‘১০ বছর পিছিয়ে গেছে পাকিস্তান ক্রিকেট!’
পাকিস্তান ক্রিকেটে যেন স্থিরতা বলে কিছু নেই। এক সিরিজ শেষ হতে না হতেই দলে পরিবর্তন, ক্রিকেটার বাদ পড়া, কোচিং স্টাফে রদবদল- সব মিলিয়ে অস্থিরতা যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চলমান টেস্ট সিরিজের মাঝপথে সাত ক্রিকেটারকে দেশে ফেরানো এবং দুই কোচকে সরিয়ে দেওয়ার পর সেই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
এবার পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) সিদ্ধান্ত নিয়ে সরাসরি বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন দেশটির সাবেক তারকা স্পিনার সাঈদ আজমল। তার দাবি, তরুণদের সুযোগ দেওয়াই পিসিবির মূল উদ্দেশ্য নয়; বরং বর্তমান দলটিকেই পুরোপুরি সরিয়ে নতুন একটি দল তৈরি করার পরিকল্পনা করছে বোর্ড।
পাকিস্তানের ক্রিকেটের অন্যতম সফল স্পিনার মনে করেন, ধারাবাহিকভাবে ক্রিকেটারদের বাদ দেওয়া এবং পরিবর্তন করতে থাকায় খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ভেঙে যাচ্ছে। তার ভাষায়, বোর্ডই এখন ক্রিকেটারদের সবচেয়ে বেশি হতাশ করছে।
সামা টিভিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আজমল বলেন, ‘বোর্ড নিজেরাই খেলোয়াড়দের অন্য সবার চেয়ে বেশি ডিমোটিভেট করছে। তারা কোনো খেলোয়াড়কে থিতু হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না। এমন খেলোয়াড়ও আছে, যারা ভালো করেছে, কিন্তু তাদেরও বাদ দেওয়া হয়েছে। পিসিবির হাতে অনেক খেলোয়াড় অপমানিত হয়েছে।’
‘পাকিস্তান ক্রিকেট ১০ বছর পিছিয়ে গেছে’
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় ও শেষ টেস্টের আগে পাকিস্তান দলের এমন আমূল পরিবর্তনকে মোটেও ইতিবাচকভাবে দেখছেন না আজমল। তার মতে, ভবিষ্যতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকায় পাকিস্তান ক্রিকেট এক দশক পিছিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের দল ১০ বছর পিছিয়ে গেছে। আমরা ভবিষ্যতের জন্য কোনো পরিকল্পনাই করিনি।’
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ শুরুর পর থেকেই পাকিস্তান দলের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। প্রথম টেস্টে ইনিংস ও ১০৩ রানে এবং দ্বিতীয় টেস্টে ১৯৪ রানে হেরে তিন ম্যাচের সিরিজে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েছে পাকিস্তান। ফলে এজবাস্টনে তৃতীয় টেস্টটি এখন তাদের জন্য হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর লড়াই।
কিন্তু সেই ম্যাচের আগে দলের বড় ধরনের পরিবর্তনই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
মাঝ সিরিজে সাত ক্রিকেটার বাদ
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম দুই টেস্টে ব্যর্থতার পর পিসিবি অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নেয়। সাত ক্রিকেটারকে দলের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন মোহাম্মদ রিজওয়ান, ইমাম-উল-হক, সালমান আলী আগা, আলী উসমান ও খুররম শাহজাদ। দ্বিতীয় টেস্টে এই পাঁচজনই খেলেছিলেন।
এ ছাড়া আমির জামাল ও আওয়াইস জাফরকেও দেশে ফেরত পাঠানো হয়। একই সঙ্গে প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদ এবং বোলিং কোচ উমর গুলকেও দেশে ফেরানো হয়। তৃতীয় টেস্টের দায়িত্ব দেওয়া হয় সাদা বলের প্রধান কোচ মাইক হেসনকে। তার সঙ্গে কাজ করছেন অ্যাশলি নফকে। এই ব্যাপক পরিবর্তন নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন আজমল।
‘আসল উদ্দেশ্য খেলোয়াড় বাদ দেওয়া নয়, বদলে ফেলা’
আজমলের সবচেয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য এসেছে পিসিবির পরিবর্তনের উদ্দেশ্য নিয়ে। তার মতে, বোর্ডের লক্ষ্য কেবল ব্যর্থ ক্রিকেটারদের বাদ দেওয়া নয়; বরং বর্তমান দলের প্রায় পুরো কাঠামোই পরিবর্তন করে ফেলা।
তিনি বলেন, ‘একটি সিরিজের প্রতিটি ম্যাচ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কোনো খেলোয়াড় পারফর্ম না করলে তাকে বাদ দিয়ে তার জায়গায় অন্য কাউকে খুঁজে নেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকে না। কিন্তু এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য খেলোয়াড়দের প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং তাদের জায়গায় অন্যদের নিয়ে আসা।’
অর্থাৎ, আজমলের ব্যাখ্যায়, সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলো কোনো নির্দিষ্ট সিরিজের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়; বরং পাকিস্তান ক্রিকেটের বর্তমান দলটিকে ভেঙে নতুন করে সাজানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।
সালমান আগাকে উদাহরণ টানলেন আজমল
সাম্প্রতিক পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর একটি সালমান আলী আগা। দ্বিতীয় টেস্টে পাকিস্তানের অধিনায়কত্ব করা এই অলরাউন্ডারকে তৃতীয় টেস্টের দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সালমানকে উদাহরণ হিসেবে টেনে আজমল বলেন, ‘সালমান আগা খুবই ভালো খেলোয়াড়। কিন্তু কিছু কারণে সে ক্লিক করতে পারেনি। এ বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলা হয়েছিল।’
আজমলের বক্তব্যের মূল সুর হলো- একজন ক্রিকেটার খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে গেলেই তাকে বাদ দিয়ে দিলে সে নিজেকে প্রমাণ করার পর্যাপ্ত সুযোগ পাবে না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের জন্য নিয়মিত সুযোগ ও দলের আস্থার প্রয়োজন বলেই মনে করেন তিনি।
আকিব জাভেদ-হেসনকেও কাঠগড়ায় তুললেন
পাকিস্তান ক্রিকেটের সাম্প্রতিক অস্থিরতার জন্য আজমল সরাসরি দলের হাই-পারফরম্যান্স পরিচালক আকিব জাভেদ এবং মাইক হেসনের দিকেও আঙুল তুলেছেন। তার দাবি, দুজন মিলে পাকিস্তান দলের ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্তে বড় ধরনের প্রভাব রাখছেন।
আজমল বলেন, ‘আকিব জাভেদ ও মাইক হেসন একটি দল। এই দুজন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং এই পুরো বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী। পুরো বিষয়টিই অহংবোধের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।’
তবে আজমলের এই অভিযোগ তার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন; পিসিবির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা হয়নি।
আইএইচএস/
