ব্যাগের টানে থেমে যাচ্ছে জীবন
জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই কেটেছে শিশুদের সঙ্গে। বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে প্রতিদিন সকাল হলেই ছুটে যেতেন রনজিলা পারভীন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিয়ে শুরু হতো দিন, আর স্কুল ছুটির পর সেই শিশুদের ভালোবাসা সঙ্গে নিয়েই ফিরতেন বাড়ি। শিক্ষকতা শুধু পেশা ছিল না, শিশুদের সঙ্গেই যেন গড়ে উঠেছিল তার জীবনের সবচেয়ে গভীর সখ্য। অথচ সেই প্রিয় শিক্ষার্থীদের কাছে আর ফেরা হলো না তার।
চোখের চিকিৎসার জন্য গত শনিবার (২৯ আগস্ট) ভোরে স্বামীর সঙ্গে বগুড়া থেকে ঢাকায় এসেছিলেন ৫৭ বছর বয়সী রনজিলা পারভীন। হাসপাতালে যাওয়ার পথে সংসদ ভবন এলাকায় রিকশায় বসা অবস্থায় মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী তার হাতে থাকা ব্যাগে টান দেয়। হঠাৎ রিকশা থেকে ছিটকে সড়কে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। দ্রুত শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শিশুদের পড়িয়ে যার দিনের শুরু হতো, ছিনতাইকারীদের হ্যাঁচকা টানে তার জীবনের শেষ অধ্যায় লেখা হলো ঢাকার সড়কে। এর আগে রাজধানীর উত্তরায় মুক্তা আক্তার এবং গত জুনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে একই কৌশলে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে প্রাণ হারান সোহেলি ইসলাম।
গত ছয় মাসে ঢাকায় চলন্ত রিকশা বা অটোরিকশা থেকে ব্যাগ টান দেওয়ার ঘটনায় অন্তত তিন নারীর মৃত্যু হয়েছে। তিনটি ঘটনাতেই ভুক্তভোগীরা চলন্ত যানবাহনে ছিলেন এবং ছিনতাইকারীরা পাশ বা পেছন থেকে ব্যাগ ধরে টান দেওয়ার পর তারা সড়কে পড়ে গুরুতর আহত হন।
তবে এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, মোড় ও ব্যস্ত এলাকায় নিয়মিতই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। প্রাণহানি বা গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা সামনে এলেও ছিনতাইয়ের অধিকাংশ ঘটনা পুলিশের নথিতে আসছে না।
ব্যাংক থেকে ৩৯ লাখ টাকা তুলে নেওয়ার পথে অস্ত্রসহ ছিনতাই
গত রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুর দেড়টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডি লেক এলাকায় একটি ব্যাংক থেকে ৩৯ লাখ টাকা তুলে গন্তব্যে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে এসে অস্ত্রসহ টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনজন ব্যক্তি। এরপর ভুক্তভোগী ছিনতাইকারীদের পিছু নেন। একপর্যায়ে মোটরসাইকেল থেকে একজন ছিটকে রাস্তায় পড়ে গেলে স্থানীয়রা তাকে পিস্তলসহ আটক করেন।
খবর পেয়ে ধানমন্ডি থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তানভীর আবেদীন জুই নামে ওই ব্যক্তিকে আটক করে। পরে মজিবর রহমান ও জাকির হোসেন ওরফে ক্যাপ্টেন জাকির নামে আরও দুজনকে আটক করা হয়।
বাস থেকে নেমে বাড়ি ফেরার পথেও ঝুঁকি
সোহেলি ইসলাম ছিলেন একটি ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা। গত ঈদের ছুটি শেষে মেয়েকে নিয়ে দিনাজপুর থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন তিনি। গত ৬ জুন ভোরে বাস থেকে নেমে রিকশায় করে বাসায় যাওয়ার সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে মোটরসাইকেলে থাকা ছিনতাইকারীরা তার ব্যাগ ধরে টান দেয়। এতে সড়কে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান সোহেলি। পাঁচদিন পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
সোহেলির মৃত্যুর খবর প্রকাশের সময় পর্যন্ত তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ করা হয়নি। মোহাম্মদপুর ও শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশের কর্মকর্তারাও তখন এমন ছিনতাইয়ের ঘটনা সম্পর্কে জানতেন না বলে জানিয়েছিলেন। পরে ১৩ জুন মামলা হয় এবং একজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অর্থাৎ, প্রাণহানির মতো গুরুতর একটি ঘটনা ঘটার পরও কয়েকদিন সেটি পুলিশের অপরাধের নথিতে ছিল না।
ছিনতাইয়ের প্রকৃত হিসাব নেই
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে দস্যুতার মামলা হয়েছে ১৪৯টি। একই সময়ে ডাকাতির মামলার সংখ্যা মাত্র ১৮টি। তবে প্রকৃতপক্ষে কতটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে সেই হিসাব এসব মামলার পরিসংখ্যান থেকে পাওয়া যায় না। ভুক্তভোগীদের অনেকে থানায় মামলা করতে যান না। আবার থানায় গেলেও মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
গত ১ মার্চ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীতে অন্তত ২২টি গুরুতর ও আলোচিত ছিনতাইয়ের ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব ঘটনায় কুপিয়ে, ছুরিকাঘাত করে, গুলি করে, চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে এবং অস্ত্রের মুখে টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ২২টি ঘটনায় সরাসরি ভুক্তভোগী ২৬ জনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ২০ জন পুরুষ ও ছয়জন নারী। নারী ভুক্তভোগীর সংখ্যা কম হলেও তাদের পরিণতি ছিল ভয়াবহ। ২৬ ভুক্তভোগীর মধ্যে ছয়জন নারী হলেও চারটি প্রাণহানির ঘটনার তিনটিতেই নারী।
অন্তত সাতটি ঘটনায় ভুক্তভোগীরা রিকশা, অটোরিকশা কিংবা অন্য যানবাহনে ছিলেন। দুটি ঘটনায় চলন্ত ট্রেনে থাকা যাত্রী আক্রান্ত হন। আবার দুই নারী বাসা বা গন্তব্যে পৌঁছে রিকশা থেকে নামার পরপরই ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। অর্থাৎ, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার সময়ই ছিনতাইয়ের ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে।
ফোন হারানোর ঘটনায় মামলা না নিয়ে জিডি নেয় পুলিশ
এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে রাজধানীর মোহাম্মদপুরেও। গত ১১ মে বিকেলে চাঁন মিয়া হাউজিং এলাকায় রিকশা থামিয়ে এক কলেজছাত্রকে ঘিরে ধরে কয়েকজন। ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তার মোবাইল ফোন, টাকা, মানিব্যাগসহ বিভিন্ন জিনিস নিয়ে যায় তারা। পুরো ঘটনাটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরাও পড়ে।
পরে ভুক্তভোগীর বাবা গণমাধ্যমকে অভিযোগ করেন, থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে মোবাইল হারানোর ঘটনায় জিডি করতে বলে।
গত ছয় মাসে ছিনতাইয়ের শিকার সাতজনের সঙ্গে কথা বলে একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের কেউই থানায় মামলা করেননি। চারজন মামলা করতেই যাননি। আর তিনজন ছিনতাইয়ের পর থানায় গেলে তাদের জিডি নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি নোমান ছিদ্দিক নামে এক ব্যক্তি জানান, গত ১৬ আগস্ট রাতে রাজধানীর মৌচাক এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। তার মোবাইল ফোন নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। পরে রমনা থানায় মামলা করতে গেলে ফোন হারানোর ঘটনায় জিডি নেওয়া হয়। ওই জিডিতে লেখা হয়, মোবাইল ফোনটি হারিয়ে গেছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও সেটি পাওয়া যায়নি। অথচ তার দাবি, ঘটনাটি ছিল ছিনতাই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখানেই ছিনতাইয়ের সরকারি পরিসংখ্যানের বড় দুর্বলতা। অস্ত্রের মুখে কেড়ে নেওয়া একটি মোবাইল ফোন যদি নথিতে হারানো মোবাইল ফোন হিসেবে উঠে আসে তাহলে সেটি ছিনতাইয়ের হিসাবের বাইরে চলে যায়। ফলে অপরাধের প্রকৃত চিত্রও স্পষ্ট হয় না।
শুধু রাত নয়, দিনদুপুরেও চলছে ছিনতাই
একসময় রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা ভোর, গভীর রাত, নির্জন সড়ক কিংবা একা পথচারীদের ঘিরেই বেশি ঘটতো। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঘটনাগুলো সেই ধারণা বদলে দিচ্ছে। সকাল থেকে রাত, এমনকি দিনদুপুরেও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। রনজিলা পারভীন আক্রান্ত হন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে। মুক্তা আক্তারের ঘটনা সকাল ৯টার পর। মোহাম্মদপুরের চাঁন মিয়া হাউজিংয়ে কলেজছাত্রকে ছিনতাই করা হয় বিকেল ৫টা ৩৭ মিনিটে। মতিঝিলে ব্যাংক ও অর্থ লেনদেনের এলাকায় দিনের বেলায় অস্ত্র নিয়ে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
বিশ্লেষণ করা ২২টি ছিনতাইয়ের ঘটনার মধ্যে ভোররাত থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত সাতটি ঘটনা ঘটেছে, যা মোট ঘটনার প্রায় ৩২ শতাংশ। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টার মধ্যে ঘটেছে আটটি বা প্রায় ৩৬ শতাংশ ঘটনা। অর্থাৎ, ভোর থেকে সকাল এবং সন্ধ্যা থেকে রাত এই দুই সময়ে ঘটেছে ১৫টি বা প্রায় ৬৮ শতাংশ ছিনতাইয়ের ঘটনা। অন্যদিকে, সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে ঘটেছে সাতটি বা প্রায় ৩২ শতাংশ ঘটনা।
সকালের ঘটনাগুলোতে রিকশা-অটোরিকশার যাত্রী এবং ব্যবসায়িক কাজে নগদ টাকা বহনকারী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। সন্ধ্যা ও রাতের ঘটনায় পথরোধ করে ছুরি-চাপাতি দেখানো কিংবা আঘাত করে টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা বেশি।
৭৭ শতাংশ ঘটনায় অস্ত্র
ছিনতাইয়ের ২২টি ঘটনার মধ্যে ১৭টিতেই অর্থাৎ প্রায় ৭৭ শতাংশ ঘটনায় ধারালো বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার কিংবা প্রদর্শনের তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যবহৃত অস্ত্রের মধ্যে ছিল ছুরি, চাপাতি, ব্লেড, দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও পিস্তল। অর্থাৎ, ঢাকার আলোচিত ছিনতাইয়ের বড় অংশ শুধু ব্যাগে হ্যাঁচকা টান বা সুযোগ বুঝে মোবাইল ফোন নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অস্ত্র দেখিয়ে ভয় সৃষ্টি, কুপিয়ে বা ছুরিকাঘাত করে সম্পদ কেড়ে নেওয়ার প্রবণতাই বেশি।
এছাড়া একক ব্যক্তির চেয়ে সংঘবদ্ধভাবে ছিনতাইয়ের ঘটনাই বেশি। অধিকাংশ ঘটনায় দুই থেকে চারজন জড়িত থাকলেও কোনো কোনো ঘটনায় ছয়-সাতজনের উপস্থিতি ছিল।
গত ৯ আগস্ট উত্তরায় পেট্রলপাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় তিনটি মোটরসাইকেলে ছয়-সাতজন এসেছিল। আরেক ঘটনায় নাদিম নামের এক ব্যক্তির রিকশা প্রথমে একজন থামানোর পর আরও তিনজন তাকে ঘিরে ধরে। যাত্রাবাড়ীতে মাছ ব্যবসায়ী এমেদ আলীকেও চারজন ঘিরে ধরে কুপিয়ে টাকা নেওয়া হয়।
এজাহার নিয়ে এলে অবশ্যই ছিনতাইয়ের মামলা নেওয়া হবে
ছিনতাইয়ের মামলা না নেওয়ার বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গণি জাগো নিউজকে বলেন, যখন একজন ভুক্তভোগী মামলার এজাহার থানায় নিয়ে আসবেন অবশ্যই মামলা নেওয়া হবে। মামলা না নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি বলন, ছিনতাইকারীরা সুনির্দিষ্ট সময় ও জায়গা বেছে নিয়ে অপরাধ করছে। বিশেষ করে বাস থেকে নেমে গন্তব্যে যাওয়ার পথে তুলনামূলক ফাঁকা জায়গাগুলোতে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে তারা। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে বর্তমানে ৮৮টি চেকপোস্ট কাজ করছে। পাশাপাশি প্রতিটি থানায় তিন থেকে পাঁচটি নিয়মিত টহল দল রয়েছে। চেকপোস্ট ও টহলের কার্যক্রম তদারকির জন্য সুপারভিশন টিমও কাজ করছে।
চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই কমেছে, দাবি সরকারের
গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় বর্তমানে হত্যাকাণ্ড বা হত্যা মামলার সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে, তবে চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের মামলার সংখ্যা কমেছে।
তিনি বলেন, মাত্র ছয় মাস গেল, আমরা আশা করি এ সমস্যাটার সমাধান ধীরে ধীরে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অপরাধের দায় সরকার এড়িয়ে যাচ্ছে না। পুলিশের আত্মবিশ্বাস এখনো পুরোপুরি ফেরেনি।
টিটি/এমকেআর





