September 10, 2026

আকাশ ও পানির মধ্যবর্তী নীল

0
lash-mt1692m9u0hrcxi-20260820130511.jpg


মূল: সুসান আবুলহাওয়া
ভাষান্তর: হাসানাত রাজিব

আমার দাদির নাম ছিল মরিয়ম। তিনি রং সংগ্রহ করতেন এবং সেগুলোকে পরিমার্জন করতেন। আমার জন্ম হয়েছিল দুই প্রজন্ম পরে আর তিনি আমার নাম রেখেছিলেন তার একজন কাল্পনিক বন্ধুর নামে। হয়তো এটি তার কল্পনা ছিল না। হয়তো এটি আমিই ছিলাম। কারণ আমাদের এখন প্রায়ই নদীর পাশে দেখা হয় এবং আমি তাকে পড়ালেখা শেখাই।

সেখানে একটি গ্রাম আছে। যার চারপাশে বাগান এবং জলপাই উদ্যানের সমাহার। এটা উত্তর দিকের একটি হ্রদের পাশে। যেটা ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কায়রো থেকে দামেস্ক যাওয়ার পথে মেইল রুট ছিল। এই রাস্তাতেই যেসব পর্যটক এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বাণিজ্য রুটের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতো; তাদের জন্য প্রাচীন রাস্তার পাশে কারাভানাসেরাই নামে একটা হোটেল ছিল। মামলুকরা এটি ১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাণ করেছিলেন; যখন তারা ফিলিস্তিনে রাজত্ব করতেন এবং এটা গ্রামবাসীর কাছে অনেক শতাব্দী ধরে এল-খান নামে পরিচিত। বাইত দারাস ছিল একটি প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। যেটি ক্রুসেডররা ১১০০ শতাব্দীর প্রথমদিকে নির্মাণ করেছিলেন। যা পর্যায়ক্রমে কয়েক লাখ বছর আগে আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট দ্বারা নির্মিত একটি দুর্গের সাথে দগ্ধ হয়েছিল। ক্ষমতাধরদের জন্য একসময় এটা একটা স্টেশন ছিল। যেটি ইতিহাস ভেঙে ভেঙে ধ্বংসাবশেষে পরিণত করেছে। যা অবশিষ্ট ছিল; তা অতি যত্নের সাথে দাঁড়িয়ে ছিল। এখনো সেটা দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে ছেলেমেয়েরা খেলা করতো আর তরুণ-তরুণী যুগল সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে পালাতো।

বাইত দারাসের মধ্য দিয়ে ইশ্বরের দেওয়া মাছ এবং উদ্ভিদে পরিপূর্ণ একটি নদী বয়ে গিয়েছিল। যেটি সবার জন্য আশীর্বাদ ছিল। নদীটি গ্রামের বর্জ্য, গ্রামবাসীর স্বপ্ন, কথোপকথন, প্রার্থনা এবং তাদের জীবনের গল্প বয়ে নিয়ে গাজার উত্তরে মেডিটারেনিয়ান নদীতে এনে নিশেঃষ করে দিতো। প্রস্তরের ওপড় দিয়ে বয়ে যাওয়া পানি পৃথিবীর অন্তঃশীলাগুলো গুনগুন করে বলে যেত এবং হামাগুড়ি, লাফালাফি, ভোঁ ভোঁ শব্দ আর খেচর প্রাণীদের ছন্দে সময় বিজড়িত হয়ে যেত।

যখন মরিয়মের বয়স পাঁচ বছর, সে তার বোন নাজমিয়ার চোখের সুরমা চুরি করেছিল। গাছের পাতার মধ্যে প্রার্থনা লিখতে সেটি ব্যবহার করেছিল। সে পাতাটি বাইত দারাসের নদীতে ফেলে দিয়েছিল। প্রার্থনাটি ছিল একটি পেন্সিলের জন্য। শুধু একটি পেন্সিল থাকলেই যে কক্ষে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া যায়, তার অনুমতি পাওয়ার জন্য। তার লেখাগুলো হিজিবিজি ছিল অবশ্যই। গ্রামবাসীর মাসিক চাঁদার বিনিময়ে দুই কক্ষবিশিষ্ট এবং চারজন শিক্ষকসহ একটি ইলিমেন্টারি স্কুল থাকা সত্ত্বেও। সে বরং তার ভাই আর অন্য ছাত্রদের স্কুলের পোশাক পরিধান করে হাতে একটি করে পেন্সিল নিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া দেখতে পছন্দ করতো। যেটা সত্যিকারের বিদ্যালয় পড়ুয়াদের প্রতীক ছিল। সে আরও বেশি পছন্দ করত; যখন তারা বইয়ের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে পাহার বেয়ে বেয়ে চিৎকার করতে করতে সেই মায়াময় জায়গাতে যায়। যেখানে দুটি কক্ষ, চারজন শিক্ষক আর অনেক অনেক পেন্সিল আছে। যেমনটা দেখা গিয়েছিল, মরিয়মের শিক্ষালাভের জন্য বিদ্যালয়ের দরকার হয়নি। শুধু পেন্সিল আর কাগজের দরকার ছিল। সে নিজের মধ্যে খালেদ নামে একজন কাল্পনিক বন্ধু তৈরি করলো। যে মরিয়মকে পড়ালেখা শেখাতো আর প্রতিদিন বাইত দারাসের নদীর পাশে অপেক্ষা করতো।

মরিয়মের কাছে নদীটির রং একটা প্রহেলিকার মতো। সে নদীটির তীরে বসে গভীরভাবে চিন্তা করছিল, কিভাবে বর্ণহীন জিনিসগুলো তার চারপাশের সবকিছু থেকে রং গ্রহণ করে! রোদেলা দিনগুলোতে নদীটি দেখতে আকাশের মতো ঝকঝকে নীল মনে হয়। বসন্তকালে যখন পুরো পৃথিবী বিশেষভাবে সবুজ থাকে; তখন নদীটিও সবুজ বর্ণ ধারণ করে। অন্যান্য সময় এটা পরিষ্কার থাকতো এবং মাঝে মাঝে মেঘাচ্ছন্ন আর কর্দমাক্ত থাকে। সে প্রশ্ন করতো কিভাবে নদীটি এত রং ধারণ করতে পারে। যখন সমুদ্রের রং সব সময় শুধুই নীল-সবুজ থাকে। শুধু রাতের সময় ছাড়া যখন কালোর পবিত্রতা সবকিছুকে ঘুমাবার জন্য আবৃত করে দেয়।

অনেক ভেবে দেখার পর মরিয়ম উপসংহার টেনে দিলো যে, কিছু কিছু জিনিস স্বাভাবিকভাবেই রং পরিবর্তন করে। সে অল্প বয়সে আরও বুঝতে পারলো যে, তার কল্পনাশক্তি বাকি সবার মতো নয়। মানুষ তাদের মনের অবস্থা অনুযায়ী রং পরিবর্তন করে। কিন্তু তার বোন নাজমিয়া বলেছিল, শুধু মরিয়মই এই পরিবর্তনটা দেখতে পেত। মানুষ যখন প্রার্থনা করতো, তাদের আচরণ থাকতো শান্তশিষ্ট, যদিও সব সময় নয়। মানুষের অভিব্যক্তি তাদের আভাসের সাথে মিলতো না। সাদা আভাকে বিদ্বেষপরায়ণ মনে হতো এবং কিছু মানুষের মধ্যে এই আভা সব সময় থাকত। এমনকি যখন তারা হাসতো; তখনো। হলুদ এবং নীলের আভাস দিয়ে আন্তরিকতা আর তৃপ্তি পাওয়া বোঝাতো। কালো ছিল সবকিছুর চেয়ে পবিত্র। শিশুদের দেহসৌরভ, সীমাহীন দয়া কিংবা অসীম শক্তি—এ সবকিছুর চেয়েও পবিত্র।

ফুল এবং ফলগুলো ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বিভিন্ন বর্ণ ধারণ করতো। গাছগুলোও তেমনটাই করতো। তেমনিভাবে মরিয়মের বাহুর চামড়াও গ্রীষ্মকালে বাদামি থেকে গাঢ় বাদামি হয়ে যেত। কিন্তু তার চুলগুলো সব সময় কালো ছিল এবং তার চোখগুলো সব সময় একই রকম থাকতো—একটি সবুজ আর অন্যটি হালকা বাদামি রঙের। বামপাশের সবুজ চোখটি তার প্রিয় ছিল। কারণ সবাই এটার দিকে তাকিয়ে থাকতে পছন্দ করতো। কিন্তু মানুষের এই কৌতূহল নাজমিয়াকে অস্বস্তিতে ফেলতো। কারণ সে সব সময় চিন্তিত থাকতো এই ভেবে যে, যদি তার বোনকে হাসাদের অভিশাপ আচ্ছন্ন করে ফেলে। যেটিকে কুনজরের আপদ বলা হয়। যা কাউকে শেষ করে দেয় অন্যের হিংসার কারণে।

২.
আমার দাদি নাজমিয়া বলেছিল তিনি ছিলেন বাইত দারাসের মধ্যে সবচেয়ে সুশ্রী নারী। তিনি বললেন, তিনি সবচেয়ে নিকৃষ্টতমও ছিলেন। আমি কল্পনা করতে চেষ্টা করেছিলাম, আমার দাদু যৌবনদীপ্ত মন্দের মহিমায় কেমন ছিলেন। নাজমিয়ার দায়িত্ব ছিল সকল প্রকার কুনজর থেকে মরিয়মকে রক্ষা করা।

কিছু মানুষের ঝাঁঝালো আর লাল চোখ ছিল, যা খুব সহজেই কাউকে অভিশাপে আবৃত করে ফেলত, এমনকি তাদের ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও। সুতরাং নাজমিয়া মরিয়মকে নীল রক্ষাকবচ পরতে জোর করত। যাতে তা মরিয়মের অপ্রতিম চোখের মায়ায় পরা মানুষগুলোকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে এবং নাজমিয়া আরও সতর্কতার জন্য নিয়মিত কোরআনের সুরা পড়ে ফুঁ দিত।

হঠাৎ একদিন নাজমিয়ার বান্ধবীদের কথপোকথনের মধ্যে মরিয়মের চোখের বিষয়ে কথা উঠেছিল। যখন তারা নদীর পাশে কাপড়-চোপড় পরিষ্কার করছিল। তাদের মধ্যে অধিকাংশের সম্প্রতি বিয়ে হয়েছিল। অথবা কেউ কেউ প্রথম সন্তানের জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু নাজমিয়ার মতো কেউ কেউ আবার অবিবাহিতও ছিল। একজন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কিভাবে একজন মানুষের শুধু একটি সবুজ রঙের চোখ থাকতে পারে।’

নাজমিয়া মাথার কাপড় ফেলে দিয়ে চকচক করা মেহেদিরাঙা কুণ্ডলির জেলি মাছের মতো মাথাটা বের করল এবং তার ভাইয়ের সাদা শার্টটা পানির বালতিতে রেখে সারস কণ্ঠে জবাব দিলো, ‘সম্ভবত কয়েকশ বছর আগে কিছু রোমান বীর্যবান পুরুষ তাদের লিঙ্গ আমাদের পূর্বপুরুষদের বংশে রেখেছিল। আর এখন সেটা আমার অসহায় বোনের চোখ দিয়ে বের হয়ে আসছে।’

কাপড় ধোয়ার সকালের সময়গুলোর মেয়েলি স্বাধীনতায় সবাই হেসে উঠল। তাদের হাতগুলো পানির বালতির গভীরে ডুবানো ছিল। আরেকজন যুবতি মেয়ে বলে উঠেছিল, ‘এটা দু’মাথাওয়ালা সাপ না হয়ে খুব খারাপ হলো। তাহলে তার দুটো সবুজ চোখ হতে পারত।’ অন্য একজন বলল, ‘সবচেয়ে খারাপ হয়েছে তোমার পূর্বপুরুষদের সাথে, নাজমিয়া, সে দু’মাথাওয়ালা একজনকে পছন্দ করতে পারত!’ তাদের হাসাহাসি সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। তারা সাহসিকতার সাথে চরম নির্লজ্জতার মধ্য দিয়ে নিজেদের মুক্তি দিয়েছিল। শালীনতার সীমানা অতিক্রম করে তার চারপাশের মানুষদের মনের লুকায়িত কথাগুলো প্রকাশ্যে এনে স্বীকার করানোর এমনই এক শক্তিশালী ক্ষমতা নাজমিয়ার ছিল। সে এমনভাবে সংবেদনহীন ছিল যে, তার বান্ধবীদের অবাক করে দেওয়ার পাশাপশি লজ্জায় ফেলে দিত। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাহস খুব কম মানুষেরই হতো। যদিও তার কথা কারো মন জয় করতে মন্ত্রমুগ্ধের মতো কাজ করত। এটা বিষাক্ত কামড়ও হতে পরে অথবা অতিমাত্রায় অশোভনতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। এ কারণে মানুষ তাকে ভালোবাসতো, আবার ঘৃণাও করত।

নাজমিয়া বিশ্বাস করত, তার বোনের অদেখাকে দেখার বিশেষ ক্ষমতার সাথে তার চোখের অদ্ভুত রং হওয়ার সম্পর্ক আছে। মরিয়ম আলোকদৃষ্টিসম্পন্ন ছিল না, তবুও সে মানুষের অন্তর্নিহিত দীপ্তি দেখতে পেত। নাজমিয়া একবার তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘দীপ্তি বলতে কিসের কথা বলছ?’
সে বলল, ‘দীপ্তি!’ সে তার হাতটা নাজমিয়ার মাথার ওপড় রেখে বলল, ‘এই যে এখানে’।
নাজমিয়া বুঝতে পেরেছিল যে, প্রতিটা মানুষের ভেতরের জগতটা একটা রঙিন চক্র তৈরি করত। যেটি শুধু তার ছোট বোন মরিয়ম দেখতে পেত। পুরো পরিবার দিনের পর দিন মরিয়মের ক্ষমতা পরখ করতে চাইত। প্রতিবেশীদের সাথে ঝগড়া শেষে বাড়িতে ফিরে এসে তার ভাই মামদুহ জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আচ্ছা বলো তো, আমি এখন কেমন অনুভব করছি?’ ‘তোমাকে লাল এবং সবুজ দেখাচ্ছে’। উত্তর দিয়ে মরিয়ম নিজের কাজ করতে লাগল। নাজমিয়া উপহাস করে বলল, ‘লাল আর সবুজ একসাথে মানে হলো তুমি এই মুহূর্তে ভীত এবং কামুক।’
‘মরিয়ম জানে না কামুক মানে কী; সুতরাং আমি জানি তুমি মিথ্যে বলছো, ভীষণ অভদ্র মেয়ে!’ মামদুহ নাজমিয়ার মাথার পেছনে টোকা দিয়ে লুকানোর জন্য দৌড়ে পালালো।
‘এর চেয়ে ভালো তুমি দৌড়াতে থাক, বৎস।’ দরজার পেছনে লুকিয়ে মামদুহ বলল, ‘অসহায় গাধাটার জন্য খারাপ লাগছে যে তোমাকে বিয়ে করবে’। মামদুহ আরও বিরক্ত হয়ে গেল; যখন নাজমিয়া কথাটা শুনে হেসে উঠল।

যদিও মরিয়মের বিশেষ ক্ষমতা সময়ের সাথে সাথে কমে গিয়েছিল। এটি দুটি পারিবারিক রহস্যের একটি হিসেবেই বিবেচিত হতো। নাজমিয়া নিজের সুবিধায় সেটা কাজে লাগাত। যখন কোনো পাণিপ্রার্থীর মা কিংবা বোন বাড়িতে আসত নাজমিয়াকে দেখতে। সে তাদের সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণ এবং বিদ্রুপ আচরণ করত। কারণ নাজমিয়া উপলব্ধি করতে পারত, তারা নাজমিয়াকে তাদের সন্তানের অনুপযুক্ত হিসেবে ভাবছে। সে বাজারে এমন অনেককে ফাঁকি দিয়েছিল; যারা তার সাথে ধোঁকা দিতে চেষ্টা করেছে। মরিয়মের সহজাত ক্ষমতাটি ছিল নাজমিয়ার গোপন অস্ত্র এবং সে এটা নিয়ে বাড়ির বাহিরে কথা বলতে নিষেধ করেছিল। যেমনটা সুলায়মানের ব্যাপারে কথা কলতে নিষেধ করেছিল।

৩.
আমার বড় মা আম মামদুহ আমি পৃথিবীতে আসার আগেও বেঁচেছিলেন। মানুষ তাকে পাগলি বলে ডাকতো, কিন্তু তিনি ছিলেন অনেক প্রিয় আর সম্পূর্ণ অবোধ্য রকমের মানুষ। তিনি এমন কিছু দেখতেন, যা অন্য কেউ দেখতে পেত না। যদিও মরিয়ম যেভাবে দেখত তেমনভাবে না।

বাইত দারাসে পাঁচ বৃহত্তর বংশ ছিল এবং প্রত্যেক বংশের আলাদা প্রতিবেশী ছিল। তাদের মধ্যে বারৌদ, মাকাদিমাহ এবং আবু-আল সামালিহ পরিবার ছিল সবচেয়ে সম্মানিত। অধিকাংশ খামার, বাগান, মৌমাছির চাক এবং চারণভূমি তাদের মালিকানাধীন ছিল। নাজমিয়া, মামদুহ এবং মরিয়মের পারিবারিক নাম ছিল ‘বারাকা’ কিন্তু এতে গর্ব করার মতো কিছু ছিল না। তারা মাসরিন এলাকায় বসবাস করতো। যেটি ছিল অতীত পারিবারিক ইতিহাস ছাড়া ফিলিস্তিনিদের অপরিচ্ছন্ন এলাকা। যারা বাইত দারাসের সবচেয়ে খারাপ জায়গায় বসত গড়েছিল। তারা পাঁচ শতাব্দী আগে মিশর থেকে বাইত দারাসে এসে ছদ্মবেশ ধারণ করেছিল। অথবা পারিবারিক নাম বাদ দিয়েছিল কারণ তারা পুর্বপুরুষদের বিরোধের আগুন থেকে বাঁচতে পালিয়েছিল। নতুবা তারা কোনো না কোনোভাবে তাদের পরিবারকে অপদস্থ করেছিল। সেখান থেকে চলে আসতে হয়েছিল। কেউ সঠিক ইতিহাস জানতো না।

যেহেতু তাদের অধিকাংশ বাইত দারাসে বাস করতো, নাজমিয়া, মামদুহ আর মরিয়ম গ্রামের পাগলী আম-মামদুহের ছেলেমেয়ে হিসেবেই পরিচিত ছিল। এমনকি যদিও তাদের বাবা ছিল না, তাদের সামনে মাকে নিয়ে লোকজন খারাপ কিছু বলতে সাহস করতো না। কারণ এমনটা হলে, নাজমিয়া তাদের দরজার সামনে গিয়ে নির্লজ্জতার সীমা ছাড়িয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতো। যদিও ছেলেমেয়েরা মায়ের এই অবস্থায় কষ্ট পেত এবং অন্যের ঘৃণা থেকে তাকে রক্ষা করতে ভীষণভাবে চেষ্টা করতো। তারা সব সময় তাকে রক্ষা করতে পারতো না। আম-মামদুহকে প্রায়ই দূরে তাকিয়ে থাকতে, বাতাসের মধ্যে জড়িয়ে থাকতে এবং অদৃশ্য কারো সাথে কথা বলতে দেখা যেত এবং মাঝেমাঝে অদ্ভুতভাবে হেসে উঠত।

একদিন লোকজন আম-মামদুহকে কাপড় উঠিয়ে নদীতে মলত্যাগ করতে দেখেছিল। তখন মাত্র এগারো বছর বয়সী মামদুহ তার চেয়ে আকৃতিতে বৃহদাকার একটি ছেলেকে তার মায়ের এই ঘটনার কথা অন্যদের বলাতে ঘুষি মেরেছিল। অনেক রাতে এমন হতো, তাদের তিনজনকেই চারণভূমির ছাগলের মধ্য থেকে তাদের ঘুমন্ত মাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে আসতে হতো। বলা হয়ে থাকে যে, বড় মেয়ে নাজমিয়া ছাড়া অন্য ভাই-বোনরা দেখে মনে রাখার আগেই তার বাবা চলে গিয়েছিল। নাজমিয়া তাদের বলেছিল, ‘আমাদের বাবা একবার ফিরে এসেছিল এবং আমরা সবাই একত্রে ঘাডা খেয়েছিলাম।’ মামদুহ মনে করতে পারেনি, কিন্তু সে নাজমিয়াকে বিশ্বাস করেছিল। কারণ সে কোরআনের ওপর হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করে বলেছিল। পাশাপাশি, এটা সত্যি হওয়ারই কথা। আর না হলে মরিয়ম কিভাবে গর্ভে আসে? তবু মামদুহের ইচ্ছে হতো তার বাবার স্মৃতি মনে থাকুক।

৪.
আমি আমার সময় থেকে নিজেকে সামনে এগিয়ে নিয়ে নূর সম্পর্কে কিছু বলতে চাই না। সে ছিল দুই প্রজন্ম দূরে, যখন আমার দাদা মামদুহ মৌমাছি পালকের জন্য কাজ করতে গিয়েছিল। কিন্তু তোমরা যদি আমার মতো বিশ্বাস কর যে, মানুষের মধ্যে কিছু অংশ আছে ভালোবাসা, কিছুটা রক্ত আর মাংস এবং বাকি অংশ অন্যান্য সবকিছু। তাহলে তার ভালোবাসার অংশের কথা বলতে গেলে তার নাম উল্লেখ করার যৌক্তিকতা আছে।

মামদুহের বয়স বাড়তে বাড়তে তার অঙ্গ-প্রতঙ্গ প্রসারিত হয়ে পুরুষত্বে পরিণত হয়েছিল। কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে তার কণ্ঠস্বর আরও গভীর হয়ে গিয়েছিল। সে একজন মৌমাছি চাষির সাথে কাজ করার সুযোগ ধরে রাখতে পেরেছিল। যার মধুর বয়াম সারা দেশজুড়ে এবং সুদূর মিশর, তুরস্কতে বিক্রি হতো এবং এমনকি তা মালি ও সেনেগালে পৌঁছে গিয়েছিল। এক মাসের মধ্যেই বৃদ্ধ মৌমাছি চাষি বুঝতে পারল যে, সে সেই ছেলেকেই খুঁজে পেয়েছে; যাকে পরিচর্যার মাধ্যমে একদিন পারিবারিক ব্যবসার দায়ভার তুলে দিতে প্রস্তুত করতে পারবে। যেই ব্যবসার দায়িত্ব কয়েক প্রজন্মের মধ্য দিয়ে তার ওপড় এসে পড়েছিল। তার তিন স্ত্রী ছিল, যার মধ্যে দুজন পাঁচ কন্যা এবং এক ছেলে জন্ম দিয়েছিল। যে জন্মের কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা গিয়েছিল। শুধু তার সর্বকনিষ্ঠ কন্যা ইয়াসমিনের মৌমাছি পালনের প্রতি প্রবণতা ছিল। সে জানে যে পরবর্তী তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মৌমাছি, মধুমক্ষিশালা, মোম, মধুচক্র, মৌচাক এবং মৌমাছি পালকদের সম্পর্কে তার সব জ্ঞান বিলীন হয়ে যাবে। যেন ইতিহাস সেখানে কখনোই ছিল না। যা রয়ে যাবে তা হলো মৌমাছির প্রতি তার ভালোবাসা, যা তার প্রিয় কন্যা হৃদয়ে ধারণ করে রাখবে এবং অন্য মহাদেশের মাটিতে রোপণ করবে। কিন্তু কেউই সেই ইতিহাস তখন জানতে পারত না। বাইত দারাসের মানুষের ভবিষ্যৎ তাদের ভাগ্য থেকে এতই দূরে ছিল যে, যখন কোনো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি তাদের ভাগ্যের কথা বলতো, কেউই সেটা বিশ্বাস করতো না।

এইভাবে মৌমাছি চাষি মৌচাষের শিল্প সম্পর্কে যা জানে, তার সবকিছু মামদুহকে শেখানো শুরু করল। রিকেট রোগের কারণে তার হাসি ছিল অনেকটা ফোঁকলা, এবং তিনি কখনো হাতে প্রতিরক্ষামূলক গ্লাভস পরতেন না, জোড় দিয়ে বলতেন যে, তিনি মৌমাছি থেকে আলাদা থাকা পছন্দ করেন না—যদিও তিনি সব সময় মাথায় টুপি আর মুখে কাপড়ের আবরণ দিয়ে রাখতেন। যদি মৌমাছির ঝাঁক আসে, তাই কাছাকাছি আগুনও রাখতেন। তিনি মামদুহকে গ্লাভস পরতে জোর করতেন। যতদিন না সে তার শরীরের প্রতিটি অংশে মৌমাছির সাথে অনুষঙ্গ অনুভব করে। যে অনুভূতি হৃদয় থেকে শুরু করে অন্যান্য গুরত্বপূর্ণ অঙ্গে যেতে থাকবে। এরপর তা চামড়ায় পৌঁছাবে। মামদুহের কাঁধ চাপড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘শুধু তখনই তুমি গ্লাভস পরা ছাড়তে পারবে।’

সত্যি কথা বলতে, মামদুহ কখনোই মৌমাছি পালনের সাথে এমন স্বজ্ঞাত অনুষঙ্গ তৈরি করতে পারেনি। যেমনটা তার শিক্ষক আশা করেছিলেন। এটা সত্যি যে, প্রতিদিন সে কাজে আগে চলে আসত। কাজের শেষে মৌমাছি চাষির কথা শুনতে শুনতে অনেকটা সময় কাটিয়ে দিত। কিন্তু মামদুহের আগ্রহ এবং মনযোগিতার স্বভাব তার পিতৃহারার ক্ষতের কারণে হয়েছে এবং উরুর গভীর ইচ্ছে থেকে এসেছে। সে মৌমাছি চাষির গল্পে খুব কমই মনযোগ দিত বরং সেখানে থাকার উষ্ণতা অনুভব করত এবং মৌমাছি চাষির ছোট মেয়ে ইয়াসমিনকে এক নজর দেখতে তার চারপাশ খুঁজে বেড়াত। আকাঙ্ক্ষার জেদের কাছে যখন স্মৃতিগুলো প্রায় হারিয়ে যাচ্ছিল। মামদুহ একজন পিতার একটি স্মৃতি আবিষ্কার করে ফেলল। যার বৈশিষ্ট্য তার শিক্ষক এবং চরিত্রের সাথে মিশে গিয়েছিল। খাবারের পর চা চক্রে বসে মধুর কথা বলতে বলতে মামদুহ কক্ষের মধ্যে ভালোবাসার ঘ্রাণ খুঁজছিল।

মৌমাছি চাষির শিক্ষানবিশ হওয়ার আগে, মামদুহের জিনিসপত্র ফেরি করা, ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে উপার্জন করা এবং মসজিদের দানের ওপর তার পরিবার বেঁচে থাকত। কিন্তু এতটুকু উপার্জন কখনোই যথেষ্ট ছিল না। বিশেষ করে যখন তার মায়ের অদ্ভুত ক্ষুধা বেড়ে গিয়েছিল। একবার ঈদের সময় যখন মামদুহের বয়স বারো বছর হতে বাকি এবং তার পরিবার মসজিদ থেকে একটি ভেড়ার অর্ধেক মাংস পেয়েছিল; তখন আম-মামদুহকে ভয়ংকর ক্ষুধায় পেয়ে বসেছিল যে, কোনো পরিমাণ খাবারই তাকে পরিতৃপ্ত করতে পারত না। মামদুহের তার মাকে চড় মারতে হয়েছিল সবটা মাংস শেষ হওয়ার আগেই। কোরআন বলে মায়ের পায়ের নিচেই জান্নাত এবং সবাই জানে যে, মাকে চড় দেওয়া মানেই হলো দোজখে নিজের স্থান নিশ্চিত করা। কিন্তু আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে ক্ষমা করবেন। কারণ সন্তান হিসেবে সে এমন কাজ করেনি, করেছে বাড়ির সদস্য হিসেবে যার পরিবারের সবার খাবার নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল যখন মামদুহ এবং তার বোনেরা অন্য একটা পারিবারিক রহস্য-সুলায়মানকে নিয়ে মারাত্মক রেগে ছিল। কারণ তারা জানত সুলায়মানের ভুলেই তাদের মায়ের এমন ভয়ংকর ক্ষুধা। তারা জানত, যখন সুলায়মান তাদের মায়ের কাছাকাছি থাকত, অতি ক্ষুধার্তের কারণে তাদের মায়ের দ্বীপান্তরিত চোখ শুধু শ্বেত বর্ণের দেখাত। অথবা সুলায়মান যেখানে ছিল; সেখান থেকে নিয়ে আসা ধোঁয়ার ঝলসানো গন্ধের কারণে।

৫.
যেসব লোকজন আমার বড় মাকে চিনতো, তারা সুলায়মানকেও চিনতো। অথবা সেসব লোক সুলায়মান সম্পর্কে জানার পরে তাকে চিনেছিল। সেই দিনগুলোতে তারা পবিত্র কোরআন থেকে একটি আয়াতের কথা স্মরণ করত, ‘আমি মানুষকে পচা কর্দম থেকে তৈরি শুষ্ক মৃত্তিকা থেকে সৃষ্টি করেছি। এবং এর আগে জিনকে আমি সৃষ্টি করেছি উত্তপ্ত আগুন থেকে।’ (আল-হিজর ১৫ঃ২৬-২৭)

১৯৪৫ সালে ডিসেম্বরের অন্ধকার আর মেঘাচ্ছন্ন সন্ধ্যায় আম মামদুহ চাঁদের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। যতক্ষণ না সে সেটা খুঁজে পেয়েছিল। বাইত দারাসের আকাশে তারাদের মধ্যে একটি অর্ধচন্দ্র জড়িয়ে ছিল। সুলায়মান তার সাথেই ছিল। সে সব সময় ছিল, এখনো। যখন আম মামদুহ রাতের আকাশে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, সে রোমান বাথ হাউজের ধ্বংসাবশেষের একটি দেওয়ালের পেছন থেকে বিলাপ এবং চাপা হাসি শুনতে পেয়েছিল। সে শব্দের দিকে এগিয়ে গেল এবং চারজন যুবকের ছায়া দেখতে পেল। চাঁদ এবং তারার আলোয় তাদের চামড়া ঝলমল করছিল। ঠান্ডা অন্ধকারে তারা কাঁপছিল আর ঊর্ধ্বশ্বাস ফেলছিল। ছেলেগুলোর গালাবিয়া তাদের কোমর পর্যন্ত ওঠানো ছিল। মনে হয়েছিল প্রত্যেকে প্রতিযোগিতা দিয়ে হস্তমৈথুন করছিল, আনন্দের সাথে না। সে তাদের অভিশাপ দেওয়া শুরু করল এবং এমন পাপের জন্য তাদের দোজখে নিক্ষেপের কথা বলল। তাদের মধ্যে একজন যখন তাকে চিনতে পারল, সবাই সাথে সাথে ভয়ে নরম হয়ে গেল আর তাদের গালাবিয়া নিচে নামাতে তাড়াহুড়ো করতে লাগল।

একজন চিৎকার দিয়ে বলল, ‘ইনি পাগলি আম-মামদুহ’। তারা পরিত্রাণের দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর আক্রোশের সাথে হাসতে লাগল। এক ছেলে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘মেসরিয়েন এলাকায় ফিরে যাও।’ অন্য আরেকজন বলেছিল, ‘পাগলরা এখানে থাকতে পারবে না, তুমি কি আবার কাপড় উঠিয়ে এখানে মলত্যাগ করতে এসেছ?’ আম-মামদুহ ক্ষিপ্রতার সাথে হাত নাড়াতে নাড়াতে পিছিয়ে গেল। বলল, ‘এগুলো থামাও! সুলায়মান রেগে যাচ্ছে। তার কখনো রাগ ওঠে না। তোমরা থামো! তোমাদের অবশ্যই থামতে হবে।’ তাদের হাসি আরও বেড়ে গেল। ‘সুলায়মান কে? এটা কি তোমার পৌরুষহীন সন্তানের ডাকনাম? সেও কি নদীতে মলত্যাগ করবে?’

মামদুহ সুলায়মানকে থামানোর আগেই হঠাৎ সে তার মুখমণ্ডলের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত হয়ে হাজির হলো। যতই তার উপস্থিতি দৃষ্টিগোচর হতে লাগল, আম-মামদুহের মাথার ওপরের অংশে অন্ধকার আকাশের তারার বিন্দু বিন্দু আলো ঝলমল করছিল। এটা তার প্রশস্ত কাঁধ পর্যন্ত ছড়িয়ে গেল। রক্তিম আগুনের অগ্নিশর্মা চোখে অন্ধকার বিশালতায় রূপ নিলো। কণ্ঠস্বরে এলোমেলো কথার ফুলঝুড়ি ছুটছিল। যা সব দিক থেকে বজ্রধ্বনির মতো আওয়াজ তুলেছিল এবং দূষণের মতো পোঁড়া গন্ধ বাতাসকে সিক্ত করেছিল।

শুধু যে ভয় ছেলেগুলোকে আঁকড়ে ধরেছিল। তাতেই অসাড় হয়ে পাগুলো সোজা হয়ে অসাড় হয়ে গিয়েছিল। তাদের পুরুষাঙ্গের মতো তাদের আত্মা নিস্তেজ হয়ে গেল। দুজন অনিচ্ছাকৃতভাবে মূত্রত্যাগ করে দিয়েছিল। একজন মলত্যাগ করেছিল। তাদের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে বড়, আতিয়াহ যে আম-মামদুহের প্রতি বেশি উদ্ধত আর নিষ্ঠুর ছিল, সে নীরবতার জটে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

বাকি জীবনজুড়ে ছেলেগুলো এই এক মুহূর্তের স্মৃতি লালন করবে এবং তারা সবাই একমত হবে যে, কখনোই এ ঘটনা বৈ অন্য কিছু তাদের এতটা আতঙ্কিত করেনি। এমনকি ইহুদিদের দল বা ইসরায়েলি মিলিটারি যারা বন্দুক, চাপাতি আর মেরে ফেলার ভয়ংকর অস্ত্র নিয়ে প্রথম এসেছিল। তারাও এতটা ভয় দেখাতে পারেনি। তারা সুলায়মানের অস্বাভাবিক রাগ ক্ষণিকের জন্য দেখেছিল। একজন সত্যিকারের জ্বিন।

এসইউ



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *