শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতের তাগিদ
পরিবর্তনশীল বিশ্ববাজার, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান রক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) আয়োজিত ‘কর্মজগতের ভবিষ্যৎ: সবার জন্য শোভন কাজ ও সামাজিক ন্যায়বিচার’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়ামে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সিম্পোজিয়ামে বক্তারা বলেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার শ্রমিকদের তথ্য আগাম জানা, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সুরক্ষার আওতায় আনা এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের শিল্পায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা আরও এগিয়ে নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, শ্রম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুর রহিম, আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের অতিরিক্ত মহাসচিব মো. সাইদুল ইসলাম এবং শ্রমিক অধিকার জাতীয় অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্সের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মেসবাহউদ্দীন আহমেদ।
বিলসের চেয়ারম্যান মো. মজিবুর রহমান ভূঞাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে শক্তিশালী ও টেকসই অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সবার অধিকার নিশ্চিত হবে এবং উন্নয়ন হবে গণতান্ত্রিক, মানবিক ও কল্যাণমুখী।
বাংলাদেশের কার্যকর ও সফল উদ্যোগগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার পাশাপাশি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিনিয়োগ ও উৎপাদন কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন ও শিল্পায়নকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান আনুষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির নীতির ধারাবাহিক ফল। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হবে।
ড. তিতুমীর আরও বলেন, করের হার না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ ও ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে হবে। এর মাধ্যমে দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।
অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, শ্রম আইন বাস্তবায়ন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের সঙ্গে শ্রমিকদের খাপ খাওয়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন বলেন, ন্যাশনাল সোশ্যাল ডায়ালগ ফোরাম একটি নতুন উদ্যোগ ও এটিই হবে প্রথম ত্রিপক্ষীয় ফোরাম। পরিবর্তনশীল শ্রমজগতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সব পক্ষের মধ্যে আরও সংলাপ, সম্পৃক্ততা ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুর রহিম বলেন, জলবায়ু ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে শ্রমজগতে যে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণে এ ধরনের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের অতিরিক্ত মহাসচিব মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় যুক্ত রয়েছে। এর একটি হলো অধিকাংশ শ্রমিকের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত থাকা এবং অন্যটি হলো বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া।
তিনি বলেন, এই পর্যায়ে অর্থবহ ও ন্যায়সংগত উত্তরণ নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য মালিক, শ্রমিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয় প্রচেষ্টাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
মেসবাহউদ্দীন আহমেদ বলেন, সরকার, মালিক ও শ্রমিক- এই তিন পক্ষের সমন্বিত আলোচনা ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে কার্যকর সমাধানের পথে এগিয়ে যেতে হবে। পারস্পরিক সহযোগিতা, সামাজিক সংলাপ ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা এবং সবার জন্য শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, শ্রম সংস্কার কমিশন জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার কথা বলেছে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
সিম্পোজিয়ামে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শোভন কর্মজগৎ গঠনে সামাজিক সংলাপের ভূমিকা এবং ন্যায্য কর্মজগতের জন্য সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ ও প্রস্তুতি- এই দুটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এতে সরকার, নিয়োগকর্তা সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
ইএইচটি/এমএমকে



