September 13, 2026

শৈশব বাঁচুক, স্বপ্ন বাঁচুক

0
og_1789274795_6aa62aab5e02b.jpeg


শিশুর হাসি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি। ছোট্ট দুটি চোখে যখন ভবিষ্যতের স্বপ্ন জ্বলে ওঠে, তখন সেই স্বপ্ন শুধু একটি পরিবারের নয়—একটি সমাজ, একটি দেশ এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন হয়ে ওঠে। শিশুরা আমাদের আগামী দিনের নাগরিক। আজ আমরা তাদের যেভাবে গড়ে তুলব, আগামী দিনের সমাজও সেভাবেই গড়ে উঠবে। তাই শিশুদের শুধু ভালো ফলাফল করানো নয়, তাদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

শৈশব জীবনের সবচেয়ে কোমল সময়। এই সময়ে একটি শিশু যা দেখে, যা শোনে এবং যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তার গভীর প্রভাব পড়ে তার ব্যক্তিত্বে। অথচ কী নিদারুণভাবে কত শিশুর শৈশব যেন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে! বই, খাতা, কোচিং, পরীক্ষা, প্রতিযোগিতা, সেলফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যস্ততার মধ্যে অনেক শিশু যেন বাধ্য হয়েই মাঠে দৌড়ানোর আনন্দ, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করার আনন্দ কিংবা পরিবারের সঙ্গে নির্ভার সময় কাটানোর সুখ হারিয়ে ফেলছে!

আমরা অনেক সময় সন্তানের ভালো চাইতে গিয়ে তাদের ওপর অতিরিক্ত প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দিই। পরীক্ষায় ভালো করতে হবে, সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে, ভালো স্কুলে পড়তে হবে—এমন নানা প্রত্যাশা শিশুর কোমল মনে চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু প্রতিটি শিশুর মেধা, আগ্রহ ও সক্ষমতা এক নয়। কেউ পড়াশোনায় ভালো, কেউ ছবি আঁকতে ভালোবাসে, কেউ গান গায়, কেউ খেলাধুলায় দক্ষ, আবার কেউ হয়তো অসাধারণভাবে মানুষের সঙ্গে মিশতে পারে। প্রত্যেক শিশুর মধ্যেই কোনো না কোনো বিশেষ প্রতিভা থাকে। আমাদের দায়িত্ব সেই প্রতিভাটিকে খুঁজে বের করা, তাকে উৎসাহ দেওয়া এবং বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।

শিশুরা ভুল করবে—এটাই স্বাভাবিক। একটি শিশু যখন কোনো ভুল করে, তখন তাকে অপমান না করে ভুল থেকে শেখার সুযোগ দিতে হবে। বারবার বকাঝকা, অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা কিংবা ‘তুমি কিছুই পারো না’—এ ধরনের কথা একটি শিশুর আত্মবিশ্বাসকে ধীরে ধীরে ভেঙে দিতে পারে। তার পরিবর্তে বলা যেতে পারে, ‘ভুল হয়েছে, আবার চেষ্টা করো।’ এই একটি বাক্যই হয়তো একটি শিশুর মনে নতুন সাহস তৈরি করতে পারে।

আজকের দিনে শিশুদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু দামি খেলনা বা আধুনিক প্রযুক্তি নয়; প্রয়োজন বাবা-মায়ের সময়। অনেক বাবা-মা সন্তানের প্রয়োজন মেটাতে দিন-রাত পরিশ্রম করেন, কিন্তু সন্তানের সঙ্গে বসে দুটো কথা বলার সময় পান না। অথচ শিশুর কাছে বাবা-মায়ের সময়ের মূল্য অনেক বেশি। দিনের শেষে সন্তানকে জিজ্ঞেস করা—‘আজ তোমার দিনটা কেমন গেল?’—এই ছোট্ট প্রশ্নটিই তার মনে নিরাপত্তা ও ভালোবাসার অনুভূতি তৈরি করতে পারে।

শিশুর মানসিক জগতকে বোঝার চেষ্টা করাও জরুরি। সে কেন চুপ করে আছে, কেন রেগে যাচ্ছে, কেন পড়তে চাইছে না, কেন বারবার মোবাইলের দিকে যাচ্ছে—এসবের পেছনে কোনো কারণ থাকতে পারে। শুধু শাসন না করে তার সঙ্গে বন্ধুর মতো কথা বলতে হবে। সন্তান যেন ভয় না পেয়ে নিজের কথা বাবা-মায়ের কাছে বলতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করা দরকার। যে পরিবারে ভালোবাসা ও পারস্পরিক বিশ্বাস থাকে, সেখানে শিশুরাও ধীরে ধীরে দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে।

প্রযুক্তির এই যুগে শিশুদের মোবাইল ও ইন্টারনেট থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা হয়তো সবসময় সম্ভব নয়। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার যেন তাদের নিয়ন্ত্রণ না করে, বরং তারা যেন প্রযুক্তিকে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে শেখে—এটি শেখানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোবাইলের পাশাপাশি বই পড়া, খেলাধুলা, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো এবং সৃজনশীল কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।

শিশুর শৈশব যেন চাপের কাছে হারিয়ে না যায়। তার হাসি যেন প্রতিযোগিতার ভারে ম্লান না হয়। তার স্বপ্ন যেন আমাদের অতিরিক্ত প্রত্যাশার নিচে চাপা না পড়ে। কারণ একটি শিশুর হাসি শুধু আজকের আনন্দ নয়—সেটিই আগামী দিনের সুন্দর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশার আলো।

শিশুদের চরিত্র গঠনে পরিবারের পাশাপাশি বিদ্যালয় ও সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না; একজন ভালো শিক্ষক একটি শিশুর জীবনকে বদলে দিতে পারেন। একটি উৎসাহের বাক্য, একটি বিশ্বাসের হাত কিংবা একটি ভালো পরামর্শ কখনো কখনো শিশুর ভবিষ্যৎ পথচলার শক্তি হয়ে ওঠে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুরা শুধু পরীক্ষার খাতা নয়। তারা অনুভূতিশীল মানুষ। তাদেরও কষ্ট হয়, অভিমান হয়, ভয় হয়, স্বপ্ন হয়। তারা ভালোবাসা চায়, প্রশংসা চায়, নিরাপত্তা চায়। তাই সন্তানকে বড় করার অর্থ শুধু তাকে বড় ডিগ্রি অর্জনের পথে এগিয়ে দেওয়া নয়; বরং তাকে এমন একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, যে অন্যকে সম্মান করবে, অসহায়ের পাশে দাঁড়াবে, নিজের দায়িত্ব বুঝবে এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার সাহস রাখবে।

একটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা নয়; বরং একটি দেশের ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করা। আজকের শিশুরাই একদিন শিক্ষক হবে, চিকিৎসক হবে, প্রকৌশলী হবে, কৃষক হবে, শিল্পী হবে, লেখক হবে, প্রশাসক হবে কিংবা কোনো সাধারণ পেশায় থেকেও সমাজের জন্য অসাধারণ কাজ করবে। তাদের হাতেই থাকবে আগামী দিনের দেশ।

তাই আসুন, আমরা শিশুদের শুধু সফল হওয়ার শিক্ষা না দিয়ে ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিই। তাদের স্বপ্নকে ছোট না করি, বরং স্বপ্ন দেখার সাহস দিই। তাদের ভুলকে অপরাধ না বানিয়ে শেখার সুযোগ দিই। তাদের হাতে শুধু মোবাইল নয়, বই তুলে দিই; শুধু পরীক্ষার প্রশ্ন নয়, জীবনের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শেখাই।

শিশুর শৈশব যেন চাপের কাছে হারিয়ে না যায়। তার হাসি যেন প্রতিযোগিতার ভারে ম্লান না হয়। তার স্বপ্ন যেন আমাদের অতিরিক্ত প্রত্যাশার নিচে চাপা না পড়ে। কারণ একটি শিশুর হাসি শুধু আজকের আনন্দ নয়—সেটিই আগামী দিনের সুন্দর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশার আলো।

লেখক : স্বত্বাধিকারী, উষার স্বাদকাহন

এইচআর/জেআইএম



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *