দেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের ‘শোকেস’ বাপা ফুডপ্রো
দেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সম্ভাবনা, সক্ষমতা ও বিকাশের চিত্র এক জায়গায় তুলে ধরার অন্যতম বড় আয়োজন বাপা ফুডপ্রো ইন্টারন্যাশনাল এক্সপো। বাংলাদেশ এগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) উদ্যোগে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী। এবারের আয়োজনটি ফুডপ্রোর ১১তম আসর।
প্রায় প্রতিবছরই এতে দেশ-বিদেশের শীর্ষস্থানীয় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী শিল্পগোষ্ঠীর পাশাপাশি অংশ নেয় ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও। ফলে ফুডপ্রো এখন শুধু একটি প্রদর্শনী নয়, বরং দেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সামগ্রিক সক্ষমতা ও সম্ভাবনার একটি ‘শোকেস’ হয়ে উঠেছে।
কেন এই আয়োজন, এর লক্ষ্য কী, এত বছরের এই আয়োজনে ফুডপ্রোর সাফল্য কতটা এবং দেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সামনে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে বাংলাদেশ এগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছানের সঙ্গে কথা বলেছে জাগো নিউজ। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক নাজমুল হুসাইন।
জাগো নিউজ: এবারের বাপা ফুডপ্রোর আয়োজন কেমন?
ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব: রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) এ প্রদর্শনী বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে। চলবে ১২ সেপ্টেম্বর শনিবার পর্যন্ত। এবারের আসরে আমরা ২৭ দেশের দুই শতাধিক ব্র্যান্ডের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছি। আসছেন দেড় শতাধিক বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা।
জাগো নিউজ: অন্যান্য বছরের চেয়ে এবারের প্রদর্শনীর ভিন্নতা কী?
ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব: প্রদর্শনীর মূল কাঠামো একই। কিন্তু এবার মেলায় বিভিন্ন খাদ্যপণ্য প্রদর্শনের পাশাপাশি কারিগরি অধিবেশন, সেমিনার ও ব্যবহারিক কার্যক্রমে ভিন্নতা আনা হয়েছে। এবার অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রক্রিয়াজাতকরণ, ফিলিং, প্যাকেজিং, কোডিং ও মার্কিং, লেবেলিং, মান পরিদর্শন, গুদামজাতকরণ, কোল্ড চেইন এবং লজিস্টিকসের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি প্রদর্শন করবে।
এছাড়া এবার প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অটোমেশনসহ মেশিন ভিশন, রোবোটিকস, স্মার্ট ফ্যাক্টরি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল আইওটি প্রদর্শনীতে বিশেষ গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি চার হাজারের বেশি প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতিভিত্তিক সমাধান উপস্থাপন করা হবে।
জাগো নিউজ: এমন আয়োজন থেকে উদ্যোক্তারা কেমন সুবিধা পান?
ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব: প্রথম কথা এ মেলায় আপনি এমন সব প্রযুক্তি দেখতে পাবেন, যা বিদেশ না গিয়ে কোনোভাবে সম্ভব নয়। এক ছাদের নিচে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের সব সমাধান পাবেন। কীভাবে ব্যবসা শুরু করবেন, কীভাবে টিকে থাকবেন, যা প্রতিটি উদ্যোক্তার জানা প্রয়োজন।
এবার মেলায় আমরা প্রথম দিন উদ্যোক্তাদের জন্য ফুড সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নিয়ে সেমিনার করবো। দ্বিতীয় সেমিনারটা হচ্ছে এক্সেস টু ফাইন্যান্স নিয়ে, তারা সহজে কীভাবে অর্থায়ন পেতে পারে। দ্বিতীয় দিনের প্রথম অধিবেশন হবে রিনিউয়েবল এনার্জি নিয়ে। এরপর সেশন হচ্ছে ট্রেডমার্ক এবং পেটেন্ট নিয়ে। সেদিন সিইও কনক্লেভ হবে। যেখানে আমরা শীর্ষস্থানীয় ২০ জন সিইওকে নিয়ে দেশের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান হবে- এসব আলোচনা করবো।
শেষ দিনে এক্সপোর্ট ব্যারিয়ার কী কী? কেন এক্সপোর্ট ডিক্লাইন হচ্ছে, এটার ওপরে পয়েন্টগুলো বের করবো। সব ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নীতি-নির্ধারকরা থাকবেন। অর্থাৎ বুঝতে পারছেন, একজন উদ্যোক্তার এ-টু-জেড ফুডপ্রো তুলে ধরতে চাই।
জাগো নিউজ: এর আগেও ফুডপ্রো হয়েছে, সেগুলো থেকে কেমন সাড়া পাওয়া গেছে?
ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব: বাপা ফুডপ্রো বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করে। এবারও এ মেলায় ২৭ দেশের দুই শতাধিক ব্র্যান্ড অংশ নেবে। এ ধরনের মেলায় কিন্তু কোনো সেল থাকে না। কিন্তু দেশ-বিদেশের যে লিংক হয় সেটা অনেক বড়। বিদেশে যেমন আমরা যাচ্ছি, আর বিদেশিরাও বাংলাদেশে আসছে। বিদেশিরা বাংলাদেশের উপযুক্ত প্রযুক্তি প্রদর্শন করবে। এ দেশের জন্য সহায়ক কাঁচামাল প্রদর্শন করবে। এটা এক ছাদের নিচে এমন প্রদর্শনী ছাড়া সম্ভব নয়। ভাবুন, কোনো দেশি উদ্যোক্তা যদি এমন কর্মযজ্ঞ নিজে বিভিন্ন দেশ ঘুরে দেখতে চান, সেটা কত দুঃসাধ্য।
জাগো নিউজ: অন্যরা এ মেলা থেকে কী পাবেন?
ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব: তিন দিনব্যাপী এ প্রদর্শনী ১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এবং ১২ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এ সময় ২৪ হাজারের বেশি দর্শনার্থীর সমাগম হবে বলে আমাদের ধারণা। তারা সবাই কিন্তু ব্যবসায়ী নন।
আমরা চাই, ভোক্তা সাধারণ, নতুন উদ্যোক্তা, ছোট-বড় ব্যবসায়ী—সবাই এ মেলায় আসবেন। এ সেক্টরে অন্যরা কী করছে, একে অন্যের জন্য কী সহায়তা প্রয়োজন, সেটা দেখবেন। দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধিরাও আসবেন। আমাদের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ধারণা নেবেন। খাদ্য বিষয়ক পড়াশুনা করছেন এমন শিক্ষার্থীরা আসবেন। এবার আমরা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে আসার জন্য যানবাহন দিচ্ছি।
জাগো নিউজ: বিদেশি কোন কোন দেশ এবার অংশ নিচ্ছে?
ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব: এবার অংশগ্রহণকারী বিদেশি দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আলজেরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, হংকং, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইতালি, জাপান, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পাকিস্তান, পোল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, সুইজারল্যান্ড, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, স্পেন, সুইডেন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র।
জাগো নিউজ: এবার ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। এখন বাংলাদেশের খাদ্যপণ্য রপ্তানি কেমন হচ্ছে?
ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব: সেটা এখন নেতিবাচক। কারণ যুদ্ধের কারণে আমাদের মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানি কমে গেছে। এছাড়া দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে সবাই ভুগছি। আরেক সমস্যা আমাদের সরকারের নীতি সহায়তার আন্তরিকতা রয়েছে, তবে ব্যস্তবে দীর্ঘদিনের অনেক সমস্যা সমাধান হয়নি।
তবে চড়াই-উতরাই যত হোক, এ প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সম্ভাবনা কিন্তু কখনো এক ফোঁটাও কমে না। আমরা বাপার ৩৬০ প্রতিষ্ঠান যদি ৩০০-৪০০ মিলিয়ন রপ্তানি করি, তাহলে প্রান্তিক কৃষকদের তিন বিলিয়নের বাজার তৈরি হওয়া কোনো বিষয়ই না। শুধু সঠিক নীতি সহায়তা দিতে হবে। আপনি বলছেন কন্টাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং হবে না, কিন্তু চান এক্সপোর্ট। মতের মিল না হলেই ফ্যাক্টরিগুলোতে আনহাইজেনিক তোকমা দিয়ে ক্ষতি করা-এমন নীতি হলে হবে না। এখন বিশ্ব একটি গ্লোবাল ভিলেজ। এগুলো সংবাদ আমাদের ক্ষতি করছে।
জাগো নিউজ: এসব সমস্যা নিয়ে সরকার-ব্যবসায়ীদের মনোভাব কী?
ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব: আমাদের যেটা করতে হবে, আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে। আমাদেরও সমস্যা নেই তা না। আমরা সরকারের কাছে আস্থাভাজন হতে পারছি না, তারাও আমাদের কাছে আস্থাভাজন হতে পারছে না। বিষয়টা হচ্ছে এটা।
এনএইচ/এমআইএইচএস/



