৫৯ বছরে গ্র্যাজুয়েট বেলায়েত শেখ, লক্ষ্য এবার পিএইচডি
বেলায়েত শেখের বয়স ৫৯ পেরিয়ে ৬০ বছরে পড়ছে অক্টোবরে। কিন্তু বয়সের কাছে হার মানেননি তিনি। যে বয়সে আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যান সবাই, সেই বয়সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েছেন তিনি। ৬০ ছুঁই ছুঁই বেলায়েত গ্র্যাজুয়েশন (স্নাতক ডিগ্রি) সম্পন্ন করেছেন।
ঢাকার স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (এসইউবি) জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ থেকে এ ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এবার তার লক্ষ্য আরও বড়। মাস্টার্স করবেন। তারপর ভর্তি হবেন পিএইচডি প্রোগ্রামে। বেলায়েত মফস্বল সাংবাদিকতা নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করতে আগ্রহী।
জানা যায়, দীর্ঘ ৪৫ বছর আগে উচ্চশিক্ষা নিয়ে গলায় টাই পরার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন বেলায়েত, ১৮ আগস্ট সেই স্বপ্নের একটি বড় অধ্যায় পূর্ণ হয়েছে। ওই দিন ছিল তার স্নাতকের শেষ সেমিস্টারের ভাইভা। ভালো ফল করে উত্তীর্ণ হয়েছেন বেলায়েত।
বেলায়েতের শিক্ষাযাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। ১৯৬৮ সালে গাজীপুরের শ্রীপুরের একটি কৃষক পরিবারে জন্ম তার। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বারবার বাঁধা আসে। পরিবারের ব্যয়ভার সামলাতে তাকে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ করতে হয়েছে।
১৯৮৩ সালে এসএসসি পরীক্ষার্থী থাকলেও অর্থের অভাবে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি বেলায়েত। পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের একটি অংশ জোগাড় করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অসুস্থ বাবার চিকিৎসার জন্য সে অর্থ ব্যয় করতে হয়। এরপর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যেতে হয় তাকে।
শিক্ষাজীবনে দীর্ঘ বিরতির পর ৫০ বছর বয়সে আবারও পড়াশোনায় ফেরেন বেলায়েত শেখ। ২০১৭ সালে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। দুই বছর পর ২০১৯ সালে জিপিএ ৪.৪৩ পেয়ে এসএসসি এবং ২০২১ সালে জিপিএ ৪.৫৮ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন।
২০২২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নপূরণে ঢাবি, রাবি, চবি, জাবিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত বেসরকারি স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হয়ে শুরু হয় তার বহু প্রতীক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয় জীবন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনাতেও শুরুতে চ্যালেঞ্জ ছিল। বিশেষ করে ইংরেজিতে দুর্বলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন বেলায়েত। তবে নিয়মিত পড়াশোনা, অনলাইন অনুবাদসহ বিভিন্ন উপায়ে নিজেকে প্রস্তুত করেন। বয়সে অনেক ছোট সহপাঠীদের সঙ্গে নিয়মিত ক্লাস করার পাশাপাশি স্টাডি ট্যুর ও বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমেও অংশ নেন তিনি।
বেলায়েত শেখের বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রিফাত সুলতানা বলেন, তার মধ্যে শেখার আগ্রহ ও অধ্যবসায়ের কোনো ঘাটতি ছিল না। নিয়মিত গাজীপুর থেকে ক্যাম্পাসে এসে ক্লাস করেছেন তিনি। অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি তরুণ শিক্ষার্থীর জন্য বেলায়েতের জীবন ও প্রচেষ্টা অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে থাকবে।
এদিকে, স্নাতক শেষ করেই থেমে যেতে চান না বেলায়েত শেখ। পেশাগত জীবনে তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে দৈনিক করতোয়া পত্রিকার শ্রীপুর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন।
মফস্বল সাংবাদিকতার জীবন ও পেশাগত বাস্তবতা কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা থেকেই এ বিষয়ে উচ্চতর গবেষণার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। মাস্টার্স শেষ করে মফস্বল সাংবাদিকতা নিয়ে পিএইচডি করার পরিকল্পনা রয়েছে বেলায়েতের।
জানতে চাইলে বেলায়েত শেখ বলেন, বয়সকে আমি কখনোই শেখার পথে বাধা হিসেবে দেখতে চাইনি। সে কারণেই হয়তো এতদূর আসতে পেরেছি। নিজেকে এখনো একজন শিক্ষার্থীই ভাবছি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নতুন কিছু শিখে যেতে চাই।
বেলায়েত শেখ গণমাধ্যমকে জানান, ভাইভা বোর্ডে তাকে চার বছর আগের বেলায়েত শেখ আর বর্তমান বেলায়েত শেখের মধ্যে পার্থক্য জানতে চাওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, উত্তরে আমি বলেছিলাম, কয়েক বছর আগে আমার চিন্তা ছিল কীভাবে অনার্স শেষ করবো। এখন ভাবছি আন্তরিক ইচ্ছা ও চেষ্টা থাকলে মানুষের পক্ষে অনেক কিছুই অর্জন করা সম্ভব।
বেলায়েত বলেন, ‘অনেক কষ্ট করেছি, অনেক কথা শুনেছি। সব বাধা পেরিয়ে গ্র্যাজুয়েশন তো শেষ করেছি। এখন আমার স্বপ্ন পিএইচডি করা। মাস্টার্স শেষ হলে এমফিল পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হবো। এখন আমি ড. বেলায়েত শেখ হতে চাই।’
এএএইচ/এমআরএম

