্ককে ‘আরও বিস্তৃত দিগন্তে’ নিয়ে যেতে চায়, সফরে সেটিও স্পষ্ট হয়েছে।

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং ঐতিহ্যবাহী ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অর্থ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কাতারের প্রধানমন্ত্রী আল থানিও উচ্চপ্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

কাতারে চীনা বিনিয়োগও দ্রুত বাড়ছে। ইনভেস্ট কাতারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে ৫২০টি চীনা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গত এক দশকে এসব কোম্পানির বিনিয়োগ প্রকল্পের মূল্য ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং এসব প্রকল্পে ৩ হাজার ২০০টির বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

সব মিলিয়ে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিরতা চীন-কাতার সম্পর্কের জন্য শুধু ঝুঁকি তৈরি করেনি, বরং দুই দেশের সহযোগিতা আরও গভীর করার প্রণোদনাও বাড়িয়েছে। জ্বালানি ও বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং কূটনীতিতে সম্পর্ক বিস্তৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে ইরান সংকট পরীক্ষা করছে—চীন ও কাতার তাদের পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কূটনৈতিক প্রভাব কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে।

সূত্র: আল-জাজিরা, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, চায়না ডেইলি

এসএএইচ



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *