শেরপুরে সবজিতে নীরব বিপ্লব, ২৫০ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা
সবজি আবাদের নীরব বিপ্লব ঘটেছে সীমান্তবর্তী জেলা শেরপুরে। জেলার চাহিদা মিটিয়ে নানা ধরনের সবজি সরবরাহ হচ্ছে রাজধানীসহ সারাদেশে। চলতি খরিপ-২ মৌসুমে জেলায় উৎপাদিত সবজির বাজারমূল্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। কৃষকরা বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে।
শেরপুর সদরের লছমনপুর ইউনিয়নের কুসুমহাটির বাসিন্দা সিঙ্গাপুর ফেরত হাশেম আলী। প্রবাস জীবন কাটিয়ে দেশে এসেই শুরু করেন কৃষিকাজ। ২৫ শতাংশ জমিতে পেঁপে আবাদ করে লাভবান হওয়ায় এখন বেগুন, টমেটো, বরবটি, মরিচসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করছেন।
হাশেম আলী বলেন, ইয়োলো লেডি জাতের পেঁপে আবাদ করেছি ২৫ শতাংশ জমিতে। বাজার ও ফলন ভালো পাওয়ায় লাভ হয়েছে। তাই একইসঙ্গে করলা, ঝিঙা ও লাউয়ের আবাদ করেছি। ৭০ টাকা কেজি পাইকারি বিক্রি করেছি করলা। আর এখন এক বিঘা জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে ডিজি ১৭১৭ জাতের মরিচ চাষ করেছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও খুব ভালো হয়েছে।

একই গ্রামের কৃষক আব্দুস সাত্তার মিয়া করলা, লাউ, কদু, বেগুনসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করেছেন।
তিনি বলেন, ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে করলা বিক্রি করছি। আকার ভেদে দেশি জাতের লাউ ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেগুন বিক্রি করছি ৫০ টাকা কেজিতে। এবার অন্যান্য বারের লোকসান কাটিয়ে লাভের মুখ দেখা যাচ্ছে।
চরপক্ষীমারী ইউনিয়নের সাতপাকিয়া গ্রামের কৃষক ছামিদুল হক বলেন, আমি এক বিঘা জমিতে ঢ্যাঁড়স চাষ করেছিলাম। দাম ও ফলন দুটোই ভালো হয়েছে।
শ্রীবরদী উপজেলার কাকিলাকুড়া গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, এবার করলা আবাদ করেছিলাম। পাশাপাশি বরবরটি। করলা ৮০ টাকা কেজিও বিক্রি করেছি।
নালিতাবাড়ী উপজেলার কলসপাড় ইউনিয়নের বড়ডুবি গ্রামের সালাম মিয়া বলেন, নিচু জমিতে কচুর আবাদ করেছিলাম। দেড় বিঘা জমিতে কচুর লতি ও কচু বিক্রি করেছি বেশ চড়া দামেই। ৫০ টাকার নিচে কোনো কচু বিক্রি হয়নি।

ঝিনাইগাতী উপজেলার সবজি গ্রাম খ্যাত গোমড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদির মিয়া বলেন, আমাদের এখানে প্রায় শতাধিক কৃষক সবজি আবাদ করে। পাহাড়ি ঢলে কিছুটা ক্ষতি হলেও এবার সবজির বাম্পার ফলন হয়েছে। আর বাজারদর ভালো থাকায় কৃষকরাও লাভবান হয়েছে।
তবে প্রান্তিক কৃষকদের দাবি, যদি রাজধানী বা অন্যান্য জায়গার মোকামের লোকজন সরাসরি আমাদের হাত থেকে সবজি কিনে নিতেন তাহলে ফড়িয়া কোনো পয়সা নিতে পারত না। তাই স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও প্রশাসনের কাছে দাবি, সরাসরি কৃষকের খেত থেকে সবজি নিয়ে যাবে মোকামের লোকজন।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুসলিমা খানম নীলু বলেন, এখানে উৎপাদিত সবজি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে। এতে কৃষকদের উৎপাদিত সবজির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আর কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত পরামর্শ সেবা।
ঝিনাইগাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন বলেন, ঝিনাইগাতীর মাটি কৃষির জন্য বেশ উপযুক্ত। তাই এখানে একটা গ্রাম রয়েছে, যার নাম সবজি গ্রাম। এ গ্রামে প্রচুর সবজি উৎপাদিত হয়। এ উপজেলায় একেক মৌসুমে ন্যূনতম ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার সবজি আবাদ হয়।
জেলা কৃষি বিভাগের উপপরিচালক সাখওয়াত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, চলতি খরিপ-২ মৌসুমে জেলার পাঁচ উপজেলায় ৩ হাজার ৬৯৪ হেক্টর জমিতে সবজির আবাদ হয়েছে। আর এসব জমিতে প্রায় ৬২ হাজার ৭৯৮ মেট্রিকটন সবজি উৎপাদিত হয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ২৫১ কোটি টাকা। এরসঙ্গে প্রায় লক্ষাধিক পরিবার জড়িত।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় কৃষকদের দাবির প্রেক্ষিতে দেশের বড় বড় মোকামের মালিকদের সঙ্গে সরাসরি মাঠের কৃষকদের যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করে দিব। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দ্রুত পরামর্শ করে সেবার ব্যবস্থা করবো।
শেরপুর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আলহাজ্ব আরিফ হাসান বলেন, কৃষি স্বনির্ভর জেলা শেরপুর। মধ্যস্বত্বভোগী নয়, সুষ্ঠু বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করতে পারলে আরও লাভবান হবেন এ জেলার কৃষকরা। এবার চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৬২ হাজার ৭৯৮ মেট্রিকটন সবজি উৎপাদিত হয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ২৫১ কোটি টাকা। এই সেক্টরে আমাদের সবারই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন জাগো নিউজকে বলেন, সুষ্ঠু বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করতে দেশের বড় বড় সবজির আড়তদারদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করব। যেন তারা কৃষকের খেত থেকে সরাসরি সবজি কিনতে পারে। আর ২৫০ কোটি টাকা এক মৌসুমেই বিক্রি করাটা দারুণ একটা ব্যাপার। যা স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে ভালো প্রভাব ফেলবে। প্রান্তিক কৃষকদের জেলা কৃষি বিভাগের মাধ্যমে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।
এফএ
