৯০০ টাকা দিলেই পেশিবহুল সুদর্শন পুরুষকে জড়িয়ে ধরা যাবে
মানসিক চাপ, একাকিত্ব কিংবা সারাদিনের ক্লান্তি এসব থেকে কয়েক মিনিটের জন্য মুক্তি পেতে কেউ গান শোনেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান। অনেকে সঙ্গীকে জড়িয়ে ধরে শান্তি পান। যেন এক মুহূর্তেই সারাদিনের সব মানসিক চাপ, স্ট্রেস দূর হয়ে যায়।
কিন্তু চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন দেখা যাচ্ছে একটু অন্যরকম প্রবণতা। সেখানে কিছু তরুণী অর্থের বিনিময়ে পেশিবহুল, শান্ত ও যত্নশীল পুরুষের কাছ থেকে কয়েক মিনিটের আলিঙ্গন নিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন পুরুষদেরই বলা হচ্ছে ‘ম্যান মাম’। বিষয়টি ২০২৫ সালে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসে।
‘ম্যান মাম’ শব্দটির ব্যবহার অবশ্য একেবারে নতুন নয়। আগে এটি মূলত জিমে যাওয়া বা পেশিবহুল পুরুষদের বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। পরে শব্দটির অর্থ বদলে যায়। এখন ‘ম্যান মাম’ বলতে এমন পুরুষদের বোঝানো হচ্ছে, যাদের শরীর শক্তপোক্ত হলেও আচরণে রয়েছে কোমলতা, ধৈর্য ও যত্নশীলতার মতো বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ শক্ত চেহারার আড়ালে একজন শান্ত ও সান্ত্বনা দিতে সক্ষম পুরুষ এই ধারণাটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রবণতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এক তরুণীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে ঘিরে। থিসিসের চাপ সামলাতে গিয়ে তিনি এমন একজন ভদ্র ও পেশিবহুল পুরুষের কাছ থেকে পাঁচ মিনিটের আলিঙ্গন নিতে চান বলে জানান। তিনি উল্লেখ করেন, জীবনের একটি সময়ে আলিঙ্গন তাকে নিরাপদ অনুভূতি দিয়েছিল। পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এক লাখেরও বেশি মন্তব্য জমা পড়ে বলে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানিয়েছে। এরপর চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ধরনের সঙ্গী খোঁজার আরও পোস্ট দেখা যেতে থাকে।
তবে বিষয়টি কোনো আনুষ্ঠানিক বা নিয়ন্ত্রিত পেশা নয়। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাঁচ মিনিটের আলিঙ্গনের জন্য প্রায় ২০ থেকে ৫০ ইউয়ান নেওয়া হচ্ছিল। ৫০ ইউয়ান প্রায় ৭ মার্কিন ডলারের সমান। বাংলাদেশি টাকায় এর পরিমাণ বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৯০০ টাকার কাছাকাছি।
কীভাবে ঠিক হয় এই সাক্ষাৎ? সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার পর আগ্রহী পুরুষদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলা হয়। ভদ্রতা, ধৈর্য, শারীরিক গঠন, চেহারা ও স্বভাবের মতো বিষয় বিবেচনা করে কাউকে বেছে নেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দেখা করার ক্ষেত্রেও অনেক সময় মেট্রো স্টেশন বা শপিং সেন্টারের মতো প্রকাশ্য জায়গা বেছে নেওয়া হয়। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল আলিঙ্গনেই সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হয়।
এই সেবার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন পুরুষও নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। একজন ‘ম্যান মাম’ বলেছেন, অন্যকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারার মধ্যে তিনি নিজের জন্যও আত্মমূল্য খুঁজে পান। আরেকজনের দাবি, অনেক নারী চেহারা নিয়ে উদ্বেগ কিংবা কাজের চাপের মতো বিষয় নিয়ে কথা বলতে চান। এমনকি একজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, তিনবার আলিঙ্গনের মাধ্যমে সেবা দিয়ে তিনি ৩৪টি আলিঙ্গন থেকে ১,৭৫৮ ইউয়ান আয় করেছিলেন।
তবে প্রশ্ন উঠছে, মানুষ আলিঙ্গনের জন্য টাকা দিচ্ছেন কেন? এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা শহুরে জীবনের একাকিত্ব। ব্যস্ত কর্মজীবন, পড়াশোনার চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকার কারণে অনেক মানুষ নিয়মিত আবেগগত সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। সেক্ষেত্রে পরিচিত সম্পর্কের বাইরে, অল্প সময়ের জন্য একজন অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে পাওয়া সান্ত্বনাও কারও কাছে মূল্যবান মনে হতে পারে।
তবে এটিকে মানসিক চিকিৎসা বা ‘থেরাপি’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি মূলত অর্থের বিনিময়ে সাময়িক শারীরিক সান্নিধ্য ও কথোপকথনের একটি সামাজিকমাধ্যম-নির্ভর প্রবণতা। একই সঙ্গে এর নিরাপত্তা ও সম্মতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ শারীরিক সংস্পর্শে ব্যক্তিগত সীমারেখা লঙ্ঘনের ঝুঁকি থাকতে পারে। চীনের একজন আইনজীবীও সতর্ক করেছেন, কেউ কেউ যৌন হয়রানির আড়াল হিসেবেও এমন ব্যবস্থাকে ব্যবহার করতে পারে।
আবার কেউ কেউ মনে করছেন, টাকা দিয়ে আলিঙ্গন নেওয়ার প্রবণতা সমাজে মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্বের একটি লক্ষণ। যেখানে বন্ধু, পরিবার বা সঙ্গীর সঙ্গে সহজে নিজের অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে কয়েক মিনিটের জন্য হলেও একজন অপরিচিত মানুষের উষ্ণ উপস্থিতি নতুন ধরনের ‘সামাজিক সেবা’ হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে।
চীনের ‘ম্যান মাম’ প্রবণতা তাই শুধু অদ্ভুত কোনো সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড নয়। এর ভেতরে রয়েছে একাকিত্ব, মানসিক চাপ, ব্যক্তিগত সীমারেখা এবং মানুষের আবেগগত সংযোগের প্রয়োজনীয়তা সবকিছুরই ছাপ। ভবিষ্যতে এমন প্রবণতা অন্য দেশেও দেখা দিলে সেটি শুধু মজার কনটেন্ট হিসেবে দেখার বদলে নিরাপত্তা, সম্মতি ও সামাজিক বাস্তবতার দিক থেকেও ভাবতে হবে।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
কেএসকে



