September 8, 2026

ভূপেন হাজারিকার গান কেন আজও মানুষের হৃদয়ে

0
bhupen-hazarika-20260908213812.jpg


‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’-এই গানটি যেন শুধু একটি গান নয়, মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতার এক চিরন্তন বার্তা। আর এ বার্তাকে কণ্ঠে ধারণ করে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন কিংবদন্তিতুল্য সংগীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকা।

১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ভারতের আসামের সদিয়ায় জন্ম ভূপেন হাজারিকার। শিল্পী, কবি, সুরকার, সংগীত পরিচালক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক কর্মী-বহুমাত্রিক পরিচয়ে সমৃদ্ধ ছিল তার জীবন। তবে সব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মানবতার কণ্ঠস্বর। তার গান কখনো মানুষের ভালোবাসার কথা বলেছে, কখনো শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে, আবার কখনো শুনিয়েছে সাম্য ও সম্প্রীতির বার্তা।

ভূপেন হাজারিকার গান কেন আজও মানুষের হৃদয়েভূপেন হাজারিকা

ভূপেন হাজারিকার গানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর মানবিক আবেদন। তার গানে ছিল না কেবল প্রেম কিংবা বিনোদন, ছিল সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, দুঃখ, স্বপ্ন ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।

‘মানুষ মানুষের জন্য’, ‘বিস্তীর্ণ দুপারের অসংখ্য মানুষের’, ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’, ‘সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনাতে নজরুল’-এমন অসংখ্য গানে তিনি জাতপাত, বর্ণবৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।

এ কারণেই তার গান কোনো নির্দিষ্ট সময় বা প্রজন্মের মধ্যে আটকে থাকেনি। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, সাম্য ও অধিকারের প্রশ্নগুলো আজও একইভাবে প্রাসঙ্গিক। আর সেখানেই ভূপেন হাজারিকার গানের শক্তি।

পঞ্চাশের দশকে দাঙ্গাবিধ্বস্ত আসামে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন ভূপেন হাজারিকা। বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা, হেমাঙ্গ বিশ্বাসসহ প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে আসামের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে গান গেয়েছেন তিনি।

দাঙ্গা ও বিভেদের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে গানকে ব্যবহার করেছিলেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা। ভূপেনের কণ্ঠ তখন হয়ে উঠেছিল সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম।

ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। ফলে সংগীত তার কাছে শুধু শিল্পচর্চা ছিল না, মানুষের কাছে পৌঁছানোর এবং সমাজের কথা বলার একটি শক্তিশালী মাধ্যমও ছিল।

ভূপেন হাজারিকার সংগীতভাবনায় মার্কিন শিল্পী ও মানবাধিকারকর্মী পল রোবসনের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। রোবসনের গান ও মানবতাবাদী অবস্থান তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

রোবসনের বিখ্যাত ‘ওল্ড ম্যান রিভার’ গান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই ভূপেন হাজারিকা সৃষ্টি করেন ‘বিস্তীর্ণ দুপারের অসংখ্য মানুষের হাহাকার’ গানটি। নদীর দুই তীরে বসবাসকারী মানুষের জীবন, বঞ্চনা ও হাহাকারকে কেন্দ্র করে তৈরি গানটি পরে হয়ে ওঠে তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।

এই গান শুধু আসামের মানুষের কথা বলেনি, এর মধ্যে তিনি তুলে ধরেছিলেন বিশ্বের নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের কষ্টের প্রতিচ্ছবি।

বাংলা, অসমিয়া, হিন্দি, নেপালিসহ বিভিন্ন ভাষায় গান গেয়েছেন ভূপেন হাজারিকা। ভাষা বদলালেও তার গানের মূল সুর ছিল একই-মানুষের কথা।

আসামের লোকজ সংগীত থেকে শুরু করে শাস্ত্রীয় সংগীত, গণসংগীত ও চলচ্চিত্রের গান-বিভিন্ন ধারাকে নিজের সংগীতভাবনায় মিশিয়েছেন তিনি। ফলে তার গান যেমন আসামের মানুষের কাছে আপন হয়ে উঠেছে, তেমনি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের শ্রোতারাও তাকে নিজেদের শিল্পী হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

বাংলাভাষী মানুষের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে তার গণসংগীত। ‘আমি এক যাযাবর’, ‘আজ জীবন খুঁজে পাবি’, ‘সহস্রজনে মোর প্রশ্ন করে’, ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’সহ অসংখ্য গান আজও শ্রোতাদের কাছে সমান আবেদন তৈরি করে।

শুধু প্রতিবাদ কিংবা মানবতার গান নয়, প্রেমের গানেও ভূপেন হাজারিকা ছিলেন অনন্য। তার কণ্ঠে প্রেম কখনো ছিল আকুলতা, কখনো অপেক্ষা, আবার কখনো ছিল নিঃসঙ্গতার অনুভূতি।

‘সহস্রজনে মোর প্রশ্ন করে’, ‘মাইয়া ভুল বুঝিস না’, ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’-এমন গানগুলোতে ফুটে উঠেছে মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ ও ভালোবাসার নানা রূপ।

ফলে ভূপেন হাজারিকার গান একদিকে যেমন মিছিলের মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি নিঃসঙ্গ মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতিরও সঙ্গী হয়েছে।

ভূপেন হাজারিকার ব্যক্তিজীবনও ছিল নানা ঘটনা ও আলোচনায় পরিপূর্ণ। প্রিয়ংবদা প্যাটেলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। পরে তারা আলাদা হয়ে গেলেও আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ হয়নি বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

পরবর্তী জীবনে চলচ্চিত্র নির্মাতা কল্পনা লাজমির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল ভূপেন হাজারিকার। কল্পনা তার ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ও ম্যানেজার হিসেবেও কাজ করেছেন। তাদের সম্পর্ক ঘিরে বিভিন্ন সময় নানা আলোচনা থাকলেও ভূপেনের সৃষ্টিশীল জীবনে কল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন ভূপেন হাজারিকা। দীর্ঘদিন প্রগতিশীল ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তার সঙ্গে যুক্ত থাকার পর জীবনের শেষদিকে ভারতীয় জনতা পার্টির হয়ে ২০০৪ সালে গুয়াহাটি থেকে লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে ছিল তার শিল্পী ও মানবতাবাদী পরিচয়।

২০১১ সালের ৫ নভেম্বর ৮৫ বছর বয়সে মারা যান ভূপেন হাজারিকা। তবে তার মৃত্যুর সঙ্গে থেমে যায়নি তার গান। বরং সময়ের সঙ্গে তার সৃষ্টিগুলো নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে গেছে।

সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণসহ একাধিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ২০১৯ সালে মরণোত্তর ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ দেওয়া হয় তাকে।

তবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বাইরেও মানুষের ভালোবাসাই ছিল ভূপেন হাজারিকার সবচেয়ে বড় অর্জন। কারণ তার গান কোনো নির্দিষ্ট সময়ের নয়, কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডেরও নয়। যেখানে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, যেখানে ভালোবাসা বিভাজনের দেয়াল ভাঙে, যেখানে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা ভাবে-সেখানেই যেন নতুন করে বেজে ওঠে ভূপেন হাজারিকার গান।

এই কারণেই মৃত্যুর এক দশকেরও বেশি সময় পর আজও তার কণ্ঠ শ্রোতার হৃদয়ে একইভাবে অনুরণিত হয়। তার গান মনে করিয়ে দেয়-মানুষের জন্য গাওয়া গান কখনো পুরোনো হয় না।

এমএমএফ



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *