September 11, 2026

যে কারণে শয়তান বসে থাকে দ্বীনের পথে

0
zakir-naik-mtu5am5mj3trfni-20260909195411.jpg


যারা অলরেডি ভুল বা খারাপ কাজ করছে, শয়তান তাদের পেছনে লেগে থাকে না। সে ওত পেতে বসে থাকে সীরাতে মুস্তাকিম তথা সঠিক বা সিধা রাস্তায়। কোনো মানুষ যখন সঠিক রাস্তায় পা বাড়ায়, তখন শয়তান তাকে ওই পথ থেকে সরাতে তৎপর হয়ে ওঠে। সে আক্রমণ চালায় চারদিক থেকে; সামনে থেকে, পেছন থেকে, ডান দিক থেকে এবং বাম দিক থেকে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, সে (শয়তান) বলল, ‘আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, সে কারণে আমি তাদের জন্য আপনার সোজা পথে বসে থাকব। তারপর তাদের নিকট উপস্থিত হব, তাদের সামনে থেকে ও তাদের পেছন থেকে এবং তাদের ডান দিক থেকে ও তাদের বাম দিক থেকে। আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না’। (সুরা আ’রাফ: ১৬, ১৭)

সামনে থেকে আক্রমণ করার অর্থ নানা রকম হতে পারে। একটি অর্থ হলো, মানুষ যখনই কোনো ভালো কাজ করতে যাবে, অমনি তার সামনে তাৎক্ষণিক নানা সংকট ও বাধা উপস্থিত হবে। তখন মনের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্বে তৈরি হবে, কাজটি কি আমি করব, নাকি করব না? যেমন কেউ যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে, সে আর ঘুষ খাবে না, সঙ্গে সঙ্গেই হয়তো তার চাকরি যাওয়ার উপক্রম হবে, বা তাকে মিটিংয়ে তলব করা হবে, অথবা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে দেওয়া হবে। শয়তান অন্যান্য সৃষ্টি ও মানুষকে ব্যবহার করে এমন পরিস্থিতি তৈরি করে যেন ওই ব্যক্তি মনে করে, এই ভালো পদক্ষেপটি নেওয়ার কারণেই হয়তো তার জীবনে এত সমস্যা আসছে। ফলে ভয়ে সে আবার পিছিয়ে যায়।

যেমন একজন খ্রিস্টান নারী যখন ইসলামের প্রতি অনুরাগী হতে শুরু করলেন, তখন তিনি ভীতিকর সব স্বপ্ন দেখতে লাগলেন। কিন্তু যখন তিনি ইসলাম আঁকড়ে ধরলেন, তখনই তার সব ভয় কেটে গিয়ে মনে প্রশান্তি নেমে এলো। অর্থাৎ ভালো বা সঠিক রাস্তায় আসতে গেলে শয়তান উত্ত্যক্ত করবেই। শুরুতেই সহজে স্বস্তি মেলে না, কঠিন পরীক্ষা ও কষ্ট পার করার পরেই কেবল আসানি বা স্বস্তি আসে। সহজ পথের জন্য মূল্য দিতে হয়।

পেছন থেকে আক্রমণ করার মানে হলো, শয়তান অতীতের পাপ ও আনন্দময় মুহূর্তগুলোর কথা মনে করিয়ে দেবে। সে বলবে, ‘আগে তোমার জীবন কত উপভোগ্য ছিল, কেন নিজেকে এমন কষ্টের মধ্যে ফেলছ? পুরোনো বন্ধুদের কাছে ফিরে যাও, তাদের সঙ্গে সময় কাটাও।’ মানুষ খুব ভালো করেই জানে যে ওই আড্ডায় গেলে আবারও সেই পরচর্চা, গিবত বা অপকর্মই হবে। অথচ সে তো এগুলো ছেড়ে এসেছিল। শয়তান কেবল ভালোবাসার টানে বন্ধুদের কাছে ফেরায় না, তার মূল উদ্দেশ্য থাকে মানুষকে আবারও সেই পুরোনো পাপে ডুবিয়ে দেওয়া।

পেছন থেকে আক্রমণের আরেকটি রূপ হলো, শয়তান মানুষের অতীত ভুলের কথা বারবার মনে করিয়ে দিয়ে তাকে গভীর হতাশায় ফেলে দেয় যে, ‘তুমি এত বড় ভুল করেছ, তোমার দ্বারা আর কিচ্ছু হবে না, তোমার ভালো হওয়ার কোনো আশা নেই।’ অতীত পাপের কথা মনে করিয়ে দিয়ে শয়তান মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করে তোলে। মানুষ তখন ভাবতে শুরু করে, ‘আমার আর নামাজ পড়ে, দোয়া করে বা রোজা রেখে কী লাভ? আমি তো বহু গুনাহ করেছি, আমার আর ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ নেই।’

আমাদের সমাজে অনেকেই এই ধোঁকার মধ্যে পড়ে আছেন। বহু মানুষকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা তো পাপী মানুষ, আমাদের আর কী আশা আছে! আল্লাহ আপনাদের মতো ভালো মানুষের দোয়া শুনবেন, আমাদের কথা শুনবেন না।’ এটি পুরোপুরি শয়তানের ফাঁদ। সে নিজে ক্ষমা চায়নি এবং নিরাশ হয়ে পড়েছে, এখন সে চায় মানুষও যেন একইভাবে নিরাশ হয়ে পড়ে।

ডান দিক থেকে আক্রমণের বিষয়টি আরও সূক্ষ্ম। সাধারণ ব্যবহারে ডান হাত ভালো কাজের প্রতীক। শয়তান মানুষের ভালো কাজ ও দ্বীনি দায়িত্বগুলোকেও তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। কোনো মানুষ ভালো কাজ শুরু করলে তার মনে অহংকার ও আত্মতুষ্টি এনে দেয়। যেমন, কোনো নারী যদি আগে পর্দা না করতেন কিন্তু এখন পর্দা করা শুরু করেছেন, শয়তান তখন তার মনে এই কুচিন্তা ঢুকিয়ে দেয় যে, যারা পর্দা করে না তারা কত নিকৃষ্ট ও দায়িত্বহীন! এভাবে তার মনে শ্রেষ্ঠত্বের ভাব তৈরি হয়।

অথচ আল্লাহর দাসত্বের মূল কথাই ছিল বিনয় ও অহংকার ত্যাগ করা। অথচ মানুষ কেবল নিজের নামাজ, দাড়ি, পর্দা কিংবা দ্বীনি ইলমের অহংকারে নিজেকে অন্যের চেয়ে উত্তম ভাবতে শুরু করে। এমন কি যদি কেউ মুখে বলে যে, সে নিজেকে বড় মনে করে না, তাহলেও দেখা যায় সে অপরাধীকে ঘৃণা করার পাশাপাশি অপরাধী মানুষটিকেই মনে-প্রাণে খাটো করে দেখছে। মানুষের পাপকে ঘৃণা করা উচিত, কিন্তু মানুষ হিসেবে তাকে একেবারে মূল্যহীন মনে করা উচিত নয়; কারণ ভুল তো যেকোনো মানুষের দ্বারাই হতে পারে।

ডান দিকের আক্রমণের আরেকটি দিক হলো, ভালো কাজ করার পর মানুষের মনে এই ভুল ধারণা তৈরি হয় যে, সে তো সঠিক পথে চলে এসেছে এবং সে এখন পুরোপুরি নিরাপদ। সে মনে করে, ‘আমি তো হেদায়েত পেয়ে গেছি, বাকি সবাই তো পিছিয়ে আছে।’ মানুষ ভুলে যায় যে কেবল বাহ্যিক ভালো আমলের কারণে কেউ চিরতরে নিখুঁত বা ভালো হয়ে যায় না। ভালো ও মন্দের মিশ্রণেই মানুষ। আল্লাহর দরবারে কার কতটা মূল্য, তা নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব।

হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং হজরত ইসমাইল (আ.) যখন কাবাঘর নির্মাণ করছিলেন, যে কাবাঘরে আজ পর্যন্ত এবং কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ নামাজ পড়বে, হজ ও ওমরাহ করবে, তার অশেষ সওয়াব তারা পাবেন, তখনও তারা আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলেন যে, ‘হে রব, আমাদের এই কাজটুকু কবুল করো।’ তারা কখনো ভাবেননি যে তারা নিশ্চিতভাবে সফল হয়ে গেছেন। কিন্তু ডান দিক থেকে আক্রমণ হলে মানুষ মনে করে, সে নিজে সব ঠিকঠাক বুঝে গেছে, এখন কেবল অন্যদের বোঝার বাকি। যারা নিজেদের দ্বীনদার ও সচেতন মনে করেন, তাদের ওপরেই এই আক্রমণটি সবচেয়ে বেশি হয়।

আর বাম দিক থেকে আক্রমণ করার অর্থ হলো, মন্দ ও ভুল কাজগুলোকে চমৎকার ও আকর্ষণীয়ভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা। শয়তান খারাপ জিনিস বা আল্লাহর নাফরমানিকে রূপক শব্দ ও বাহারি অজুহাতে সুন্দর বানিয়ে উপস্থাপন করে।

তখন মানুষ পাপ কাজকে নিজের ‘স্বাধীনতা’, ‘মনের আনন্দ’ কিংবা ‘খুশি উদযাপন’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। মানুষ প্রশ্ন তুলতে শুরু করে, ‘আমি কি একটু আনন্দও করতে পারি না?’ শয়তান মানুষের চিন্তা ও মনস্তত্ত্বের ওপর এমনভাবে প্রভাব ফেলে যে, মন্দ জিনিসগুলোই মানুষের কাছে ভালো ও আকর্ষণীয় মনে হতে থাকে। অথচ খারাপ কাজকে যে সুন্দর নামই দেওয়া হোক না কেন, তা খারাপই থেকে যায়।

শয়তানের এই চতুর্মুখী আক্রমণের একমাত্র মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞ করে তোলা। আল্লাহ মানুষকে যে পরিস্থিতি ও সুযোগ দিয়েছেন, মানুষ যেন তা ব্যবহার করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে না পারে, সেটাই তার প্রধান লক্ষ্য। মানুষের নজর যেন কেবল তার যা নেই বা যে ঘাটতি আছে সেদিকেই পড়ে থাকে, আর যা সে পেয়েছে তার প্রতি যেন কখনোই কৃতজ্ঞ হতে না পারে।

সূত্র: ইউটিউব চ্যানেল: রেডিও আজাদ

ওএফএফ



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *