সার্চ ইঞ্জিনে ছড়িয়ে পড়েছে ‘বিষক্রিয়া’, ব্যাপারটা কী?
ইন্টারনেটে কোনো তথ্য খুঁজতে হলে সাধারণত আমরা সার্চ ইঞ্জিনের ওপরই ভরসা করি। প্রয়োজনীয় তথ্য, কোনো সংস্থার ফোন নম্বর, গাড়ি ভাড়া, অনলাইন পরিষেবা কিংবা নির্দিষ্ট কোনো পণ্য যা-ই দরকার হোক, কয়েকটি শব্দ লিখে সার্চ করলেই পর্দায় হাজির হয় একাধিক ওয়েবসাইট। কিন্তু সার্চের ফলাফলে সবার উপরে থাকা লিঙ্কই যে নিরাপদ, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং সাইবার প্রতারকরা এখন সার্চ ইঞ্জিনের এই জনপ্রিয়তাকেই কাজে লাগিয়ে তৈরি করছে নতুন ধরনের ফাঁদ।
সাইবার নিরাপত্তার ভাষায় এই কৌশলকে বলা হয় এসইও পয়জনিং বা সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন পয়জনিং। সহজ ভাষায়, সার্চ ইঞ্জিনের ফলাফলে এমন ভুয়া ওয়েবসাইট বা লিঙ্ককে উপরে তুলে আনা হয়, যেগুলো দেখতে আসল ওয়েবসাইটের মতো হলেও আসলে প্রতারণার ফাঁদ। অসতর্ক হয়ে সেখানে ঢুকলেই হাতছাড়া হতে পারে ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংকিংয়ের তথ্য এমনকি বিপুল পরিমাণ অর্থও।
কীভাবে কাজ করে এসইও পয়জনিং?
এসইও বা সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের মাধ্যমে কোনো ওয়েবসাইটকে সার্চ ফলাফলের উপরের দিকে নিয়ে আসা হয়। সাধারণত বৈধ ব্যবসা ও ওয়েবসাইটগুলো নিজেদের কনটেন্টকে সার্চ ইঞ্জিনে দৃশ্যমান করার জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করে।
প্রতারকরা সেই একই কৌশলকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করে ভুয়া ওয়েবসাইট। মানুষ কোন এলাকায় বসে কী ধরনের পরিষেবা বা তথ্য সবচেয়ে বেশি খুঁজছে, সেই প্রবণতা বুঝে নির্দিষ্ট কীওয়ার্ডকে টার্গেট করা হয়। তারপর সেই শব্দগুলোর জন্য ভুয়া ওয়েবসাইট, কাস্টমার কেয়ার নম্বর কিংবা ডাউনলোড লিঙ্ককে সার্চ ফলাফলের উপরের দিকে আনার চেষ্টা করা হয়। ফলে সাধারণ কোনো ব্যবহারকারী সার্চ করে প্রথম দিকের লিঙ্কে ক্লিক করলেই প্রতারকদের তৈরি ওয়েবসাইটে পৌঁছে যেতে পারেন।
গাড়ি ভাড়া করতে গিয়ে খোয়ালেন প্রায় ২ লাখ টাকা
এই ধরনের প্রতারণার একটি ঘটনা সামনে এসেছে ভারতের হায়দরাবাদে। একটি বহুজাতিক সংস্থায় উচ্চপদে কর্মরত এক নারী, যার নাম প্রেরণা বলে উল্লেখ করা হয়েছে, নিজের শহরে তুলনামূলক কম খরচে গাড়ি ভাড়া করার উপায় খুঁজছিলেন।
গাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত তথ্য জানতে তিনি সার্চ ইঞ্জিনে খোঁজ করেন। ফলাফলের প্রথম দিকের কয়েকটি লিঙ্কের মধ্যে একটি ওয়েবসাইট তার নজরে আসে। সেটি ছিল ‘গণেশ কার ট্রাভেলস’ নামে একটি সংস্থার ওয়েবসাইট। ওয়েবসাইটটি দেখে সেটিকে আসল বলেই মনে হয়েছিল তার।
লিঙ্কে ঢোকার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘রোহিত’ নামে এক ব্যক্তি তাকে ফোন করেন। নিজেকে ওই সংস্থার কাস্টমার কেয়ার কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি সহজে গাড়ি বুক করার জন্য একটি অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলেন। প্রেরণা সেই অ্যাপটি ডাউনলোড করেন। এরপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কোন ধরনের গাড়ি প্রয়োজন, কখন গাড়ি নিতে চান এবং কত দিনের জন্য ভাড়া করবেন। সব তথ্য নেওয়ার পর তাকে একটি ছোট অঙ্কের টাকা অনলাইনে লেনদেন করতে বলা হয়।
নির্দেশ মেনে টাকা পাঠানোর পরই পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। অনলাইন লেনদেনের জন্য ফোনে যে ওটিপি আসার কথা, সেটি আর আসছিল না। অথচ তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে একের পর এক টাকা কেটে যেতে থাকে। পরিস্থিতি বুঝতে বুঝতেই প্রায় ২ লাখ টাকা খোয়া যায়। পরে বোঝা যায়, সাধারণ সার্চের ফলাফলে থাকা একটি ভুয়া লিঙ্কের মাধ্যমেই তাকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হয়েছিল।
প্রতারণার কাজে এআইও হয়ে উঠছে হাতিয়ার
সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের প্রতারণাকে আরও নিখুঁত করে তুলতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিচ্ছে প্রতারকরা। নির্দিষ্ট এলাকার মানুষ কোন বিষয়গুলো নিয়ে বেশি সার্চ করছেন, কী ধরনের পরিষেবা খুঁজছেন বা কোন সমস্যার দ্রুত সমাধান চাইছেন এই প্রবণতা বিশ্লেষণ করে প্রতারণার জন্য উপযুক্ত কনটেন্ট তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
এরপর সেই বিষয়কে কেন্দ্র করে ভুয়া ওয়েবসাইট ও লিঙ্ক তৈরি করে সেগুলোকে সার্চ ইঞ্জিনে ভালো র্যাঙ্ক করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে ব্যবহারকারী বুঝতেই পারছেন না যে, তিনি যে তথ্য খুঁজছেন তার আড়ালেই তৈরি হয়েছে একটি সাইবার ফাঁদ।
শুধু টাকা হাতিয়ে নেওয়াই নয়, এই ধরনের ভুয়া ওয়েবসাইটে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য, লগইন তথ্য বা অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্যও চুরি করার চেষ্টা হতে পারে। কোনো ক্ষেত্রে ক্ষতিকর কোড বা ম্যালওয়্যার ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে এসব ওয়েবসাইট।
শুধু টাকা নয়, বিপদ হতে পারে আরও বড়
এসইও পয়জনিংয়ের ঝুঁকি শুধু অনলাইন পেমেন্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতারকরা ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে অ্যাপ ইনস্টল করাতে পারে, ব্যক্তিগত তথ্য দিতে বাধ্য করতে পারে কিংবা ফোনে ক্ষতিকর সফটওয়্যার ঢুকিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে ‘কাস্টমার কেয়ার’, ‘জরুরি পরিষেবা’, ‘ব্যাংক’, ‘টিকিট বুকিং’, ‘হোটেল বুকিং’ বা ‘সস্তায় পণ্য’ এই ধরনের সার্চের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
অস্ট্রেলিয়াতেও দেখা গিয়েছিল এমন ফাঁদ
এসইও পয়জনিংয়ের ঘটনা শুধু একটি দেশ বা নির্দিষ্ট ধরনের সার্চের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অস্ট্রেলিয়াতেও এমন একটি ঘটনায় প্রতারকরা মানুষের নির্দিষ্ট সার্চ প্রবণতাকে কাজে লাগিয়েছিল বলে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছিল। সেখানে অনেকে সার্চ করছিলেন, ‘আর বেঙ্গল ক্যাটস লিগাল ইন অস্ট্রেলিয়া?’ অর্থাৎ বাংলার বিড়াল অস্ট্রেলিয়ায় বৈধ কি না। এই নির্দিষ্ট প্রশ্নকে কেন্দ্র করেও ভুয়া লিঙ্ক তৈরি করে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
সার্চ করার সময় কী কী সতর্কতা জরুরি?
সার্চ ইঞ্জিনে কোনো তথ্য খোঁজার সময় প্রথমে পাওয়া লিঙ্কটিকেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করা উচিত নয়। বিশেষ করে টাকা লেনদেন, অ্যাপ ডাউনলোড বা ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
- ওয়েবসাইটের ঠিকানা ভালো করে দেখুন: বানান সামান্য পরিবর্তন করে আসল সংস্থার মতো দেখতে ওয়েবসাইট তৈরি করা হতে পারে।
- সরাসরি অ্যাপ ডাউনলোড করবেন না: কোনো অচেনা ব্যক্তি ফোন করে অ্যাপ ইনস্টল করতে বললে সতর্ক হন। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা অ্যাপ স্টোর থেকেই অ্যাপটি খুঁজে নিন।
- কাস্টমার কেয়ার নম্বর যাচাই করুন: সার্চ ফলাফলে পাওয়া নম্বরকে আসল ধরে নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে থাকা নম্বরের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
- ওটিপি কখনো কাউকে দেবেন না: ব্যাংক বা অনলাইন লেনদেনের ওটিপি কারো সঙ্গে শেয়ার করবেন না। অস্বাভাবিক লেনদেন দেখতে পেলে দ্রুত ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
- সেফ ব্রাউজিং চালু রাখুন: ব্রাউজারের নিরাপত্তা সেটিংসে নিরাপদ ব্রাউজিংয়ের সুবিধা সক্রিয় রাখা যেতে পারে। এতে সন্দেহজনক ওয়েবসাইট সম্পর্কে সতর্কবার্তা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- লিঙ্ক যাচাই করে নিন: সন্দেহ হলে গুগল সেফ ব্রাউজিংয়ের ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্টের মতো নির্ভরযোগ্য পরিষেবায় ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা স্ট্যাটাস পরীক্ষা করতে পারেন।
- নিরাপত্তা সফটওয়্যার ব্যবহার করুন: ডিভাইসে বিশ্বস্ত ও নিয়মিত আপডেট হওয়া অ্যান্টিভাইরাস এবং অ্যান্টিম্যালওয়্যার সফটওয়্যার রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
সার্চ ফলাফলের প্রথম লিঙ্ক মানেই নিরাপদ নয়
ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম সার্চ ইঞ্জিন। কিন্তু সার্চ ফলাফলে কোনো লিঙ্ক প্রথম দিকে দেখা যাচ্ছে বলেই সেটিকে শতভাগ নিরাপদ ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। এসইও পয়জনিংয়ের মাধ্যমে প্রতারকরা এখন সেই বিশ্বাসকেই কাজে লাগাচ্ছে।
তাই সার্চ করার সময় শুধু ‘কী পেলাম’ তা দেখলেই হবে না, ‘কোথা থেকে পেলাম’ সেটিও যাচাই করতে হবে। বিশেষ করে কোনো লিঙ্কে ঢোকার পর যদি টাকা পাঠাতে, ওটিপি দিতে, অচেনা অ্যাপ ইনস্টল করতে বা ব্যক্তিগত তথ্য জানাতে বলা হয়, সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
কেএসকে


